ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের কুটনীতির দায়িত্ব ভারতের ওপর ছেড়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন “দৈনিক আমার দেশ” পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।

আজ (সোমবার) সকালে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে “রোহিঙ্গাদের জন্য জাতীয় সংহতি (National Solidarity for the Rohingya)” – শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে কোন কুটনীতি নেই। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পরই কুটনীতির দায়িত্ব ভারতের হাতে হস্তান্তর করেছে।

মাহমুদুর রহমান বলেন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের স্ত্রী এবং তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোগান মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুর্দশা দেখতে কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। অথচ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবেমাত্র অসহায় রোহিঙ্গাদের পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এমন আচরণের কঠোর সমালোচনা করে মাহমুদুর রহমান বলেন, এটাই স্বাভাবিক। সম্ভবত এতদিনে রোহিঙ্গাদের পরিদর্শনের যাবার জন্য দিল্লীর অনুমতি পাওয়া গেছে।

মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা (Genocide) ও জাতীগত নিধন (Ethnic Cleansing) প্রক্রিয়া চলছে দাবি করে তিনি বলেন, দিল্লীর হুকুমের যেসব দাস বিষয়টি এখনো বুঝতে পারছেন না তাদের জন্য গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের নতুন সংজ্ঞা দিতে হবে।

আমার দেশ সম্পাদক আরো বলেন,ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী মিয়ানমার সফর শেষে দেশে ফিরে দাবি করেন যে মিয়ানমারে উগ্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। মোদীর এমন বক্তব্যের পরপরই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিয়ে বক্তব্য দেন এবং এর পরই পুলিশের এক বড় কর্মকর্তাও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে বক্তব্য দেন। এভাবেই একটি সম্পূর্ণ মানবিক বিষয়কে সন্ত্রাসবাদের দিকে ঠেলে দেয়া হলো।

মাহমুদুর রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারত বাংলাদেশের এককোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিলো,মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়েছিলো এবং অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিলো। এর ফলে ভারতের লক্ষ্য পাকিস্তান ভাগ করা সফল হয়েছিলো, আমরাও স্বাধীনতা লাভ করেছিলাম। একটা “উইন উইন” পরিস্থিতি হয়েছিল। এটাই বাস্তবতা, এটাই ইতিহাস।

তিনি বলেন, শ্রীলংকার ক্ষেত্রেও ভারত তামিল টাইগারদের অস্ত্র, আশ্রয় ও ট্রেনিং দিয়ে প্রথম দিকে সাহায্য করেছিল। পরে অবশ্য ভারত তার অবস্থান থেকে সরে আসে, কারণ তামিল টাইগাররা স্বাধীনতা লাভ করলে তামিল অধ্যুষিত ভারতেও স্বাধীনতা আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে।

“অথচ রোহিঙ্গা মুসলমানদের বেলায় ভারতের অবস্থান একেবারে ভিন্ন। রোহিঙ্গারা যদি মুসলমান না হয়ে হিন্দু হতো, মোদী কখনোই মিয়ানমার সফর থেকে ফিরে সন্ত্রাসবাদের গল্প বলতো না।”

মাহমুদুর রহমান বলেন, মিয়ানমার, ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষমতায় তিন হত্যাকারী। তারা একজোট হয়েছে। গুজরাটের হত্যাকারী মোদী, মিয়ানমারে গণহত্যাকারী সুকি ও বাংলাদেশের মানুষের অধিকার হত্যাকারী শেখ হাসিনা।

রোহিঙ্গা মুসলমানদের ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দল ও অন্যান্য রাজনীতিবিদদের মধ্যে এখনো সংহতি না আসলেও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সংহতি সৃষ্টি হয়েছে দাবি করে মাহমুদুর রহমান বলেন, এখন সবার উচিত জনগণকে এক করা। যদিও ২০১৪ সালের একতরফা ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের ঐক্যে ভয় পায়।

রোহিঙ্গা মুসলমানদের মানবেতর পরিস্থিতিতে যারা আবেগতাড়িত হচ্ছেন তাদেরকে নিয়ে যারা উপহাস করেছেন তাদের উদ্দেশ্যে মাহমুদুর রহমান বলেন, আবেগ ছাড়া কোন মানুষ হয় না, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কি আবেগ ছিল না?

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি শুধু দেশের ভেতরে: আসিফ নজরুল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন,কথায় কথায় এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে থাকে। অথচ মিয়ানমারের সামরিক হেলিকপ্টার বার বার বাংলাদেশের আকাশ সীমায় প্রবেশ করছে। তিনি প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর কি কোন হেলিকপ্টার নেই? বাংলাদেশের সামরিক হেলিকপ্টার কি একবার সীমান্ত টহল দেয়ারও ক্ষমতা রাখে না?

