পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দিবাগত রাত ১টায় দেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাবে, সোমবার ২৪ ঘণ্টায় গড় বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৪০৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গড়ে ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৫৪৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে ঢাকা অঞ্চলে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ওই সময়ে কোনো লোডশেডিং না থাকলেও ঘণ্টার হিসাবে সিলেট, ময়মনসিংহ ও খুলনা অঞ্চলে পরিস্থিতি ছিল বেশি খারাপ।
আগের দিন দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। এর আগে ৩ আগস্ট সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ আগস্টের শুরু থেকেই বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল। ২১ জুলাই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৪৮৮ মেগাওয়াট। এরপর কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তা বেড়ে প্রায় সাড়ে সাত গুণ হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সংকটের পেছনে মূলত জ্বালানি, অর্থ ও ডলার সংকট কাজ করছে। দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও সেগুলো চালানোর জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা ও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্র বেশি সময় চালালে পিডিবির লোকসান এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি এখনো গ্যাস। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে এসব কেন্দ্রের বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
কয়েক দিন আগেও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। বর্তমানে তা কমে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটে নেমেছে।
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। দুর্ঘটনার আগে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর তা নেমে আসে প্রায় ২১৪ কোটি ঘনফুটে।
পরে টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও সরবরাহ এখনো আগের পর্যায়ে ফেরেনি। পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে মেরামতকাজ চলছে। এর মধ্যে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান টার্মিনালে একটি এলএনজি কার্গো নির্ধারিত সময়ে যুক্ত হতে না পারায় গ্যাস সরবরাহে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হলেও সেখানেও রয়েছে নানা সমস্যা। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট।
পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সাময়িকভাবে উৎপাদন কমে গিয়েছিল। পরে ইউনিটটি চালু হলেও কেন্দ্রটির বিপুল বকেয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সময়মতো বিল পরিশোধ না হলে ভবিষ্যতে কয়লা সরবরাহেও সংকট তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া বৈরী আবহাওয়ার কারণে পটুয়াখালীর আরেকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা খালাস ও পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। ফলে উৎপাদনও কমেছে।
ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশে সরবরাহ কমেছে। সাধারণত কেন্দ্রটি বাংলাদেশকে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া ও কয়লা সরবরাহের সমস্যায় তা কমে ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে নেমে এসেছে।
এদিকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে। বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি সমস্যায় বন্ধ থাকায় সেখান থেকেও প্রত্যাশিত উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না।
গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ কমে গেলে দ্রুত ঘাটতি পূরণের অন্যতম উপায় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। কিন্তু এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় অনেক বেশি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সন্ধ্যায় চাহিদা বাড়লে লোডশেডিং কমাতে তেলচালিত কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো হয়। কিন্তু রাত গভীর হলে ব্যয় কমাতে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে মধ্যরাতের পর কোনো কোনো সময়ে লোডশেডিং আবার বেড়ে যায়।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পিডিবির বকেয়া প্রায় ৪৮ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনাই প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।
দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নতুন করে জ্বালানি কিনতে সমস্যায় পড়ছে। সীমিত জ্বালানি মজুতের কারণে কোনো কোনো কেন্দ্র দিনের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎপাদন চালিয়ে পরে উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।
এরই মধ্যে গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবে দাম বাড়ানোর পরও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়নি।
সব মিলিয়ে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি ও অর্থসংকটে তার বড় অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়ে দেশজুড়ে লোডশেডিং বাড়ছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
এনএইচ