দেশের উত্তর-পশ্চিমের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। মে মাসের শুরুর দিকে এই জেলায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। ওই সময় হঠাৎ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে নমুনা পরীক্ষার অনুপাতে সংক্রমণের হার উঠেছিল ৬০ ভাগেরও বেশি।

ভারতে প্রথম শনাক্ত করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ডেল্টা ভেরিয়েন্টের কারণে এমন ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিন দিকেই ভারতের সাথে সীমান্ত।

ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের দ্বিতীয় ঢেউয়ের শুরুটা ওই অঞ্চল থেকেই। তবে এখন দেশব্যাপী প্রতিদিন সংক্রমণ ও মৃত্যুর নতুন রেকর্ডের মাঝেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিস্থিতি বদলে গেছে।

সংক্রমণ যেমন ছিল
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা: জাহিদ নজরুল চৌধুরী বলেন, জেলায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হয় গত বছরের ২০ এপ্রিল। তখন থেকে চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত এক বছরে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু এ বছরের মে মাসের শেষের দিক থেকে জুলাই পর্যন্ত শুধু দুই মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৫০ জন মারা গেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের অনেক বাসিন্দা রাজশাহীতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে মারা গেছেন। তারা এই হিসাবের মধ্যে আছে কি না তা অবশ্য পরিষ্কার নয়।

ডা: নজরুল চৌধুরী বলেছেন, এ বছর রমজানের আগ পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার নমুনা পরীক্ষার অনুপাতে ৫ ভাগের মতো ছিল। কিন্তু ঈদের সাত দিনের মধ্যেই জেলায় হঠাৎ করে সংক্রমণ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তা ৬২ ভাগ ছাড়িয়ে যায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণ আকস্মিকভাবে বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় সীমান্তের অন্য জেলাতেও তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এরপরই সীমান্তবর্তী অন্য জেলাগুলোতেও সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখা যায়।

এ বছরের ২০ মের দিক থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে। ওই সময় সারাদেশে যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার ছিল গড়ে ১০ ভাগের মতো। তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণের হার ৫০ ভাগে উঠে যায়। মে মাসের শেষ সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই ৬০ ভাগের মতো ছিল শনাক্তের হার।

এখন যা পরিস্থিতি
ডা: জাহিদ নজরুল চৌধুরী জানিয়েছেন, জুলাই মাসে গড় সংক্রমণ নেমে আসে ১৩ ভাগে। জাতীয় পর্যায়ে এই হার প্রায় ২৯ ভাগ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরু থেকে সাত দিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিনজন মারা গেছেন। এই সাত দিনে মোট শনাক্ত ২০০ জনের মতো। শনিবার নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৮ জন। সেই তুলনায় রাজশাহী ও বগুড়া জেলায় শনাক্ত ও মৃত্যুর হার বেশি।

যেসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভাইরলজি বিভাগের প্রধান ডা: সাবেরা গুলনাহার বলেছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগ রোগী ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের। কিন্তু এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে তেমন রোগী আসছে না।

তিনি বলেন, যেকোনো এলাকায়ই ভাইরাসের সংক্রমণ হলে তার প্রবণতাই হলো একটি পর্যায়ের পর নিজেই কমতে থাকে। ধরুন করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের সুস্থ হতে সাধারণত ১৪ দিন লাগে। এরপর নতুন করে আবার সংক্রমিত হয়ে অনেকে আসবেন। এভাবে হিসেব করলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বহু মানুষের ইতিমধ্যেই সংক্রমণ হয়ে গেছে। তাই এখন সংখ্যাটি কম।

তবে তিনি বলছেন, একদম গ্রাম পর্যায়ের মানুষজনের মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশির জন্য পরীক্ষা করাতে যাওয়ার হার কম। তারা হয়ত পরীক্ষার আওতার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। এছাড়া লকডাউনের একটা বিষয় তো রয়েছেই।

বাংলাদেশে দ্বিতীয় দফায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছিল দেশের প্রথম জেলা যেখানে লকডাউন দেয়া হয়। ২৫ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত জেলাটিতে দুই দফায় সাত দিন করে লকডাউন দেয়া হয়েছিল। যেটিকে বলা হয়েছিল সর্বাত্মক লকডাউন। দেশের অন্য অঞ্চল থেকে জেলাটিকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল। দোকানপাট বন্ধ রাখা ও মানুষজনের বাইরে বের হওয়া বন্ধ করতে সেখানে ২০টির মতো ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করেছে।

সিভিল সার্জন বলেন, হঠাৎ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অনেক বেশি মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই ভয় পেয়ে যায়। এটাও একটা কারণ যে তারা সাবধান হয়েছে, এটা আমরা লক্ষ্য করেছি।

সীমান্তে শুরুতে ভারত থেকে আসা ব্যক্তিদের পরীক্ষার ব্যাপারে ততটা গুরুত্ব না দেয়া হলেও সংক্রমণ অনেক বেড়ে গেলে পরে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা বাড়ানো হয়েছিল। সীমান্তগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে করোনাভাইরাস যেহেতু প্রতিনিয়তই তার ধরন বদলাচ্ছে তাতে নতুন করে আবারো সংক্রমণ বাড়বে না, তেমন কথা বলা যায় না। তথ্যসূত্র : বিবিসি।

এবিএস