তিনি বলেন, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে ঢুকে অভিযান চালায়, বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-র সদস্যদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। অথচ সরকার কোন পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে না। শুধু মুখে মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে।

আসিফ নজরুল বলেন, ন্যূণতমো আত্ম-সম্মানবোধ ও রাষ্ট্রসত্তার দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও সরকার এভাবে নিরব থাকতে পারতো না।

সরকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সব গর্জন যেন দেশের ভেতরে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো গণহত্যা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেশের ভেতরে বিক্ষোভ পর্যন্ত করতে দিচ্ছে না বর্তমান সরকার – এমন অভিযোগ এনে আসিফ নজরুল বলেন, এই ইস্যুতে সরকারের উচিত জনমতকে আরো উত্তাল করে দেয়া যাতে বহির্বিশ্বও বিষয়টি জানতে পারে।

রোহিঙ্গারা ভাসমান নয়: আব্দুল হাই শিকদার

সাংবাদিক ও কবি আব্দুল হাই শিকদার বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। মিয়ানমারের পার্লামেন্টে একসময় রোহিঙ্গা প্রতিনিধি ছিল।

তিনি বলেন, বার্মিজরা আরাকান রাজ্য দখল করার আগ পর্যন্ত আরাকান একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল এবং সেখানকার প্রধান ভাষা ছিল রোহিঙ্গাদের ভাষা। কবি আলাওলের মতো মহাকবি আরাকান রাজ্যের রাজসভার কবি ছিলেন।

রোহিঙ্গাদের বাঙ্গালি ও অবার্মিজ আখ্যা দিয়ে দেশ থেকে বিতারণ করা হচ্ছে যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়- মন্তব্য করে আব্দুল হাই শিকদার আরো বলেন, মিয়ানমার সরকারের বর্তমান প্রধান অং সান সুকির স্বামী একজন খ্রিস্টান ও অবার্মিজ ইংরেজ ছিলেন। তার ঔরসে সুকির যে সন্তানরা রয়েছে তাদেরকে কি রোহিঙ্গাদের মতো দেশ থেকে বের করে দিতে পারবে মিয়ানমার সরকার?

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো রক্ষা করা। যারা একসময় রক্ষা করতো, আজ তারাই বিপদে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা ভারতের হাতে: শওকত মাহমুদ

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানে হেরফের রয়েছে। সরকারের প্রকৃত অবস্থান পরিস্কার হওয়া দরকার।

তিনি বলেন, আজকে অসহায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের আশ্রয় দিতে গিয়ে নিরাপত্তার কথা বলা হচ্ছে। অথচ ভারতের সাথে সরকারের এ যাবত যত চুক্তি হয়েছে তার কোনটাই সংসদে আলোচিত হয়নি।

শওকত মাহমুদ বলেন, “আমার মনে হয় ভারতের সাথে সরকারের চুক্তিতে এমন কিছু থাকতে পারে যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি ও প্রতিরক্ষানীতি ভারতের মতামতের ভিত্তিতেই চলতে হবে।”

মিয়ানমারে মানবতা লঙ্ঘিত, রক্তে মিশ্রিত: সুকোমল বড়ুয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া বলেন,রাখাইন প্রদেশে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চালানো বর্বোরোচিত গণহত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় তিনি লজ্জিত, মর্মাহত।

ওই ঘটনায় তিনি জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেন, মিয়ানমারে মানবতা লঙ্ঘিত, ভুলুণ্ঠিত ও রক্তে মিশ্রিত। রোহিঙ্গারাও মানুষ, আমরা মানুষের পক্ষে তথা মানবতার পক্ষে।

মিয়ানমার থেকে ছুটে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে সুকোমল বড়ুয়া বলেন, জাতিসংঘ, ওআইসি ও আসিয়ানসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরতে হবে।

রোহিঙ্গাদের রক্ষায় নাগরিক কমিটি গঠনের দাবি

বাংলাদেশের মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অধিকার-এর সম্পাদক আদিলুর রহমান খান নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমানদের অধিকার রক্ষায় ও সাহায্যের জন্য একটি অরাজনৈতিক নাগরিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে স্পষ্টতই গণহত্যা চলছে। কিন্তু দু:খজনক বিষয় সেই গণহত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশে বিক্ষোভ পর্যন্ত করতে দিচ্ছে না সরকার।

একটি স্বাধীন-সার্বভৌম আরাকান প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণেরও আহবান জানান মানবাধিকার কর্মী আদিলুর রহমান।

১৭ বার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন

ব্লগার পিনাকী ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশ সরকারের নির্লিপ্ততা ও নতজানুতার কারণেই ক্রমে দু:সাহসী হয়ে উঠছে মিয়ানমার।

তিনি অভিযোগ করেন, সম্প্রতি ১৭ বার মিয়ানমারের সামরিক হেলিকপ্টার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করছে। বাংলাদেশ সীমান্তের অন্তত এক কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে মিয়ানমার সেনারা অভিযান চালিয়েছে।

পিনাকী বলেন, মিয়ানমারের এমন বেপরোয়া আচরণ শুধু রোহিঙ্গাদের সাথে সম্পর্কিত নয়, এসব ঘটনার সাথে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব জড়িত।

তিনি সরকারকে মিয়ানমার ও ভারতের তরিকা থেকে সরে আসার আহবান জানিয়ে বলেন, অবিলম্বে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সব ধরনের কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা উচিত।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের গণমানুষের আবেগের সাথে সরকার প্রতারণা করছে দাবি করে এই ব্লগার আরো বলেন,বিষয়টি মানবিকভাবে দেখা উচিত।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের কুটনীতিকদের ডেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর ব্রিফিংকে ডাক্তার আসার পূর্বে রোগি মারা গেলোর সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, আর কালোক্ষেপণ না করে এবং সরকারের অপেক্ষায় না থেকে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠকটির সভাপতিত্ব করেন, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুর রউফ। তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যাপকভাবে রান্না করা খাবার সরবরাহের ওপর জোর দিয়ে এ ব্যাপারে সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানান।

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসনাত চৌধুরী,সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন, হেফাজতে ইসলামের নেতা শাহ ওয়ালিউল্লাহ হাফেজ্জি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, সাবেক সচিব মোফাজ্জল করিম এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ বিশিষ্ট নাগরিকরা।