বিপুল পরিমান অবৈধ সম্পদের মালিক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষমতার দাপটে কোনঠাসা দেশপ্রেমিক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, দফতর, অধিদফতর, পরিদফতর, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সেক্টর করপোরেশন এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে প্রচন্ড দাপটে রয়েছেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা।
জানা যায়, স্বাধীনতার ৪৩ বছরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক সংখ্যা এখনো জাতির সামনে প্রকাশ করতে পারেনি সরকার। ইতোমধ্যে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নানা অভাব অনটনের মধ্যে জীবন যাপন করে মৃত্যু বরন করেছেন। আবার অনেকে এখনো নানা কষ্টে জীবন যাপন করছেন এমন খবর প্রায় মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়।
তবে সরকারি ভাতার উপর নির্ভরশীল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা আজ সত্যিই অসহায়। সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা দিচ্ছেন। আর কতজন মুক্তিযোদ্ধা মাসিক ভাতা পাচ্ছেন এবং এর বাইরে কত জন রয়েছেন এ হিসেব মিলালেই বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধদের সংখ্যা।
কিন্তু অদ্যাবদি সরকারের রেকর্ডেই সনদপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তথ্য নেই। এমনকি মুক্তিবার্তায় প্রকাশিত তালিকায়ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের রয়েছে। আবার অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার নাম মুক্তিবার্তায় প্রকাশিত হয়নি এমন অভিযোগও রয়েছে।
অথচ প্রভাবশালী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা আজ সরকারি মাসিক ভাতাসহ নানা সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা ভোগ করছেন। এমনকি বিসিএস ক্যাডারে সরাসরি সন্তানাদের চাকরি, ভাল মেডিকেল, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ভর্তি, বড় বড় পদে চাকরি গ্রহণ এবং অন্যান্য সরকারি চাকরিতেও অগ্রাধিকার পাচ্ছেন।
বর্তমানে এ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা দুর্নীতি দমন কমিশন, সিটি করপোরেশন, পিএসসি, সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রণালয়,দফতর এবং সেক্টরের নীতি নির্দারণী পর্যায়ের পদে কর্মরত রয়েছেন। ফলে তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনগত ব্যবস্থা নীতে সরকারকে অনেক বেকপেতে হচ্ছে।
সরকার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। যারফলে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী একাধিকবার মিডিয়ার সামনে বলেছেন,ঝাটা দিয়ে পিটিয়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তাড়ানো হবে।
ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় থাকা ১৮২ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করেছে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আরও বেশ কয়কজনের সনদ বাতিলের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এদিকে দুদকের অনুসন্ধানী কর্মকর্তা উপ পরিচালক মো. জুলফিকার আলী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ৫ সচিবের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানকালে সনদ জালিয়াতির অনেক তথ্য পেয়েছেন। সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের অনেক শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তার সুপারিশে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা সনদ পেয়েছেন এমন তথ্য রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ৫ সচিবের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানকালে তার কাছে এমন তথ্য এবং উপাত্ত এসেছে, যা প্রকাশ করা কিংবা ওইসব তথ্যে ভিত্তিতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সনদে সুপারিশকারী হিসেবে সেক্টকর কমান্ডার ফোরামের ওই কর্মকর্তাদের ডাকার সাহস পাননি।
জানা যায়, গত ১৪ সেপ্টম্বর রোববার রাজধানীর মগবাজারে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল কার্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সভায় ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং মুক্তিবার্তায় প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ছাড়া বাকি সব তালিকা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত লাল মুক্তিবার্তা এবং ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা আপাতত: থাকবে।
লাল মুক্তিবার্তা ও ভারতে প্রশিক্ষণ মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ১ লাখ ৪৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। এর বাইরে বাকি মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ স্থগিত করা হয় বলে জানান, মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।
তিনি বলেন, তবে যেসব মুক্তিযোদ্ধার সনদ স্থগিত তারা ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আপিল করতে পারবেন। এ সুযোগ টুকু তাদের জন্য রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, আগামী ২৬ মার্চ মুক্তিযোদ্ধা সনদ যাচাই-বাছাইয়ের পর মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে এবং তাদেরকে পরিচয়পত্র দেওয়া হবে।
মন্ত্রী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ৫ সচিবের সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। ওই ৫ সচিব হলেন- স্বাস্থ্য সচিব নিয়াজ উদ্দিন মিয়া, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সচিব এ কে এম আমির হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান (বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় বেসরকারিকরণ কমিশনের চেয়ারম্যান), মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকী (বর্তমানে ওএসডি) এবং একই মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (ওএসডি) আবুল কাসেম তালুকদার।
৫ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সরকারের প্রভাবশালী সচিব ‘অবৈধ প্রক্রিয়ায়’ মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেয়েছেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে প্রমাণীত হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সুপারিশের পরই সরকার ওই ৫ সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সরকারি কর্মচারী বিধি চাকরির শৃঙ্খলা-ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত। তার আগামীতে প্রযোজনীয় সময়ে অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা গ্রহণের বিশেষ টার্গেট পূরণের আশায় এ সনদ গ্রহণ করেন। তারা ফৌজদারী অপরাধ করেছেন, ফলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এবং প্রতারণার মামলা হতে পারে।
এ বিষয়ে সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সচিবের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে বলে জানান মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী।
তিনি বলেন,এ সনদ ব্যবহার করে তারা যদি রাষ্ট্রের সম্পদ নিয়ে থাকেন তাহলে আরও শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।
ঢাকা,একে, ২০ সেপ্টেম্বর. টাইমনিউজবিডি.কম,জেএ





