৭১’এ পাকহানাদার বাহিনীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার অসংখ্য নারী। যেসব নারী আজো সামাজিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত।
সমাজের কাছ থেকে পেয়েছে শুধুই ঘৃনা, বঞ্চনা। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পেরিয়ে গেলেও কোন সরকার তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। অথচ দেশ স্বাধীনের পেছনে তাদের রয়েছে অসামান্য অবদান। তবে দীর্ঘ ৪৩ বছর পর সেই বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি মিলেছে। সেই সৌভাগ্যবান বীরাঙ্গনাদের ৪ জন কুষ্টিয়ার এলেজান, দুলজান, মোমেনা, মজিরন।
যারা কিনা দু:সাহসিকতা দেখিয়ে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের গণআদালতে গোলাম আযমদের বিরুদ্ধে স্বাক্ষ দিয়েছিলেন। আজ তাদের বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস। স্বামী সন্তানদের গর্বের শেষ নেই। সরকারী গেজেট প্রকাশের পর ওই সদ্য সনদ পাওয়া ওই বীর সেনানীদের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া জানা গেল।
কুষ্টিয়ার ৪বিরঙ্গনার একজন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল কুমারখালী উপজেলার হাসিমপুর উত্তরপাড়া গ্রামের এলেজান নেছা। বয়স সত্তর ছুই ছুই। স্বাধীনতার ৪৩ বছরে সমাজ তাকে দিয়েছে বঞ্চনা, ঘৃনা। লোকের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে অভাব অনটনের সাথে যুদ্ধ করে কাটিয়েছেন দীর্ঘ সময়।
শরীরের নানান রোগ-শোকে বাসা বেঁধেছে। জীবনের শেষ সময়ে একটু সম্মানের অপেক্ষায়। কিন্তু সেই অপেক্ষার পালা কবে শেষ হবে? এমন প্রশ্নের অবসান হয়েছে ক’দিন আগেই। যেদিন সরকার তাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কেন লাগছে জানতে চাইলে চোখের জল যেন ঠেকানো যাচ্ছিলনা। তবে এই জল কষ্টের নয়, আনন্দের।
দীর্ঘ ৪৩ বছর পর স্বীকৃতি পাওয়ায় তাই জমিয়ে রাখা পানি ধরে রাখতে পারেননি তিনি। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া জীবনের শেষ সময়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ায়। এলেজান জানান, স্বামী সন্তন নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। পেটের পীড়া, কানে অঝরে পানি পড়ে। নানা রোগ শোকে বাসা বেঁধেছে। নিরাময় হচ্ছেনা। স্বামীর হাই প্রেসার। তাঁর শরীরও ভাল নেই। অভাবের তাড়নায় ছেলের লেখাপড়া শেখাতে পারিনি। সহায় সম্বল বলতে কিছু নেই।
অন্যের বাড়িতে ঝিঁয়ের কাজ করি। অসবর সময়ে বাড়তি রোজগারে তাঁতের কাজ করি। এতসব কষ্টের দিনে জীবনের শেষ সময়ে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি আমাকে দারুনভাবে গৌরবান্বিত করেছে। আজ আমার পরিবারে কোন অভাব থাকবেনা, সমাজে দুষ্টুচক্ররা কোন খারাপ কথা বলবেনা। আমি আজ মুক্তিযোদ্ধা। জীবনের শেষ দিনগুলো গৌরবের সাথে পার করতে পারব।
স্ত্রীর এমন স্বীকৃতিতে দারুন খুশি স্বামী আকবর আলী। আমার স্ত্রী সম্পর্কে আর কেউ বাজে কথা বলবেনা। স্ত্রীর এমন স্বীকৃতিতে স্বামী হিসেবে গর্বিত। আর মায়ের এমন স্বীকৃতিতে কম খুশি নয় ছেলে জানান তরিকুল। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে এখন থেকে পরিচিত হব একি কম আনন্দের। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়ে খুঁশির অন্ত নেই একই এলাকার দুলজান নেছারও।
স্বামীহারা অভাবের সংসারে সরকারের এমন স্বীকৃতি কি কম আনন্দের ? স্বামী হারা দুলজানের এমন কষ্টের দিনে এমন সুসংবাদ আসবে ভাবতেও পারেননি কখনো। তবে দুখের পরে সুখ আসে এমন প্রবাদের কথা জানা ছিল তাঁর।
আর এর প্রমাণও মিলেছে জীবনের শেষ মুহুর্তে। মায়ের এমন স্বীকৃতে তাই খুঁশির অন্ত নেই সুমনা খাতুনের। হাসিনা সরকার তার মাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছেন তিনি।
এখন মুক্তিযোদ্ধা মায়ের সন্তান এযেন দারুন অনুভূতি। পাশের গ্রাম বানিয়া কান্দির আরেক বিরাঙ্গনা মোমেনা খাতুন। তিনি পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। তাঁর কন্ঠেও একই উচ্চারণ। স্বাধীনতার ৪৩বছর পর শেষ পর্যন্ত পেলাম মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। সারাটি জীবন আক্ষেপ নিয়ে থাকতে হবে ভেবেছিলাম। তবে জীবনের শেষ সময় যে এমন স্বীকৃতি পাবো ভাবতেও পারিনি কখনো। আল্লাহর প্রতি লাখো শুকরিয়া।
একই উপজেলার মধুপুরের মজিরন নেছারও কি কম উচ্ছ্বাস। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়ে পরিবারে বইছে আনন্দের বন্যা। কুষ্টিয়ার এই ৪ বিরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় খুঁশি জেলার ভারপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রফিকুল আলম টুকু জানান, সব সরকারের কাছেই এই বীরাঙ্গনাদের যোগ্য মর্যাদার দাবীতে সকল মুক্তিযোদ্ধারা স্বোচ্চার ছিলেন।
দেরীতে হলেও সরকারের এমন স্বীকৃতিকে যুগান্তকারী হিসেবে দেখছেন ঘাতকদালাল নির্মূল কমিটি। কমিটির নেতা অসিৎ সিংহ রায় মনে করেন একমাত্র বর্তমান সরকারই মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে কাজ করে। বীরাঙ্গণাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এই সরকার আরেকবার প্রমান করল একমাত্র শেখ হাসিনার সরকারই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার।
এমএ





