মালয়েশিয়ায় ফের সাঁড়াশি অভিযানে সহশ্রাধিক অবৈধ অভিবাসীকে আটক করেছে সে দেশের ইমিগ্রেশন পুলিশ। শনিবার মালয়েশিয়া সময় দুপুর ১২টা থেকে শুরু করে ৩টা পর্যন্ত কোতারায় বাংলা মার্কেট, পাছার সিনি, চায়না টাউন, কোতারায়া মাইডিন এলাকা থেকে অভিযান চালিয়ে অন্তত ১২শ অবৈধ অভিবাসীকে আটক করেছে পুলিশ।
মুহূর্তের মধ্যে খবরটি ছড়িয়ে পড়লে দ্বিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান পথচারিরা। নতুন করে অভিযান শুরু হওয়াতে প্রবাসীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। গতকাল সে দেশের চিনাদের নতুন বছরের (সরকারি) ছুটি থাকায় শ্রমিকরা বাংলা মার্কেটে ছুটে এসেছিলেন শপিং করতে। বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ থেকে সাগরপথে আসা যেসব শ্রমিকের কোনো কাগজপত্র ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই সেসব শ্রমিককে বেত্রাঘাতের মতো কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। তবে যারা বৈধভাবে এসে বিভিন্ন কারণে অবৈধ হয়েছে তাদের জন্য এই শাস্তি প্রযোজ্য নয়। আটকের ব্যাপারে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করা হলে কমিশন কর্তারা বলেন, আটকের কোনো খবর এখনও পাননি তারা।
এদিকে মালয়েশিয়ায় অবৈধ বিদেশী শ্রমিকরা ধরপাকড় অভিযানে গ্রেফতার হয়ে দেশটির বিভিন্ন ডিটেনশন ক্যাম্প ও কারাগারে বন্দি রয়েছেন। থাকা-খাওয়ার কষ্টের কারণে অনেকে এরই মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ইমিগ্রেশন ক্যাম্পগুলোতে বেশির ভাগ শ্রমিকের দিন কাটাতে হচ্ছে মানবেতরভাবে।
যারা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন এবং গ্রেফতার এড়িয়ে হাইকমিশন থেকে ট্রাভেল পাস সংগ্রহের জন্য দালালদের শরণাপন্ন হচ্ছেন, তাদের বেশির ভাগ প্রতারিত হচ্ছেন বলে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শ্রমিকরা জানান, ২১ জানুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে স্মরণকালের বিশেষ এই ধরপাকড় অভিযানে পুলিশ, রেলা ও ইমিগ্রেশনের হাতে প্রতিদিন শত শত শ্রমিক কুয়ালালামপুর, পেনাং, জহুরবারু, মালাক্কাসহ বিভিন্ন প্রদেশ থেকে গ্রেফতার হয়েছেন।
পলাতক শ্রমিকদের দাবি, অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি বাংলাদেশী শ্রমিক ধরা পড়ে বর্তমানে দেশটির ১১টি ডিটেনশন ক্যাম্পসহ বিভিন্ন কারাগার ও থানা কম্পাউন্ডে আটক রয়েছেন, যা প্রতিদিন দেশটির শীর্ষ টেলিভিশন চ্যানেল ও পত্রিকাগুলোতে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে।
ওইসব প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, গ্রেফতার হওয়ার সাত দিনের মধ্যে আটক শ্রমিকদের নিজ উদ্যোগে টিকিট কেটে দেশে ফেরত যেতে হবে। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কতজন শ্রমিক ট্রাভেল পাসে দেশে ফেরত এসেছেন সেই হিসাব মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে পাওয়া যায়নি।
মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত কমিশনের লেবার কাউন্সিলর (শ্রম) মন্টু কুমার বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি  বলেন, তার  জানা মতে মালয়েশিয়ায় শুরু হওয়া অবৈধ শ্রমিক ধরপাকড় অভিযানে এ পর্যন্ত ২৭৫ জন ধরা পড়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে আছেন। তাদের দেখতে দু-একটি ক্যাম্প ভিজিট করা হয়েছে।
আমরা তাদের সঙ্গে দেখা করে ফরম পূরণ করার জন্য দিয়ে এসেছি। পরে ওগুলো ইমিগ্রেশন থেকে আমাদের কাছে পাঠাবে। এরপর দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে। মালয়েশিয়ায় এ পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজারের বেশি শ্রমিক গ্রেফতার হয়েছে, তাদের দেয়া এমন তথ্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাছে আটকের যে তথ্য রয়েছে আমি সেটাই বললাম।
শনিবার কুয়ালালামপুর বুকিত জলিল ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক শ্রমিক জয়নালের স্বজন মালয়েশিয়ার কোতারায়া এলাকার এক ব্যবসায়ী এ প্রতিবেদককে জানান, ডিটেনশন ক্যাম্পে জয়নালকে রাখা হয়েছে। ওই ক্যাম্পটি খুবই ছোট্ট। কিন্তু সেখানে শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেশি, যার কারণে সবার ঘুমানো কষ্ট হচ্ছে।
এক কাপড়ে তাদের থাকতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন ক্যাম্পগুলোতে শ্রমিকদের যে খাবার দেয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম।
তিনি খাবারের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ভোর ৫টার দিকে একজনকে দুটি বিস্কুট ও পলি প্যাকেটে অর্ধেক কাপ রং চা দেয়া হয়। দুপুরে পলিথিনে মোড়ানো অল্প ভাত ও দুই পিস ভাজা শুঁটকি মাছ আর রাতের খাবারে দেয়া হয় অর্ধেক ডিম ও অল্প পরিমাণ ভাত। এই খাবার খেয়েই তাদের কোনো মতে জীবন কাটাতে হচ্ছে।
ওই ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত কিছুর পরও প্রতিদিন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন ম্যানেজ করে ও কক্সবাজার এবং টেকনাফ দিয়ে ট্রলারে করে অবৈধভাবে লোক আসছে মালয়েশিয়ায়।
মালয়েশিয়ার জঙ্গলে পলাতক জীবন কাটানো শ্রমিক মেহেদী হাসান শনিবার তার অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি বলেন, হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে মালয়েশিয়ায় আজ বহু শ্রমিক বৈধ হওয়ার সুযোগ পেয়েও বঞ্চিত হয়েছেন। এবার গ্রেফতার অভিযান শুরুর পর দালাল চক্র নতুন মিশনে নেমেছে। প্রতারকরা কারাগারে আটক শ্রমিকদের দেশে ফেরত পাঠাতে আউট পাস ও ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করে দেয়ার কথা বলে তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে হাজার হাজার রিংগিট আদায় করছে। এরপর গা-ঢাকা দিচ্ছে।
দালালদের প্রতারণায় অনেক শ্রমিক ও তাদের স্বজন নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। এই বিষয়টি হাইকমিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। নতুবা এই চক্রের খপ্পরে পড়ে অনেকেই পথে বসবে। 
[b]
ঢাকা, ২ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম)//ইএইচ[/b]