বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার মাত্রা বেড়েই চলেছে। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শারীরিক, মানসিক চিকিৎসা ও পারিবারিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

হতাশা আর পারিবারিক কলহ থেকে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়লেও সচেতনতায় নেই কোনো বিশেষ উদ্যোগ। আত্মহত্যা প্রবণতা এক ধরনের রোগ। এ রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একেবারে পিছিয়ে।

বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের বিপরীতে মাত্র ২শ’ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। সে হিসেবে ৮ লাখ ৭০ হাজার মানুষের জন্য একজন মনোরোগ চিকিৎসক।

বৃহস্পতিবার বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে-‘আত্মহত্যা প্রতিরোধের উদ্যোগ নিন, জীবন বাঁচান।’

দিবসটি উপলক্ষে মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘ব্রাইটার টুমোরো’ নামের একটি বেসরকারি সংগঠনের সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য জানান।

বিশ্বের সব উন্নত দেশে দিবসটি পালিত হলেও বাংলাদেশে পালিত হয় না। এ রোগ প্রতিরোধে উন্নত দেশে হেল্প লাইন থাকলেও বাংলাদেশে নেই।

দিবসটি পালন, আত্মহত্যার কারণ চিহ্নিত করে এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে একটি হেল্প লাইন চালুর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, আত্মহত্যায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম। যা ২০১১ সালে ছিল ৩৮তম। বাংলাদেশের জনসংখ্যার একশো জনে একজন জটিল মানসিক রোগ ও ১০ জন অন্যান্য মানসিক রোগে আক্রান্ত। অধিকাংশ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হলেও জানা থাকে না।

বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ী, গত ৬ বছরে সারাদেশে ৫৯ হাজার ৭৬০ জন আত্মহত্যা করেছেন। ২০১৩ সালে আত্মহত্যা করেছেন ১ হাজার ২৯ জন।

ব্রাইটার টুমোরোর প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করেন। যা প্রতি ১ লাখে ৭ দশমিক ৮ জন। যাদের বেশিরভাগই ২১-৩০ বছর বয়সী।

বিশ্বে ১৫-২৯ বছর বয়সীরা বেশি আত্মহত্যা করেন। ২০১২ সালে ৮ লাখ ৩ হাজার ৯শ’ মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। যার মধ্যে ৬ লাখ ৬ হাজার ৭শ’ মানুষ উন্নয়নশীল দেশের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শঙ্কা-২০২০ সাল নাগাদ প্রতিবছর বিশ্বে সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করতে পারেন। আর আত্মহত্যার চেষ্টা করবেন বর্তমানের চেয়ে ১০-১২ গুণ বেশি।

হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা রাবিন বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য একটি বিষয়। এ সমস্যার চিকিৎসায় সচেতনতা খুবই জরুরি। কিন্তু দেশে মাত্র ২শ’ চিকিৎসক রয়েছেন। যাদের বেশির ভাগই শহরকেন্দ্রিক।

রাবিন বলেন, ঢাকা মেডিকেলসহ দেশের পুরনো আটটি মেডিকেল কলেজে নেই মনোরোগের অধ্যাপক। জেলা পর্যায়ে নেই মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা।

দেশের ২২টি মেডিকেল কলেজ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পাবনা মানসিক হাসপাতালে এর চিকিৎসা করা হয়। তবে মেডিকেল কলেজেও নেই অধ্যাপক।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে আত্মহত্যা বাড়লেও এ বিষয়ে নেই গবেষণা, নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও সচেতনতা।

তিনি বলেন, আত্মহত্যাকারীদের বেশির ভাগই কোনো না কোনো হতাশায় ভুগে থাকে।  এ হতাশার সঠিক কারণ খুঁজে বের করে চিকিৎসা দিতে পারলে আত্মহত্যা কমে যাবে।

বিশ্বের উন্নত দেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয়ভাবে থাকে হেল্পলাইন। আত্মহত্যা করতে উদ্যোগী স্বয়ং হেল্পলাইনে ফোন করে আত্মহত্যার ইচ্ছে পোষণ করে।

তৎক্ষণাৎ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আত্মহত্যার কারণ জিজ্ঞাসা করে সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে অনেক আত্মহত্যা রোধ হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই জটিল সমস্যা সমাধানে নেওয়া হয় উদ্যোগ। কিন্তু বাংলাদেশে দিন দিন মানসিক রোগীর সংখ্যা বাড়লেও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না এবং দেওয়া হয় না সুনজর-এ অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।

তবে ২০০৭ সাল থেকে সারা দেশে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার চিকিৎসক ও নার্সকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে জানান ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।

তেজগাঁও কেন্দ্রীয় মানসিক নিরাময় কেন্দ্রের সাবেক মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আখতারুজ্জামান বলেন, সচেতনতা, চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধ সম্ভব।

ব্রাইটার টুমোরো’র আহ্বায়ক জয়শ্রী জামান বলেন, আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। সঠিক চিকিৎসা আর সচেতনতা তৈরি হলে এ প্রবণতা কমে যাবে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন করে জনসচেতনা বৃদ্ধির জন্য সরকারের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।

এএইচ