ফরিদপুরের ভাঙ্গায় সড়ক দূর্ঘটনার ব্যাপারে দ্বিমূখি বক্তব্য দিয়েছেন চালক ও যাত্রীরা। দূর্ঘটনার সঠিক কারণ জানাতে সুষ্ঠ তদন্ত দাবি করেছেন হতাহতদের পরিবারের সদস্যরা।
ঘটনাস্থল এলাকার বাসিন্দা লাল মিয়ার ভাষ্য, গভীর রাতে প্রচণ্ড শব্দ শুনে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বাস ও হতাহত যাত্রীদের দেখতে পান। ঘটনাস্থলে নিহত হন ১৯ জন। আহত হয়েছেন ২৭ জন। আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
কিভাবে দূর্ঘটনা ঘটেছে জানতে চাইলে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শাহিন জানান, গাবতলী থেকে ছেড়ে আসার পরই চালক দ্রুতগতিতে বাস চালান। যাত্রীরা বেশ কয়েকবার দ্রুত গতিতে বাস চালাতে নিষেধ করেন। কিন্তু চালক তা শোনেননি।
রুবেল নামের আরেক যাত্রী অভিযোগ করে বলেন, শুধু চালকের খামখেয়ালির জন্য এ দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি বারবারই অন্যান্য গাড়ি ওভারটেক করে বাস চালাচ্ছিলেন। যাত্রীদের অনুরোধ উপেক্ষা করে তিনি বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান। সাকুরা পরিবহণের একটি বাসকে অতিক্রম করতে গেলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তখনই এ দুর্ঘটনা ঘটে।
বাসটির চালক মো. জাকির হোসেন বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাংবাদিকদের জানান, রাজধানীর গাবতলী থেকে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার উদ্দেশ্যে বাসটি নিয়ে রওনা দেন তিনি। পথিমধ্যে ভাঙ্গা উপজেলার কৈডুবি পৌঁছালে যাত্রীবেশী এক ডাকাত তাকে ছুরিকাঘাত করে গাড়ির স্টিয়ারিং কেড়ে নেয়। ঘটনার দুই মিনিটের মাথায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি সড়কের পাশে একটি গাছের সাথে আঘাত করে। এরপর কি হয়েছে এ বিষয়ে আর কিছু বলতে পারেন না তিনি।
চালক মো. জাকির হোসেন (৪০) পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার রহমতপুর নীলগঞ্জ গ্রামের জয়নাল আবেদিন হাওলাদারের ছেলে। চালকের সহযোগী মো. মন্টু খান (৪২) ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার রায়াপুর গ্রামের মো. কাশেম আলী খানের ছেলে।

বুধবার রাত ৯টায় সোনারতরী পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪৭০৭৪) বাসটি নিয়ে ঢাকার গাবতলী থেকে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। রাত দেড়টার দিকে বাসটি ভাঙ্গা উপজেলার পূর্ব সদরদী কৈডুবি এলাকায় পৌঁছালে সাকুরা পরিবহণের বাসটিকে অতিক্রম করতে গিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ধুমড়ে-মুচড়ে যায়।
এ ঘটনায় ঘটনাস্থলে ১৯ যাত্রী নিহত হন এবং আহত হন ২৭ জন। পরে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলে তিনজন এবং ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে আরো তিনজন মারা যান। নিহত ২৫ জনের মধ্যে ১৯ জনের লাশ ভাঙ্গা হাইওয়ে থানায়, তিনজনের লাশ ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এবং তিনজনের লাশ ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
মারাত্মক আহত ৭ জনসহ ২০ জনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে ১০ জনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন- সোহাগ (২৮), শাহিন (৩২), আসমা বেগম (৪০), রাসেল (২৮), শাহরিয়ার (৩২), রেজাউল ইসলাম (৩০), সূর্য বেগম (৩৮), হেলাল (৩৫), আমেনা আক্তার (১৪)। এদের সকলের বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া বলে জানা গেছে। এছাড়া বাসের সুপারভাইজার শফিকুল ইসলামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুরে।
দুর্ঘটনার পর ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক সরদার সরাফত আলী, ফরিদপুর-৪ আসনের সাংসদ মুজিবুর রহমান চৌধুরী দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
জেলা প্রশাসক জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহত রোগীদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা হবে। দাফনের জন্য প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।
কোতয়ালী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শাখায়াত হোসেন জানান, হাসপাতালে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। ভাঙ্গা এলাকার পুলিশের কাছ থেকে কোনো বার্তা না আসায় আহত চালক ও তার সহযোগীকে গ্রেফতারের বিষয়ে আপাতত তারা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেন না।
হাইওয়ে পুলিশের মাদারীপুর অঞ্চলের সহকারী সুপার বেলাল হোসেন বলেন, বাসের চালক ঘুমিয়ে পড়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভাঙ্গা হাইওয়ে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোজাম্মেল হোসেন জানান, নিহতদের লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
এদিকে দুর্ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট এ তদন্ত কমিটিতে জেলা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বিআরটিএ ও হাইওয়ে পুলিশের প্রতিনিধি রয়েছে।
এ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
এমকে





