এবার ময়মনসিংহ শহরের কালিবাড়ি এলাকায় একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে উগ্রবাদী সন্দেহে মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষার্থীসহ সাতজনকে আটক করেছে পুলিশ।

সোমবার দুপুরে প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে হাফবিল্ডিং টিনশেড ওই বাড়ির ভেতর থেকে দু’টি কম্পিউটার, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে ৭০ লাখ টাকা লেনদেনের চেক বই, ইসলামী বই, একটি মোটরবাইক, ইলেক্ট্রিক সরঞ্জামসহ ইত্যাদি জব্দ করা হয়। এরা কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সদস্য কি-না তা এখনো পুলিশের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে উগ্রবাদীদের মতোই সুষ্পষ্ট আলামত পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম।

এদিকে চট্টগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার ও কুমিল্লায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই ময়মনসিংহে এই 'উগ্রবাদী আস্তানার' খবরে শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। 'আস্তানা' ঘেরাও ও সাত 'উগ্রবাদী' আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে শতশত উৎসুক জনতা কালিবাড়ি সড়কে ওই বাড়ির সামনে ভিড় জমান।

পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম ব্রিফিংএ সাংবাদিকদের জানান, শহরের ১৭০ এ কালিবাড়ি সড়কের বাড়িতে কিছু লোকের সন্দেহজনক চলাফেরার খবর পেয়ে সোমবার দুপুর ১২টার দিকে তার (পুলিশ সুপার) নেতৃত্বে ওই বাড়িটি ঘেরাও করে পুলিশ। তিনি ঘরের ভেতরে থাকা লোকদের ডাকাডাকি করে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ঘরের দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে ঘরের চারটি কক্ষ থেকে সাতজনকে আটক করেন। আটককৃতরা হলো ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউড়া উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামের ইকবাল হোসেনর ছেলে মো. আল আমিন (২৫), হালুয়াঘাট উপজেলার দরিয়াকান্দা গ্রামের সরাফত আলীর ছেলে শহীদুল ইসলাম (২৮) ও আইনউদ্দিনের ছেলে আশিকুর রহমান (২৮), নেত্রকোণা জেলার পূর্বধলা উপজেলার জারিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে মাসুম আহমেদ (৩০), বোরহান উদ্দিনের ছেলে শাহ আল হোসেন শামীম (২৭) ও শেখ আব্দুল লতিফের ছেলে রোমান মিয়া (২৭) এবং মোহনগঞ্জ উপজেলার টেরাপাড়া গ্রামের মো. সবুজ মিয়ার ছেলে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আমির উদ্দিন (২৭)। এসময় আটককৃতরা পুলিশকে প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা করেনি বলেও জানান তিনি।

পুলিশ সুপার আরো জানান, আটককৃতরা গত চার মাস ধরে ওই বাড়ি ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছিল। অভিযানকালে বাড়ির ভেতর থেকে দু’টি কম্পিউটার, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে ৭০ লাখ টাকা লেনদেনের চেক বই, ইসলামী বই, একটি মোটরবাইক, ইলেক্ট্রিক সরঞ্জামসহ উদ্ধার করা হয়। তবে বিস্ফোরক জাতীয় কোনো দ্রব্যাদি পাওয়া যায়নি। পুলিশ সুপার বলেন, তারা ঘরের ভেতরেই আযান দিতো এবং নামাজ আদায় করতো। তাদের কম্পিউটার ওপেন করে ‘ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমই আমাদের লক্ষ্য’ বড় হরফে লেখা পাওয়া যায়। কম্পিউটারের ডকুমেন্টে নানা জিহাদি কথাবার্তাও রয়েছে। জেএমবির প্রধান শায়খ আব্দুর রহমানের লেখা ‘মৃত্যুর পথে অমলিন’ বই পাওয়া গেছে ৫০টি।

তিনি আরো জানান, জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃত মেডিক্যাল ছাত্রটি জানিয়েছে, এখানে লিউকোমেনিয়ার চিকিৎসা দেয়া হয়।

