বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি)-এ ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ আয়োজিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ প্রকৌশলীদের স্মরণে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, আজকে ফ্যাসিবাদের দোসররা যে স্পর্ধা দেখাচ্ছে, তা সম্ভব হয়েছে বিপ্লবীদের ভুলের কারণে। আর প্রথম ভুল ছিল বিপ্লবীদের কয়েকজনের সরকারে যাওয়া। এই কথাটা আজ পর্যন্ত কেউ প্রকাশ্যে বলেনি। আমি আজ প্রকাশ্যে বলছি—বিপ্লবীদের কয়েকজনের সরকারে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল ভুল।
তিনি বলেন, ইতিহাসে সফল বিপ্লবের উদাহরণ হিসেবে কিউবার বিপ্লবকে দেখা যায়। “ফিদেল কাস্ত্রো, চে গেভারা ও রাউল কাস্ত্রো বিপ্লবের মাধ্যমে বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করার পর সবাই মিলে বিপ্লবী সরকার গঠন করেছিলেন। কিন্তু আমাদের এখানে কয়েকজন বিপ্লবী বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি সরকারের অংশ হয়ে গেছেন। এটাই ছিল ভুল সিদ্ধান্ত।”
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি সঠিক বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আমি মনে করি, ইউনূস সাহেবের সিলেকশন ওয়াজ পারফেক্ট। তার সব কর্মকাণ্ড বা বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত নই। কিন্তু ওই মুহূর্তে দেশ পরিচালনার জন্য তার বিকল্প কেউ ছিল না। সেই সিদ্ধান্ত শতভাগ সঠিক ছিল।”
তার ভাষায়, বিপ্লবীদের উচিত ছিল সরকারে না গিয়ে বাইরে থেকে ‘জুলাই বিপ্লবের দর্শন’ তৈরি করা, একটি বিপ্লবী দল গঠন করা এবং রাষ্ট্র পরিবর্তনের আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণ করা। “ক্ষমতার ভেতরে গেলে যেমন সফলতার কৃতিত্ব নিতে হয়, তেমনি ব্যর্থতার দায়ও নিতে হয়। আজ সেই দায়ও তাদের নিতে হচ্ছে।”
মাহমুদুর রহমান বলেন, তিনি ২০২৫ সালের শুরুতেই ‘জুলাই বিপ্লবের দর্শন’ নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। তবে সেটি তার ব্যক্তিগত লেখা। “বিপ্লবীদের নিজেদের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট জুলাই দর্শন আসা উচিত ছিল। আজও সেটা হয়নি। আজও নির্ধারণ করা যায়নি—এটা আন্দোলন, অভ্যুত্থান নাকি বিপ্লব। আমি শুরু থেকেই এটিকে বিপ্লব বলেছি। কারণ, এটি শুধু সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না; এটি রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের আন্দোলন।”
তিনি বলেন, “বিপ্লব কখনো ব্যর্থ হয় না। বিপ্লব একটি চলমান প্রক্রিয়া। আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ মনে হলেও প্রকৃত অর্থে বিপ্লব ব্যর্থ হয় না।”
জুলাই শহীদদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “শহীদদের আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যাবে না। শহীদদের জাতি ভুলবে না। যতদিন জুলাই যোদ্ধারা বেঁচে থাকবে, ততদিন শহীদদের স্মৃতি অম্লান থাকবে।”
বিএনপির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহমুদুর রহমান বলেন, “আমি কোনো অনুষ্ঠানে একবার গেলে অনেক সময় দ্বিতীয়বার আমন্ত্রণ পাই না। বিএনপির ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে। কারণ, আমি নেতাদের সামনে এমন কথা বলেছি, যা তাদের ভালো লাগেনি। অনেকে মনে করেন আমি তাদের বিরোধী। কিন্তু আমি কারও পক্ষের নই, কারও বিপক্ষেও নই। আমি শুধু জুলাই শহীদ ও জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষের মানুষ। তারা বিএনপি, জামায়াত কিংবা এনসিপি—যে দলেরই হোক না কেন।”
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে তিনি বলেছিলেন, “কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার মতো ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন সম্ভব নয়; এর জন্য বিপ্লব প্রয়োজন।” তার দাবি, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সেই বক্তব্য ভাইরাল হয়েছিল এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার সেই ধারণা বাস্তবে রূপ পেয়েছে।
তিনি বলেন, “জুলাইয়ের বিপ্লবের কারণেই আমি দেশে ফিরতে পেরেছি, মায়ের জানাজায় অংশ নিতে পেরেছি এবং নিজ হাতে তাকে কবরে নামাতে পেরেছি। এই বিপ্লব না হলে সেটা সম্ভব হতো না।”
জুলাই যোদ্ধাদের উদ্দেশে মাহমুদুর রহমান বলেন, “তোমরা ঐক্যবদ্ধ থাকো। বিভিন্ন সংগঠন বা নামে বিভক্ত না থেকে সবাই জুলাই বিপ্লবের ছাতার নিচে এক হও। সংসদীয় রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী দল থাকবে, কিন্তু জুলাই বিপ্লবের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা হয়নি। তবে এখনো সময় আছে।”
জুলাই বিপ্লবের তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমত, এটি ছিল একটি নিরস্ত্র বিপ্লব। “আবু সাঈদের মতো নিরস্ত্র তরুণরা বুক পেতে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীতে এমন উদাহরণ বিরল।”
দ্বিতীয়ত, এটি ছিল সম্পূর্ণ দেশীয় বা ঘরোয়া বিপ্লব। তার ভাষায়, “এই বিপ্লবে কোনো বিদেশি শক্তির ভূমিকা ছিল না। ফলে ভবিষ্যতে কোনো দেশ দাবি করতে পারবে না যে, তারা এই বিপ্লব ঘটিয়েছে।”
এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ভারতের সহায়তার কারণে এখনো ভারতীয় রাজনীতিকরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিজেদের কৃতিত্বের দাবি করেন। তিনি বলেন, “প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সম্প্রতি ভারতের পার্লামেন্টে বলেছেন, তারা পাকিস্তানকে দুই ভাগ করেছিলেন। এই ধরনের বক্তব্যই দেখায়, তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের ক্ষেত্রে কোনো বিদেশি শক্তি এমন দাবি করতে পারবে না।”
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে তিনি বলেন, “এই বিপ্লবের কোনো একক নেতৃত্ব ছিল না। সবাই নেতা ছিল, সবাই যোদ্ধা ছিল। এটাই ছিল এর সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য।”
তিনি বলেন, “এই তিনটি বৈশিষ্ট্য যদি আমরা ধরে রাখতে পারি, তাহলে এই বিপ্লব কখনো পরাজিত হবে না, ব্যর্থও হবে না।”
বক্তব্যের শেষ দিকে মাহমুদুর রহমান বলেন, “জুলাই যোদ্ধারা যখনই আমাকে ডাকে, আমি সাড়া দিই। কারণ, এই বিপ্লব ছিল আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, জীবদ্দশায় সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পেরেছি।”
নিজের আপসহীন অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি জীবনে কোনো আপস করিনি, আপস করতে জানিও না। বয়স যতই হোক, প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালী হোক, লড়াইয়ের ময়দানে আমাকে সবসময় পাশে পাবে ইনশাআল্লাহ।”
প্রকৌশলী মো. আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ এমপি, ঢাকা মহানগর উত্তর এনসিপির আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ ও প্রফেসর ড. প্রকৌশলী মাকসুদ হেলালীসহ অনেকে।
এমএম