ভোলার চরফ্যাশনে মেয়ে হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে আসামী আর পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে এক হতভাগা বাবা। হত্য মামলা প্রত্যাহারের জন্য আসামী ও পুলিশ আতাঁত করে এই ভয় দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইতোমধ্যে মামলা প্রত্যাহারে পুলিশ ও আসামী পক্ষের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় এক ছেলেকে মিথ্যা মাদক মামলায় জেলে পাঠানোর অভিযোগ করেছে বাবা।
আসামী পক্ষ বিত্তশালী হওয়ায় ধর্ষণ ও খুনের মামলার আসামী মিজানুর রহমানের পক্ষ হয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে আসামীর পক্ষ হয়ে।
পরিবারের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, কহিনুর আক্তার 'সাথী'র বিয়ে হয় নারায়গঞ্জের সুমনের সাথে। সেখানে তার ৭/৮ বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
প্রথম স্বামীর সংসারে থাকার সময় ভাগ্যবদলের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান কহিনুর আক্তার সাথী। মালয়েশিয়া, দুবাই, কাতারসহ কয়েকটি দেশে প্রবাস জীবন কাটিয়ে বেশ মোটা অংকের টাকার মালিক হন কহিনুর।
প্রবাস থেকে ছুটিতে দেশে আসার পর চরফ্যাশন বাজারের কোটিপাতি ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানের সাথে পরিচয় এবং প্রেম প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠে। যার প্রভাবে কহিনুর আক্তার সাথীর প্রথম সংসার ভেঙ্গে যায়।
মিজানের সাথে সম্পর্কের এক পর্যায়ে অন্ত:সত্ত্বা হয়ে পড়েন কহিনুর। এ সময় কহিনুর বিয়ে করার প্রস্তাব দিলে মিজানুর রহমান তাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়।
ফলে ভোলা 'নারী ও শিশু নির্যাতন' দমন আদালতে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন কহিনুর আক্তার সাথী। এই মামলায় জেলেও যায় মিজানুর রহমান। পরবর্তীতে আপোষের মাধ্যমে বিষয়টি মিটমাট হওয়ায় জামিনে বের হয়ে গত বছর ( ২০১৬সাল) ১৮ ফেব্রুয়ারী কহিনুর আক্তার সাথীকে বিয়ে করে ঘরসংসার শুরু করেন মিজানুর রহমান।
চরফ্যাশন পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডে কলেজপাড়ার আব্দুর রব মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন তারা। কয়েক মাসের সংসার জীবনে মিজানুর রহমান প্রবাসী কহিনুর আক্তার সাথীর সঞ্চিত ১৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। সব টাকা পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার পর মিজানুর রহমান বাবার বাড়ি থেকে আরো টাকা এনে দেওয়ার জন্য শারীরিক নির্যাতন শুরু করে কহিনুরকে।
গত জানুয়ারী মাসে মিজানুর রহমান স্ত্রীর গর্ভের সন্তানকে কৌশলে নষ্ট করেন এবং চলমান ধর্ষণ মামলা প্রত্যাহারের জন্য স্ত্রীকে চাপ দেন। এ ঘটনায় কহিনুর আক্তার সাথী ১৪ জানুয়ারী,২০১৭ চরফ্যাশন থানায় জিডি করেন, জিডি নং ৫৪০।
জিডি করার দু’দিন পর মিজানুর রহমান ফের যৌতুকের জন্য মারধর করেন কহিনুরকে। এক পর্যায়ে গুরুতর আহত কহিনুরকে প্রথমে চরফ্যাশন এবং পরে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা করা হয়।
সুস্থ হয়ে ভোলা সদর হাসপাতাল থেকে কহিনুর অত্যাচারের ভয়ে স্বামীর বাড়িতে না গিয়ে পৈত্রিক বাড়িতে ফিরে যান।
সেখান থেকে ৩০ মে স্বামী মিজানুর রহমান শান্তিপূর্ণভাবে সংসার করার আশ্বাস দিয়ে স্ত্রী কহিনুর বেগমকে পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের ভাড়া বাসায় নিয়ে আসেন এবং ওই রাতেই যৌতুকের জন্য ফের কহিনুরকে অতিমাত্রায় নির্যাতন করে।
