আমাদের দেশের শহর নগর গ্রাম সর্বত্রই নিরাপদ পানির সংকট বেড়ে চলছে। এক পরিসংখ্যান হইতে জানা যায়, দেশের বিশ শতাংশ মানুষ বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতাবঞ্চিত। রাজধানী ঢাকাসহ শহরাঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার বিবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তবে বিষয়টি ইতোমধ্যে বহুমাত্রিক এবং বহু বিস্তৃতরূপ পরিগ্রহ করছে। কোথাও সমস্যা লবণাক্ততার, কোথাও আর্সেনিকের আধিক্য, কোথাও বা ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নামিয়া গিয়াছে অস্বাভাবিক পর্যায়ে।

অন্যদিকে নদী খালের পানির দূষণ এতটাই তীব্র যে, উহা স্পর্শ করাও অনেক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক।

পত্রিকায় বিভিন্ন প্রকাশিত রিপোর্ট হইতে জানা যায়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেশিরভাগ নলকূপের পানিতেই আর্সেনিকের আধিক্য ধরা পড়িয়াছে। নদী-নালাতেও বিশুদ্ধ পানি নাই। বাধ্য হইয়া মানুষ আর্সেনিক দূষিত পানিই পান করিতেছে। এক্ষণে শত শত মানুষ আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সমস্যাটি বেশি হইলেও, অন্যন্য এলাকাতেও আর্সেনিকের সমস্যা আছে। অন্যদিকে, দেশের ৪টি নদীপ্রণালির সবগুলি নদীই আজ কমবেশি সংকটাপন্ন। খালবিল ও হাওর-বাঁওড়ের অবস্থাও সঙ্গীন। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের অনিবার্য অভিঘাতে বেড়ে চলছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা।

ফলে দেখা দিতে শুরু করছে লবণাক্ততার ক্রমসমপ্রসারমান সমস্যা। উপকূলীয় ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেও লবণের আধিক্য দেখা দিতে শুরু করছে বলে কোনো কোনো গবেষণা রিপোর্টে উল্লেখ করা হইয়াছে। এমন কি ঢাকা ও ইহার পার্শ্ববর্তী জেলা সমূহেও এমন বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিচ্ছে।

পানির সমস্যা যে কেবল বাংলাদেশের তাহা অবশ্য নহে। বলতে গেলে সমস্যাটি বিশ্বব্যাপী।

বলা হয়ে থাকে যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি কখনও বাধে তাহলে ইহা বাধবে পানি নিয়ে। বিশ্ব জুড়িয়া পানি সংকটের কারণ যতটা না প্রকৃতিগত, তাহার চাইতে অনেকবেশি মনুষ্য সৃষ্ট। বিশ্বের ২৬০টি দীর্ঘ ও বৃহৎ নদী দুই বা ততোধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত।

নদ-নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়াও পরিবেশ-প্রতিবেশগত আরও নানান কারণে দুনিয়ার দেশে দেশে বিশুদ্ধ পানির সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে এর মধ্যে।

মোটকথা, পানির যে সমস্যা তাহার সমাধানের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।

এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবে সকলের অংশগ্রহণে একটি পরিকল্পিত এবং সমন্বিত পানিব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশে প্রতিবত্সর অঞ্চলভেদে ১১১০ মিলিমিটার হইতে শুরু করে ৫৬৯০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এটা মোটেও কম নয়। কিন্তু বিপুল এই বৃষ্টির পানির সামান্যই আমরা সদ্ব্যবহার করিতে পারি। সিংহভাগ পানিই দূষিত হয়ে যায় , সংরক্ষণ করা হয় না।

পানি ধরিয়া রাখিবার মত জায়গা নাই। নদীনালা খাল বিল ভরাট হয়ে যায়, সেইকথা আগেই বলা হয়েছে। পুকুর দীঘিও ভরে ফেলছে।

এমতাবস্থায় খাল ও বিল বাঁওড় খনন ও সংস্কার করা জরুরি। পারিবারিক এবং সরকারি মালিকানাধীন পুকুর সমূহ সংরক্ষণ করতে হবে। সেচ এবং গৃহস্থালি কাজে সারফেস ওয়াটারের ব্যবহার বাড়ানো গেলে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে।

এতে মিঠা পানির সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়া আসা সম্ভব হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

উল্লেখ্য, সারফেস ওয়াটার অর্থাৎ নদী খাল , পুকুর ও বিল ঝিলের পানিতে আর্সেনিক নাই। এই পানি দূষণমুক্ত; অন্তত শোধনযোগ্য পর্যায়ে রাখা গেলে খাবার পানির সমস্যা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসতে পারে।

এর পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন নগর, মহানগর ও পৌর এলাকাসমূহের বাসিন্দাগণের পানি ব্যবহারে সচেতনতার পরিচয় দেওয়া একান্ত কর্তব্য। বিশুদ্ধ কিংবা পরিশোধনযোগ্য পানির ভাণ্ডার অফুরন্ত নয়। পানির ভূ উপরিস্থ এবং ভূ-গর্ভস্থ উভয় সংকট দেখা দিতে শুরু করছে। কাজেই পানির অপচয় রোধ করতে হবে। সর্বত্র পানির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষের যেমন সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে, তেমনই দরকার নদী, খাল ও বিলের সুরক্ষা।  

ওএফ