এদিকে খবর পেয়ে ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, অতিরিক্ত ডিআইজি ড. আক্কাসউদ্দিন ভুইয়া, র‌্যাব-১৪ এর সিইও লে. কর্ণেল শরীফুল হকসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ১৭০/১ কালিবাড়ী এলাকার ওই বাড়িটির মালিক মরহুম অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল কাদিরের পুত্র অ্যাডভোকেট আসিফ আনোয়ার মুরাদ। উগ্রবাদী আস্তানা সন্দেহে বেশ কয়েকদিন ধরে এ বাড়িটি পুলিশের নজরদারিতে ছিল। বাড়িতে বসবাসকারী ৬/৭ জন লোকের গতিবিধি সন্দেহজনক বলে আজ বেলা ১২টার দিকে পুলিশ বাড়িটি ঘিরে অভিযান শুরু করে। তিনি জানান, উগ্রবাদীদের আস্তানায় যেসব আলামত পাওয়া যায়, এখানেও তাই পাওয়া গেছে। এরা বড় কোনো নাশকতার পরিকল্পনা করছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এরা কোন উগ্রবাদী দলের সদস্য তারা এখনই বলা যাচ্ছে না। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল কাদির আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন। তিনি ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবি সমিতির একাধিকবার সভাপতি ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ছেলে-মেয়েরা বাড়ি ভাগাভাগি করে নেয়। ওই বাড়ির পিছনে আরো দু’টি বাড়ি রয়েছে। সেখানে আটককৃত মাসুম আহমেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ডিআইজি ও পুলিশ সুপারসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওই বাড়িটি পরিদর্শন করেন। এসময় মাসুম আহমেদের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ডেকো ফুড লিমিটেডের আঞ্চলিক সেলস ম্যানেজার ওহিদুজ্জামান ও সহকারি সেলস ম্যানেজার আশিক হাসান পুলিশ কর্মকর্তাদের জানান, মাসুদ আহমেদের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন ছাড়া আর কোনো সর্ম্পক তাদের নেই। প্রতিমাসে দুই/তিন লাখ টাকা লেনদেন হয়। মাসুম আহমেদ প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ও ডেকো ফুডের চারটি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশক বলেও জানান তারা। এসময় ওই বাড়ি থেকে একটি মোটরবাইক (রংপুর-ল-১১-০৬২২) জব্দ করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও কিছু 'জিহাদি' বই পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানায়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নুরে আলম জানান, গত তিনদিন ধরে বাড়িটি রেকি করা হয়। সোমবার বেলা ১১টার দিকে পুলিশ ওই বাড়ির আশপাশের বাসা, ভবনের ছাদে ও অলিগলিতে পুলিশ অবস্থান নেয়। দুপুর ১২টার দিকে পুলিশ প্রথম বাড়ির দরজায় নক করে। কিন্তু কোনা সাড়াশব্দ না পেয়ে ভেতরের দরজায় লাথি মারার সাথে সাথে ভেতরের ছিটখানি খুলে যায়। ওই সময় তারা জোহরের নামাজ আদায় করছিল। সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে তারা নামাজ আদায় করতো বলেও জানান তিনি। তিনি আরো জানান, অভিযান চলাকালে সিআইডি ও ডিবি পুলিশের ক্রাইম সিনের সদস্যরা বিস্তারিত আলামত সংগ্রহ করেছে। পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম আশপাশের বাসাবাড়ির লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা স্বপন ও মোবারক হোসেন জানান, অ্যাডভোকেট আসিফ আনোয়ার মুরাদের বাড়িটি জরাজীর্ণ। পাশের চারতলা ভবনটি সূর্য্যের হাসি ক্লিনিক, ভেতরে একটি সুরম্য ভবনে ‘রূপসী সুজ’ এর গোডাউন ও কারখানা রয়েছে।

এদিকে 'উগ্রবাদী আস্তানা' ঘিরে রাখার খবর ছড়িয়ে পড়লে শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শতশত উৎসুক জনতা কালিবাড়ি সড়কের ওই বাড়ির সামনে ভিড় করেন। ফলে দুপুর ১২টা থেকে প্রায় চারটা পর্যন্ত ওই সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় শহরজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়।
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে জেএমবি’র সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইকে মুক্তাগাছা উপজেলার দুল্লা ইউনিয়নের রামপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়। একই সময়ে তার স্ত্রীকে শহরের আরকে মিশন রোডের একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। শহরের সিকদার বাড়ী এলাকার একটি বাড়ি থেকেও বোমা উদ্ধার করা হয়।

এমই