‘সরকার প্রাকৃতিক গ্যাসকে সম্পদ হিসেবে গণ্য করে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের মূল্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। সরকারি নির্দেশনাকে ভিত্তি ধরে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। আর সেই সুরেই গাইছে অন্য গ্যাস কোম্পানিগুলো ‘

রাজধানীর কারওয়ানবাজারে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে গণশুনানিতে কনজ্যুমার এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানী উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম এ সব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের যে চিঠির ওপর ভিত্তি করে তিতাস তাদের গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে তা ভিত্তিহীন।’

রাজধানীর কারওয়ানবাজারে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি শুরু হয়।

বিইআরসি চেয়ারম্যান এ আর খান, সদস্য ড. সেলিম মাহমুদ, প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন, রহমান মুরশেদ ও মাকসুদুল হক গণশুনানি গ্রহণ করছেন। শুনানিতে ক্যাবের জ্বালানী উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম, বুয়েটের অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম, সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকিসহ ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত আছেন।

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাবে তিতাস গ্যাসের মতোই একইভাবে গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহৃত এক চুলার বর্তমান দর ৪০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৮৫০ টাকা এবং দুই চুলার বর্তমান দর ৪৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেছে।

মঙ্গলবার সকালে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ও বিকেলে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে এ দুটি কোম্পানি গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত গ্যাসসহ অন্যখাতে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্য একই হারে বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখে।

প্রস্তাব অনুযায়ী বিদ্যুৎ খাতে প্রতি হাজার ঘন মিটার গ্যাসের বর্তমান দর ৭৯.৮২ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৮৪ টাকা, সার উৎপাদনে ৭২.৯২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ার ১১৮.২৬ টাকা থেকে ২৪০ টাকা, বাণিজ্যিকে ২৬৮.০৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ টাকা, চা বাগান ১৬৫.৯১ থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা, সিএনজি ৮৪৯.৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ১৩২.৬৭ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠির ওপর ভিত্তি করে বিইআরসিতে নতুন করে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব রাখে। দাবি করা হয়-‘সরকার প্রাকৃতিক গ্যাসকে সম্পদ হিসেবে গণ্য করে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের মূল্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করেছে।’ কিন্তু চিঠিটি দেওয়া হয়েছে পেট্রোবাংলাকে।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত তিতাস গ্যাস বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর শুনানিতে অংশ নিয়ে ক্যাবের জ্বালানী উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘পেট্রোবাংলা থেকে আপনারা (তিতাসকে) লিখিতভাবে নাকি মৌখিক নির্দেশ পেয়েছেন।’

শামসুল আলম বলেন, ‘তাহলে এই মৌখিক নির্দেশটা কে দিলেন?’

জবাবে তিতাসের এমডি ও ডিজিএম কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

তখন শামসুল আলম বলেন, ‘আপনারা বায়বীয়ভাবে কার মৌখিক নির্দেশে কাজ করছেন। এটা তো আইনের লঙ্ঘন। আপনাদের প্রস্তাবটাই ভিত্তিহীন।’

বুধবার বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানির শুনানিতে অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘গ্যাস কোম্পানিগুলোর আবেদন একইভাবে অগ্রহণযোগ্য ও অনুপোযুক্ত।’

যেহেতু আবেদনগুলো ত্রুটিযুক্ত তাই আবেদনগুলো আইনি বিবেচনায় বিইআরসিকে খারিজের আবেদন জানান তিনি।

মঙ্গলবার তিতাস কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবের সব কিছু বিবেচনা করে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বিদ্যমান দরে তিতাস গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর প্রয়োজন নেই বলে জানায়।

অন্যদিকে, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাব পর্যালোচনা শেষে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি জানায়, গ্যাসের পণ্য মূল্য প্রস্তাবিত প্রতি হাজার ঘনফুট ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হলে ৫.৫৯ শতাংশ দাম বৃদ্ধির প্রয়োজন পড়বে।

কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি তিতাসের প্রস্তাবের বিশ্লেষণ করে জানায়, তিতাস ২০১৩-১৪ অর্থবছরে অবৈধ গ্রাহকদের থেকে ১৭০ মিলিয়ন টাকা আয় করেছে। যা গ্যাস বিক্রি খাতে না দেখিয়ে অপরেশনাল আয় দেখিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিয়েছে। তিতাস ২০১৩-১৪ অর্থবছরে করপরবর্তী নিট মুনাফা করেছে ১ হাজার ২৬ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মুনাফার ভিত্তিতে পরিচালনার জন্য প্রতি ঘনমিটারে ২৯ পয়সা প্রয়োজন। বর্তমানে ৯৭ পয়সা আয় করছে। এর মধ্যে প্রতি ঘনমিটারে বিতরণ রেট (মার্জিন) থেকে ৫৫ পয়সা এবং ৪২ পয়সা পরিচালন আয়, এফডিআর সঞ্চালন আয় থেকে। যে কারণে পণ্যমূল্য নির্ধারণ করা হলেও তিতাসের গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রয়োজন পড়বে না।

ক্যাবের জ্বালানী উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, ‘তিতাস এখনই মুনাফা করছে। বেতনের বাইরে কর্মচারীরা প্রফিট বোনাস হিসেবে ২ লাখ টাকার মতো পাচ্ছে। একই সঙ্গে শেয়ারহোল্ডাররা লভ্যাংশ পাচ্ছে। দাম বাড়ালে সেই টাকা কর্মচারী ও ১৬ হাজার শেয়ারহোল্ডারের পকেটে চলে যাবে। দাম বাড়ালে সরকার বিপদে পড়বে। দয়া করে সরকারকে আপনারা বিপদে ফেলবেন না।’

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাবের ওপর শুনানি শেষে বিকেলে কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি নেওয়া হবে। শেষদিন বৃহস্পতিবার সকালে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন এ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড ও বিকেলে সুন্দরবন গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রস্তাবের বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

এর আগে সোমবার প্রথম দিন গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের হুইলিং চার্জ বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

এএইচ