জঙ্গিরা শুধু চাপাতি জাতীয় অস্ত্র নয়, অত্যাধুনিক অস্ত্রও এখন তাদের হাতে রয়েছে। পুলিশ গত কয়েক দিনে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে যেসব অস্ত্র উদ্ধার করেছে তার বেশির ভাগই অত্যাধুনিক ক্ষুদ্র অস্ত্র। সন্ত্রাসীদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকায় পুলিশের সাধারণ কনস্টেবল সাধারণ মানের রাইফেল দিয়ে সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করতে হিমশিম খায়।
অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের মনোবলেও ভাটা পড়ে।পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী : সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে গত জানুয়ারি মাসে ৪টি কাটা রাইফেল, ৩টি ডিবিবিএল, ৩টি এসবিবিএল, ৭টি বিদেশি রিভালভার, ৩টি দেশি রিভালভার, ৫১টি বিদেশি পিস্তল, ৮টি দেশি পিস্তল, ১১টি বন্দুক, ১২টি পাইপগান, ১৩টি শাটারগান, ১৭টি এলজি, ২টি এয়ারগান, ৮টি ওয়ান শুটার গানসহ মোট ১৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে।
অন্যান্য অস্ত্রসহ মোট ২৯০টি অস্ত্র ও ৫০০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসব অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ২৯৫ জনকে গ্রেফতার এবং মামলা হয়েছে মোট ১৪৭টি। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে উদ্ধার করা হয়েছে : ২টি এলজি, ৩টি এম-১৬-এ-১ রাইফেল, ১টি চাইনিজ এসএমজি, ১টি ৩০৩ রাইফেলসহ বিভিন্ন ধরনের মোট ৫৫৬টি অস্ত্র, ৪৯ হাজারের ও বেশি গুলি। এ সময় ৩১৫ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত মার্চ মাসে বিভিন্ন ধরনের ৪৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০৮৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার এবং ২৭৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এপ্রিল মাসে ৩৯৯টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৬৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা এবং ২৮২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মে মাসে ৪৪১টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৪৬৭৬টি গুলি উদ্ধার এবং ২৬৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত জুন মাসে ৬৭২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১ হাজার ৯২৭টি গুলি উদ্ধার এবং ৪৫০ জনতে গ্রেফতার করা হয়েছে। জুলাই মাসে অস্ত্র ৪৭৫টি, গুলি ১ হাজার ৫৭৪টি উদ্ধার এবং ২৮৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায় : সন্ত্রাসীরা এসব অস্ত্র বিভিন্ন উৎস থেকে অবৈধভাবে কিনে থাকে। এসব অবৈধ অস্ত্রের বেশির ভাগই সীমান্ত পথে আশপাশের দেশ থেকে পাচার হয়ে আসে। সন্ত্রাসীরা এসব অবৈধ অস্ত্র চড়া দামে কিনে বলে পুলিশের সূত্র জানায়।পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী সীমান্ত এলাকায় প্রতিটি পিস্তল বা রিভলভার ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ঢাকায় পেঁৗছার পর সে পিস্তলের বিক্রমূল্য ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা হয়ে যায়। কাটা রাইফেলসহ অন্যান্য আগ্নেস্ত্র লাখ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে। সীমান্ত থেকে সড়কপথে এসব অস্ত্র ঢাকায় পেঁৗছে। এসব অস্ত্র বহনের জন্য অনেক যুবক ও কোন কোন ক্ষেত্রে তরুণীদের ব্যবহার করা হয়। দুই হাত কাটা এক ব্যক্তি সম্প্রতি অস্ত্র পরিবহনের সময় গ্রেফতার হয়েছে।
জঙ্গিরা এসব অস্ত্র-বিস্ফোরক কেনাবেচাও করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও বগুড়া এলাকা দিয়ে চোরাই পথে আসা পিস্তল বেশি কেনাবেচা হচ্ছে। দামও বেশি। এলাকাটিকে ডেঞ্জার জোন হিসেবে অনেকে চিহ্নিত করছে। জঙ্গিরা এসব পথে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আনে। পুলিশের গোপন প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, জঙ্গিরা স্থলপথে ও জলপথে সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র আনে। সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও বিস্ফোরক চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল শিবগঞ্জ এলাকাল ঢুকে। সেখানে মজুত রাখার পর সুযোগ বুঝে তা দেশের বিভিন্ন স্থানে পেঁৗছানো হয়। নওগাঁ, জয়পুরহাট ও বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই সব অস্ত্র পেঁৗছে যায়।
সেখান থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে অস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছে চলে যায়। আবার জঙ্গিরা অস্ত্র বেচাকেনা করে টাকা সংগ্রহ করে। এভাবে দেশের বিভিন্ন পথে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কাছে চাহিদামতো অস্ত্র পেঁৗছে যায়। অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানি চক্র সন্ত্রাসীদের চাহিদামতো অস্ত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে সন্ত্রাসীদের কাছে বিক্রি করে। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বেনাপোল, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন সীমান্তপথে অস্ত্র দেশে ঢুকছে। রাজধানীর বাড্ডা, মিরপুর, পুরনো ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র কেনাবেচা হয়। এসব এলাকায় অহরহ অবৈধ অস্ত্র পুলিশের কাছে ধরাও পড়ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (গোয়েন্দা)ডিসি মিডিয়া মাসুদুর রহমান বলেন, পুলিশের অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টিম অস্ত্রবাজ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে কাজ করছে। গত জুন মাসে উত্তরা দিয়াবাড়ি খাল থেকে ১১টি অস্ত্র বোঝাই ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ওই ব্যাগগুলো থেকে ৯৭টি পিস্তল, ৪৬২টি ম্যাগাজিন ও ১০৬০টি গুলিসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধারকৃত অস্ত্রের চালানোর মধ্যে অধিকাংশ অস্ত্র চীনের তৈরি বলে পুলিশ জানিয়েছে।পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের এডিশনাল ডিআইজি নিশারুল আরিফ সংবাদকে ফোনে জানান, চলতি বছর সীমান্ত দিয়ে দেশে আনার সময় অনেক পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ চোরাচালানি চক্র পিস্তল আনা-নেয়া করে। সম্প্রতি দুই হাত কাটা এক যুবক অস্ত্র বহন করে আনার সময় গ্রেফতার হয়েছে। তার কোমর থেকে অত্যাধুনিক পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে।পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্তি ডিআইজি মো. আলি মিয়া সংবাদকে মুঠোফোনে জানান, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকা- প্রতিরোধে এবং জঙ্গি ও মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে বিভিন্ন সময় ১৩টি জেলায় কম্বিং অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছে।
সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।সূত্র জানায়, অপরাধের ধরন পরিবর্তন হওয়ায় সন্ত্রাসীরা কৌশল পরিবর্তন করছে। অনেক সন্ত্রাসী অস্ত্র ভাড়া দিচ্ছে। আগে গ্রুপ সন্ত্রাসী থাকলেও এখন বিচ্ছিন্নভাবে ক্যাডারা রাজনৈতিক আশ্রয়ে সন্ত্রাসী কর্মকা- চালাচ্ছে। ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করতেও অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি মিডিয়া শহিদুর রহমান বলেন, সামনে কোরবানির ঈদে দেশবাসী যাতে শান্তিতে নির্বিঘ্নে ঈদ করতে পারে তার জন্য অস্ত্রবাজ ও সন্ত্রাসী ধরপাকড় অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি মেট্রোপলিটন শহর ও বিভাগের অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার চলছে।
এসএ