ঐদিন কহিনুর মধ্যরাতে নিজের সংকটাপন্ন অবস্থার কথা ফোনে বড়বোন রুপালীকে জানান। পরদিন সকালে পৈত্রিক বাড়ির লোকজন কহিনুর আক্তার সাথীর পৌরসভার ভাড়াবাসায় এসে তাকে পায় নি। তার খোঁজ নিতে চাইলে স্বামী মিজানুর রহমান বা তার পরিবারের তরফ থেকেও কোন প্রকার সন্ধান দেয় নি।
কহিনুর আক্তার সাথীর বাবা আব্দুল মান্নান অভিযোগ করেন, ওই রাতেই তার মেয়েকে হত্যার পর লাশ গুম করা হয়েছে। প্রথম দিকে তিনি থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মেয়ের কোন প্রকার হদিস করতে ব্যর্থ হয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর আব্দুল মান্নান ভোলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে মেয়েকে হত্যার পর লাশগুমের অভিযোগে এনে মিজানুর রহমানসহ ৫জনকে আসামী করে মামলা করেন। অভিযোগ পিটিশন নং ৭১৭/১৭ দাখিল করেন। আদালতের নির্দেশে চরফ্যাশন থানায় পিটিশনটি গত ২ অক্টোবর এজাহার হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
এই মামলা করার পর আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশ অনীহা দেখিয়ে আসছে। পাশাপাশি মামলাটি আপোষে মিটমাট করার জন্য পুলিশ বাদী আবদুল মান্নানকে নানাভাবে চাপ দিয়ে যাচ্ছে।
খুন আর লাশগুমের মামলা প্রত্যাহারের জন্য চরফ্যাশন থানা পুলিশের চাপাচাপির পাশাপাশি আসামীরাও বাদিকে অব্যহত ভাবে হুমকি দিয়ে।
পুলিশ আর আসামীদের হুমকী ধামকীর মধ্যে গত ৩ নভেম্বর রাতে উপ-পরিদর্শক নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে শশীভূষণ থানা পুলিশের একটি দল আব্দুল মান্নানের গ্রামের বাড়িতে হানা দিয়ে ছেলে মনির হোসেনকে তুলে নিয়ে যায়।
পরদিন মনির হোসেনকে ১০পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার দেখিয়ে মাদক মামলায় আদালতে সোপর্দ করেন। পুলিশের অভিযানের সময় বোনের ধর্ষণ এবং খুন ও লাশগুমের পৃথক দু’টি মামলার প্রধান আসামী মিজানুর রহমান পুলিশের সাথে ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।
মনির হোসেন ওই দু’টি মামলার গুরুত্বপুর্ণ সাক্ষী বলে জানা গেছে। মেয়ে খুন মামলার বাদি আব্দুল মান্নান অভিযোগ করেন, 'ধর্ষণ, খুন ও লাশগুমের মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করতে আসামী মিজানুর রহমানের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পুলিশ তার ছেলে মনির হোসেনকে ইয়াবার সাজানো মামলায় ফাঁসিয়েছে'।
হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চরফ্যাশন থানার এস আই জাফর জানান, সাথী ও মিজানের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ ছিল। তদন্তের এ পর্যায়ে সাথীকে হত্যা বা লাশ গুম করার মতো কোন প্রমাণ মিলেনি। কেউ কেউ বলছে সাথী গোপনে বিদেশ চলে যেতে পারে। সেসব বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শশীভুষণ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হানিফ সিকদার আবদুল মান্নানের সকল অভিযোগ মিথ্যা উল্লেখ করে বলেন, মান্নানের ছেলে মনিরকে ইয়াবা সহ গ্রেফতার করা হয়েছে। এসময় পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি-ধামকির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ বিষয়ে অভিযুক্ত মিজানুর রহমানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শাহীন/জেড





