ট্যাংকারডুবির পর ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়ায় এরই মধ্যে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সুন্দরবনে। জলাশয়ের মাছ-কাঁকড়াসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী মরে ভেসে উঠছে। শ্বাসমূল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কুকড়িয়ে যাচ্ছে গাছ।

সরেজমিনে মংলার শ্যামা নদীর চাঁদপাই রেঞ্জ ও এর আশেপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে মাছ ও কাঁকড়া মরে তীরে ভেসে আসছে। এমনকি জেলেদের জালে ধরা পড়া কাঁকড়ার গায়ে তেল লেগে আছে। গাছের শ্বাসমূল তেলে পুরোপুরি ঢেকে গেছে। গাছগুলোর পাতা-ডাল কুকড়িয়ে মারা যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলেও জানা গেছে, সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে ফার্নেস অয়েলের প্রভাবে মাছ মরে ভেসে উঠছে। এমনকি চাঁদপাই রেঞ্জ অভয়ারণ্যে অক্সিজেন নেবার জন্য এখন আর মাছ ভেসে উঠতে দেখা যাচ্ছে না।

সুন্দরবনের মৃঘামারী খালে কথা হয় জেলে সোহাগের সঙ্গে। কাঁকড়ার গায়ে ফার্নেস অয়েল লেগে আছে দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক কাঁকড়া মরে ভেসে উঠছে। যেসব কাঁকড়া আমরা ধরছি সেগুলোর গায়েও তেল লেগে আছে। কাঁকড়া ধরে নিয়ে বাসায় রাখার কিছুক্ষণ পরই সেগুলো মারা যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ৩/৪টি কাঁকড়া ধরেছি। অন্য সময়ের তুলনায় এখন কাঁকড়া অনেক কম ধরতে পারছি। বনবিভাগে ২০০ টাকা দিয়ে কাঁকড়া ধরতে এসেছি। এই টাকাও এখন উঠছে না।’

তিনি বলেন, ‘আগে নদীতে মাছ, ডলফিন, শুশুক ভেসে উঠে অক্সিজেন নিতো। তেল ভাসার পর এখন নদীতে সেগুলো আর দেখা যাচ্ছে না।’

জেলে আনোয়ারের স্ত্রী শাহীনা আক্তার বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে প্রতিদিন মাছ ধরতে নদীতে যাই। কিন্তু দুর্ঘটনার পর আর যেতে পারছি না। সন্তানদের নিয়ে না খেয়ে থাকতে হচ্ছে।’

নদীতে জাল দিয়ে ছড়িয়ে পড়া তেল সংগ্রহ করছেন জেলে জগদীশ রায়। তিনি বলেন, ‘নদীতে মাছ পাচ্ছি না, তাই তেল সংগ্রহ করে কিছু টাকা আয় করার চেষ্টা করছি। মাছ ধরার জন্য বনবিভাগের অনুমতি নিতে যে টাকা লাগে তাও এখন উঠছে না।’

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের স্টেশন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘তেলের কারণে নদী ও বনে প্রভাবতো পড়ছেই। আমরা বিষয়গুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।’

মঙ্গলবার ভোরে সুন্দরবনের শ্যামা নদীর চাঁদপাই রেঞ্জে ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’ নামে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার অন্য একটি ট্যাংকারের ধাক্কায় ডুবে যায়। এতে ওই ট্যাঙ্কারের ৬টি হাউজে থাকা ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেস অয়েল নদীতে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনদিনে এই তেল সুন্দরবনের ৭০ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার পর থেকেই ওই তেল স্থানীয়রা জাল দিয়ে সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। বনবিভাগ ঘটনার আড়াইদিন পর মাইকিং করে ওই তেল সংগ্রহ করার কথা বলেছে।

অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান শামসুদ্দোহা থন্দকার বৃহস্পতিবার জানান, তিনদিন এইভাবে নদী থেকে তেল অপসারণের চেষ্টা করা হবে। এরপর ঘটনাস্থলে আসা জাহাজ ‘কান্ডারি’ থেকে তেল ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য পাউডার ছিটানো হবে কিনা পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তেলের প্রভাবে সুন্দরবনে ইকোসিস্টেম ভেঙ্গে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

জেআই