২০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি ও ১০০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় পাস করলেও প্রতি তিনজনে একজন প্রার্থী বিসিএস ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করেছেন- এমন নজিরও রয়েছে।
মৌখিক পরীক্ষায় ফেলের এই হারকে অস্বাভাবিক বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, যেসব পরীক্ষার্থী প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন, তাঁরা মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করতে পারেন না।
রাজনৈতিক বিবেচনার চাকরিপ্রার্থীদের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই মেধাবী প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মৌখিক পরীক্ষা পাস বা ফেলের পরীক্ষা নয়, বরং সব কিছু ঠিকঠাক আছে কি না তা মূল্যায়নের একটি পর্ব মাত্র। সেই মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করার কারণে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ক্যাডার সার্ভিসে তো নয়ই, নন-ক্যাডার চাকরিও পাচ্ছেন না।
প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরির সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) বিসিএস পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্থা পিএসসি উপযুক্ত প্রার্থী বাছাই করে দেয়।
চূড়ান্ত নিয়োগ দেয় সরকার। বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য ২০০ নম্বরের প্রিলিমিনারিতে অংশ নিতে হয়। প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণরাই কেবল ১০০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন।
উভয় পরীক্ষায় বিস্তৃত সিলেবাস অনুসরণ করা হয়। প্রতিটি ধাপের উত্তীর্ণ ব্যক্তিরা মৌখিক পরীক্ষার জন্য বিবেচিত হন। আগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ছিল ১০০। ২০০৯ সালের পর সেই নম্বর বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০০।
বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি যতটুকু বুঝি, ভাইভা হচ্ছে সব কিছু ঠিকঠাক আছে কি না তা যাচাইয়ের একটি পর্ব। কিন্তু সেই পর্বেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি দিতে হয়।
রাজনৈতিক বিবেচনার র্প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হয়েছে এবং মেধা তালিকার তলানিতে পড়ে থাকা তদবিরের র্প্রার্থীদের চাকরি দেওয়ার জন্য তাঁদের মৌখিক পরীক্ষায় বেশি বেশি নম্বর দেওয়া হচ্ছে।
এই অবস্থায় মেধাবী প্রার্থীদের টিকিয়ে রাখতে হলে মৌখিক পরীক্ষায় ফেল না করানোর নীতিমালা দরকার। অর্থাৎ যেসব প্রার্থী প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় পাস করে মৌখিক পর্যন্ত যাবেন, তাঁদের পাস নম্বর দিতে হবে।
মেধাবীদের নম্বর কম দেওয়া হলেও তাঁদের ফেল করানো যাবে না। এতে করে হতভাগ্য মেধাবীরা ক্যাডার সার্ভিসে ঢুকতে না পারলেও নন-ক্যাডারে চাকরি পাবেন। আর তা না হলে আমাদের প্রশাসন দিনদিনই মেধাশূন্য হয়ে যাবে। এই নীতিমালা করা হলে মেধাবীরা টিকে যাবে।
রাজনৈতিক বিবেচনার প্রার্থীদের চাকরি দেওয়ার জন্য প্রতি তিনজনে একজনকে মৌখিক পরীক্ষা থেকে বাদ দেওয়া হবে- এটা মেনে নেওয়া কঠিন।
রাজনৈতিক বিবেচনার র্প্রার্থীদের চাকরি নিশ্চিত করার জন্যই ভাইভায় এত বেশি ফেল করানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন ৩০তম বিসিএসের প্রার্থী মনির হোসেন।
বর্তমানে একটি মন্ত্রণালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিরত মনির হোসেন জানান, প্রতি তিনজনে একজন ফেলের ঘটনা অস্বাভাবিক। যাঁরা বিসিএস মৌখিক পরীক্ষা পর্যন্ত যেতে পারেন, তাঁরা যথেষ্ট মেধাবী।
এসব মেধাবীর পাসে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রার্থীরা দাঁড়াতেই পারেন না। তাঁরা লিখিত পরীক্ষায় অনেক নম্বরে পেছনে থাকেন। এ অবস্থায় মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রার্থীরা আরো পেছনে পড়ে যান। তাই তাঁদের তুলে আনার জন্য মৌখিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর দেওয়া হয়, আর মেধাবীদের ফেল করানো হয়।
পর পর তিনটি বিসিএসে মৌখিক পরীক্ষা পর্যন্ত পৌঁছানো এক প্রার্থী লিটন হায়দার। প্রত্যাশামাফিক চাকরি না পেয়ে তিনি সচিবালয়ে একটি মন্ত্রণালয়ে চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে ঢুকেছেন।
তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘মেধাবীদের মৌখিক পরীক্ষায় আটকানো হচ্ছে আর পুলিশ বা গোয়েন্দার তদন্তের দলবাজ রাজনৈতিক বিবেচনার র্প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা যাঁরা রাজনীতি করি না তাঁরা সব দিক থেকে মার খাচ্ছি।’
এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সংবিধানই তাদের কাজের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। তাই তাদের কাজ নিয়ে মন্তব্য না করাই ভালো।
‘পিএসসি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও তাদের বিভিন্ন বিষয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তদারকি করে। সংসদে পিএসসির পক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কেই জবাবদিহি করতে হয়। সেই হিসেবে সংস্থাটির কার্যক্রমের দায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আপনি এড়াতে পারেন না। বিষয়টি আপনার কার্যপরিধির মধ্যেই রয়েছে।
এ বিষয়ে যথাযথ বক্তব্য না দিলে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে’- কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে প্রসঙ্গটি তুললে তিনি বলেন, ‘কোনো যোগ্য প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করানো হয় না। এসব অভিযোগ ঠিক নয়। আর মৌখিক পরীক্ষায় ফেল না করানোর বিধান করা হবে কি না তা গবেষণার বিষয়। হুট করে এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না।’
পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ছয়টি বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করেছে। প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষে এসব ব্যাচের নির্বাচিতদের চাকরিতে নিয়োগ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। গত ছয় বছরের ছয়টি বিসিএস পরীক্ষার মধ্যে ৩০তম বিসিএসে সর্বোচ্চসংখ্যক প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করেছেন। এই ব্যাচের ৩২ শতাংশের বেশি বা প্রতি তিনজনে একজন মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করেছেন। ২৯তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করেছেন ২২ শতাংশ।
বিসিএস পরীক্ষায় সর্বশেষ ফল প্রকাশ হয়েছে ৩৩তম ব্যাচের। এই ব্যাচের মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করেছেন ১২ শতাংশ, অর্থাৎ আটজনে একজন ফেল করেছেন। ৩২তম বিসিএস ছিল বিশেষ বিসিএস। মুক্তিযোদ্ধার ছেলেমেয়েদের জন্য এ বিসিএস নেওয়া হয়েছিল। সেই বিশেষ বিসিএসেও ভাইভায় ফেল করার ঘটনা রয়েছে। কালেরকণ্ঠ
এসএই্চ





