স্বাধীন বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও বিরাটাকৃতির বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
গত ৪ জুন, ২০১৫-তে জাতীয় সংসদে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ২লাখ ৯৫ হাজার ১শ’ কোটি টাকার বাজেট ঘোষনা করেন অর্থমন্ত্রী।
প্রস্তবিত এ বাজেটকে গণমূখী বলে আখ্যায়িত করেছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি সুশাসন ছাড়া এ বাজেট বাস্তবায়ন অসম্ভব বলে মন্তব্য জাতীয় সংসদের বিরোধীদল জাতীয় পার্টির।
অন্যদিকে, কল্পনা বিলাসী ও কথামালার বাজেট উল্লেখ করে বিএনপি জানায়, এটি ভূয়া সরকারের ভূয়া বাজেট।
এ বাজেট গণবিরোধী বলেও আখ্যায়িত করে দলটি। একইসঙ্গে এ বাজেট আজ্ঞাবহ প্রশাসন লালনের বলে জানায় জামায়াতে ইসলামী।
প্রস্তাবিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ‘সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের স্বার্থ রক্ষাকারী’ বলে আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শঙ্কা সিপিডি’র।
কথামালার বাজেট বলে আখ্যায়িত করে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, এ বাজেটের ফলে নিত্য পণ্যের দাম প্রতিনিয়ত বাড়বে। ফলে জনগণ ভোগান্তির কবলে পড়বে।
তিনি বলেন, আগের বাজেটে জিডিপির হার ৬ শতাংশ ধরা হয়েছিল। এবার তা ৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। কিন্তু এটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলা হচ্ছে বলে বিএনপি মনে করে।
শিক্ষাখাতে যে ১০ শতাংশ ভ্যাট বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে তা বাতিল করার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি জানান তিনি।
এবাজেটেও কৃষি খাতের উন্নয়নের কথা বলা হলেও মূলত একে কৃষি, ছাত্র ও বিনিয়োগ বান্ধব বলা যায় না। এটি আসলে কল্পনা বিলাসী ও কথামালার বাজেট বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা নাহলে প্রস্তাবিত এ বাজেট বাস্তবায়ন অসম্ভব মন্তব্য করে সংসদে বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এ বাজেট হচ্ছে উচ্চাবিলাসী বাজেট।
আর এ বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর এ কাজটি না করা গেলে প্রস্তাবিত বাজেটের কাছাকাছি যাওয়াটাও অসম্ভব হয়ে পড়বে।
জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে দলীয় ও আজ্ঞাবহ প্রশাসন লালনের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করার আয়োজন করেছে। জনগণের ওপর শোষণ ও জুলুম চালিয়ে নিজেদের আখের গোছানোই প্রস্তাবিত বাজেটের মূল লক্ষ্য মনে করেন তিনি।
প্রস্তাবিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায় নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সম্মনীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
জাতীয় সংসদের প্রস্তাবিত ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের বাজেট পেশের পরই অতিরিক্ত ৫ শতাংশ শুল্ক কাটা শুরু করেছিলো মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো। আগের ১৫ শতাংশের সঙ্গে আরো ৫ শতাংশ যোগ হয়ে গ্রাহকদেরকে এখন ২০ শতাংশ চার্জ গুনতে হয়েছিলো।
