যে গাড়ি থেকে শিশু শাহাদাত হোসেন সৌরভকে গুলি করেছিলেন গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে সরকার দলীয় সাংসদ মনজুরুল ইসলাম লিটন, সেই গাড়িতে করেই রোববার কারাগার থেকে বাড়ি ফিরলেন তিনি। ২৪ দিন কারাবাসের পর মুক্তি পাওয়া সাংসদকে দলীয় নেতা-কর্মীরা ফুলের মালা দিয়ে কারাগারের সামনে বরণ করে নেন। সকালেই শিশুটিকে গুলি করে হত্যা চেষ্টা মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান তিনি।

জামিন আবেদনের ওপর শুনানি শেষে সংসদ অধিবেশন চলাকালীন সময় পর্যন্ত সাংসদ মনজুরুলের জামিন মঞ্জুর করেন গাইবান্ধার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম ময়নুল হাসান ইউসুফ।

এই মামলায় ৫ নভেম্বর চতুর্থ দফায় আদালতে জামিনের আবেদন জানানো হলে আজ শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর আগে ৪ নভেম্বর বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় করা আরেকটি মামলায় একই আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন।

সাংসদ মনজুরুলের আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম বলেন, মনজুরুল ইসলাম একজন সংসদ সদস্য। বর্তমানে জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে। তাই চলতি সংসদ অধিবেশনে তিনি যাতে যোগ দিতে পারেন, সে জন্য শিশু শাহাদাত হত্যা চেষ্টা মামলায় তাঁর জামিনের আবেদন জানানো হয়। আদালত শুনানি শেষে সংসদ অধিবেশন চলাকালীন সময় পর্যন্ত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন।

গত ১৪ অক্টোবর রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে সাংসদকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরদিন ১৫ অক্টোবর তাঁকে গাইবান্ধা ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই দিন দুপুরে তাঁকে গাইবান্ধার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। দ্বিতীয় দফায় গত ২৫ অক্টোবর একই আদালত দুটি মামলায় তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।

গত ২ অক্টোবর সাংসদ মনজুরুল ইসলামের ছোড়া গুলিতে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার গোপালচরণ গ্রামের শিশু শাহাদাত হোসেন সৌরভ গুলিবিদ্ধ হয়। পরের দিন রাতে সাংসদকে একমাত্র আসামি করে সুন্দরগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন শিশুটির বাবা সাজু মিয়া।

যে গাড়ি থেকে শিশু শাহাদাত হোসেন সৌরভকে গুলি করেছিলেন গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে সরকার দলীয় সাংসদ মনজুরুল ইসলাম লিটন, সেই গাড়িতে করেই আজ রোববার জামিনে মুক্তি পেয়ে কারাগার থেকে বাড়ি ফিরলেন তিনি। ২৪ দিন কারাবাসের পর মুক্তি পাওয়া সাংসদকে দলীয় নেতা-কর্মীরা ফুলের মালা দিয়ে কারাগারের সামনে বরণ করে নেন। ছবি: শাহাবুল শাহীন, গাইবান্ধাফুল দিয়ে বরণ

বেলা ১১টা থেকে গাইবান্ধা জেলা কারাগারের সামনে সাংসদকে বরণ করতে পাঁচ শতাধিক দলীয় নেতা-কর্মী অপেক্ষা করতে থাকেন। আদালত থেকে জামিনের কাগজপত্র পৌঁছার পর দুপুর সোয়া ১২টার দিকে সাংসদ কারাগার থেকে বের হন। এ সময় জেলা কারাগারের প্রধান ফটকে ফুলের মালা দিয়ে সাংসদকে বরণ করেন দলীয় নেতা-কর্মীরা। সেখান থেকে পুলিশি নিরাপত্তা ও দলীয় নেতা-কর্মীদের মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা নিয়ে সাংসদের গাড়িবহর সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙায় তাঁর গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা হয়।

সেই পাজেরোতেই বাড়ি ফিরলেন সাংসদ

যে পাজেরো গাড়ি থেকে সাংসদ মনজুরুল শিশু শাহাদাতকে গুলি করেছিলেন, সেই পাজেরো গাড়িতে করেই তিনি কারাগার থেকে বাড়ি ফেরেন। কারাগার থেকে বেরিয়ে সাংসদ সবার উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদনের জবাব দেন। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। পরে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। তবে সাংসদের স্ত্রী ও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দা খুরশিদ জাহান বলেন, ‘আজই তিনি সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকা যাবেন।’

ভীত শিশু শাহাদাত

সাংসদের জামিনের খবর শুনে শিশু শাহাদাত হোসেন সৌরভ কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর সে বলল, তার ভয় লাগছে। তিনি যেন আর এমন না করেন। ওনার যেন বিচার হয়।

জানতে চাইলে শিশুটির বাবা সাজু মিয়া বলেন, ছেলের পায়ের ক্ষতস্থানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আজ দুপুরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সময় তিনি সাংসদের জামিনের খবর শোনেন। তিনি বলেন, ‘এতদিন নিরাপদেই ছিলাম। এমপি প্রভাবশালী লোক। তাঁর অনেক লোকজন আছে। তিনি জামিন পাওয়ায় ভয় লাগছে। আমি সরকারের কাছে আবেদন জানাই, আমার পরিবারের যেন নিরাপত্তা দেওয়া হয়।’ শাহাদাতের মা সেলিনা বেগম বললেন, ছেলের এক মাস লেখাপড়া নষ্ট হলো। সে পিছিয়ে গেল। এই ক্ষতিপূরণ কে দেবে?

শিশুটির দাদা তজর আলীর কথা, ‘জেল থাকি বাহির হোক, একন হামরা গুলি করার বিচার চাই।’ আর দাদি সোনাভান বেগমের দাবি, ‘সোরকার যেন হামার নাতির পড়াশুনের খরোচ দ্যায়।’

এমআর