মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির দাবিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত আন্দোলন জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী হবো, আদিবাসী কেউ হবো না।’ তার মতে, বাংলাদেশের সব ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি ও ভাষাভাষির মানুষ দেশের নাগরিক। নাগরিক হিসেবে সবার সাংবিধানিক অধিকার সমান এবং এই অভিন্ন পরিচয়ের ভিত্তিতেই দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

তিনি বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বিভেদ ও নানা সংকটের পেছনে ভিনদেশি উসকানি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলের স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্ত ও আশপাশের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‘সাংবিধানিক সমাধান প্রয়োজন’

আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির দাবিকে ঘিরে বিতর্কের স্থায়ী সমাধানের জন্য সাংবিধানিক অবস্থান স্পষ্ট করার ওপর জোর দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, জুলাই চার্টারে রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে। সেখানে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের মূল পরিচয় ‘বাংলাদেশি’ রাখার বিষয়টিও রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, এটি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিবেচনায় রাখার রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দলিলের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত ‘ইউনাইটেড নেশনস ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইন্ডিজেনাস পিপল’ গ্রহণের সময় বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত ছিল। তার দাবি, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ১৬৯ এবং জাতিসংঘের ওই ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

তবে এসব আন্তর্জাতিক দলিল ও বাংলাদেশের ওপর এর প্রযোজ্যতা নিয়ে যে আইনগত ও রাজনৈতিক আলোচনা রয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে।

‘ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য মানেই আলাদা রাষ্ট্র নয়’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের মধ্যে একাধিক ভাষা, সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকলেই তাদের আলাদা জাতি বা রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

পার্শ্ববর্তী দেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে বিপুলসংখ্যক আঞ্চলিক ভাষা ও বিভিন্ন প্রধান ভাষার প্রচলন রয়েছে। কিন্তু ভাষাগত বৈচিত্র্যের কারণে সবাইকে আলাদা জাতি হিসেবে গণ্য করা হয় না।

তার বক্তব্য, বাংলাদেশেও বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য সংবিধানে বিশেষ ব্যবস্থা ও কোটা সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। এসব সুবিধার উদ্দেশ্য সমাজে সমতা তৈরি করা।

তিনি বলেন, ‘আমরা কেন নদী অববাহিকায় বাস করলাম, আর আরেকজন কেন পাহাড়ি উপত্যকায় বাস করল—তার ওপর ভিত্তি করে কোনো নেশন স্টেট হতে পারে না।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ভূরাজনৈতিক সতর্কতা

পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলে ভিনদেশি প্রভাব ও উসকানির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বর্তমান সময়েও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হলেও এ ভূখণ্ডের মানুষের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের শিকড় অনেক পুরোনো।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত না করে উন্নয়ন ও সুযোগের ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের নাগরিকদের ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি কিংবা ভাষাগত বৈচিত্র্য তাদের সাংবিধানিক অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য তৈরি করবে না। নাগরিক হিসেবে সবাই সমান এবং এই পরিচয়কে কেন্দ্র করেই জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

মতবিনিময়ে মন্ত্রীদের অংশগ্রহণ

গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আলোচনায় বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি, সাংবিধানিক অধিকার, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং দেশের সার্বভৌমত্বের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে মূলত উঠে আসে দেশের নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন তৈরি না করে অভিন্ন সাংবিধানিক পরিচয়ের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং একই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা। তার মতে, নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সবাইকে সমান মর্যাদা দেওয়ার মধ্য দিয়েই একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

এমএম