এ বিষয়ে মোবাইল অপারেটর গ্রামীণ ফোনে রাত ১২টার পর থেকেই অতিরিক্ত ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক কেটে রাখা হয়েছিল।
বাংলালিংক-এর প্রিপেইড গ্রাহকের বিভিন্ন সংযোগে এমএমএস মাধ্যমে ৫ শতাংশ শুল্ক সম্পূরক আরোপের তথ্য জানানো হয়েছিল।
এমএমএস-এ লেখা আছে, মোবাইলের সব ব্যবহারের ওপর ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা আপনার সকল মোবাইল রেটের সঙ্গে প্রযোজ্য হয়।
যদিও পরে মোবাইল ফোন সেবায় সম্পূরক শুল্ক দুই শতাংশ কমানো হয়েছে। এর ফলে মোবাইল ফোনে কথা বলা, ইন্টারনেট ব্যবহার, ক্ষুদে বার্তা পাঠানোর (এসএমএস) ক্ষেত্রে খরচ কিছুটা কমে।
প্রস্তাবিত বাজেটে এ ধরনের সেবার উপর সম্পূরক শুল্ক পাঁচ শতাংশ করা হলেও ২৯ জুন সোমবার অর্থবিল পাস করার সময় অর্থমন্ত্রী এটি পাঁচ শতাংশ থেকে দুই শতাংশ কমানোর কথা বলেন।
যেসব পণ্যের শুল্ক ও কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে-সিম কার্ড, ফোর স্ট্রোক মটরসাইকেল, মটরসাইকেলের সিট, ইলেকট্রিক ব্যাটারিচালিত মোটর গাড়ি, পোল্ট্রি পণ্য, হিমায়িত মৎস্য, টিনজাত মাছ ও মাছের টুকরো বা গুঁড়ো, মাখন ও অন্যান্য দুগ্ধজাত চর্বি ও তৈল, সুপারি, ব্লাক টি (কালো চা), পেইন্ট, বার্নিশ (এনামেল, লেকার ও ডিস্টেম্পার), মটর গাড়ির টায়ার, অমসৃন হীরা, ইমিটেশন জুয়েলারি, কাস্ট আয়রনের তৈরি টিউব পাইপ, গ্যাস পাইপ লাইনে ব্যবহৃত লাইন পাইপ, যার ব্যাস ৮ ইঞ্চির কম, চার স্ট্রোক বিশিষ্ট অটোরিক্সা ও থ্রি হুইলারের ইঞ্জিন, দুই স্ট্রোকবিশিষ্ট অটোরিক্সা বা থ্রি হুইলারের ইঞ্জিন, বিভিন্ন ব্যাটারি, সাউন্ড রেকর্ডিং বা রিপ্রোডিউসিং অ্যাপারেটাস, সিরামিকের বাথ ট্যাব ও জাকুজি, শাওয়ার, শাওয়ার ট্রে, আমদানি করা সফটওয়্যার, স্টেইনলেস স্টিলের সিঙ্ক, ওয়াশ বেসিন, ওয়াটার ট্যাপ ও বাথরুমের অন্যান্য ফিটিংস, এলুমিনিয়াম ও কপারের তৈরি স্যানিটারি ওয়্যার ও এর যন্ত্রপাতি, গ্যাস জ্বালানির উপযোগী রান্নার তৈজসপত্র, স্টেইনলেস কিচেন ও টেবিল ওয়্যার, বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা কাঁচ, পকেট সাইজ রেডিও ক্যাসেট প্লেয়ার, দ্বি অক্ষ বিশিষ্ট তার ও অন্যান্য দ্বি-অক্ষ বিশিষ্ট বৈদ্যুতিক পরিবাহী, রিভলবার ও পিস্তল, আমদানি করা রেশম পণ্য ইত্যাদি।
সিম কার্ডে সম্পূরক শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। ফোর স্ট্রোকবিশিষ্ট বিযুক্ত মোটরসাইকেলে সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ করা হয়েছে।
আর ইলেকট্রিক ব্যাটারিচালিত মটরগাড়ি আমদানিতে কোনো ধরনের শুল্ক ছিল না, যা প্রস্তাবিত বাজেটে ২০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে।
মটরগাড়ির টায়ারে কোনো সম্পূরক শুল্ক ছিল না, প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছেন।
পেইন্ট, বার্নিশ ও লেকারে ১৫ শতাংশ থেকে সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একইভাবে অন্যান্য পণ্যে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। যার কারনে দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে জন জীবন।
এসএইচ





