উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর নদী রক্ষা বাঁধগুলো ভেঙে যাওয়ায় দেশের বেশ কয়েকটি জেলা প্লাবিত হয়েছে। কোনো কোনো এলাকার বন্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল, কোনো কোনো এলাকায় আরও অবনতি আবার কোনো এলাকা নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায় ব্রক্ষ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মাসহ রাজধানী ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানি আরও বাড়তে পারে।

বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলেছে, আগামী তিন দিনে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, রাজবাড়ী এবং ফরিদপুর জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। পাশাপাশি বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর ও টাঙ্গাইল জেলার অবস্থা অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও টঙ্গী খালের পানি বাড়ার পাশাপাশি মিরপুর পয়েন্টে তুরাগের পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে।
তবে গঙ্গা অববাহিকার নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করায় আগামী ৭২ ঘণ্টায় লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলার বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

বন্যায় বিভিন্ন জেলায় বাড়ছে জনদুর্ভোগ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ভাটির নদ-নদীগুলোর পানি অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকায় ইতোমধ্যে ওইসব এলাকার হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর হারিয়েছেন। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ।
দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যাকবলিত মানুষ দিন দিন হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। কারণ, বহু এলাকায় এখনো কোনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি। বানভাসি অসহায় মানুষের দিন কাটছে দুর্যোগময় পরিস্থিতির মধ্যে।


অনেকের ঘরবাড়ি ভেসে গেছে। মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা। ডুবে গেছে ফসলি জমিও। এখন এসব বানভাসি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ পানি আর ব্যাপক ত্রাণ সহযোগিতা। পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষের এটাই এখন একমাত্র চাওয়া।

কিছু কিছু এলাকায় এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। দুর্ভোগের পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় চলছে ত্রাণের জন্য হাহাকার। এ অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে বানভাসিদের। ত্রাণের জন্য অসহায় মানুষ ধরণা দিচ্ছে জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে।

বন্যাকবলিত যেসব এলাকায় সরকারি ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা হলেও পরিমাণে তা অপ্রতুল বলে অভিযোগ রয়েছে।

বগুড়া : জেলার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৩০০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে শনিবার সকাল পর্যন্ত প্লাবিত হয়েছে ১০২টি গ্রাম।
সারিয়াকান্দিতে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বাঁধ ভেঙে প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকা দিয়ে পানি ঢুকে রয়াদহ, শেখেরপাড়া, কড়িতলা, কুতুবপুর, দড়িপাড়াসহ ধুনট উপজেলা জোড়শিমুল, শিখাহাটি, সোনাগা, গজারিয়াসহ আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়। ডুবে গেছে কয়েকশ’ হেক্টর ফসলি জমি। দেড় লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি হয়ে মানবেতর দিনযাপন করছে। নদীর পানি এখন বিপদসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় চন্দনবাইশা, কামালপুর, কুতুবপুর, বোহাইল, ভেলাবাড়ী ও ফুলবাড়ী ইউনিয়নে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ভয়াভহ আকার ধারণ করেছে। হাজার হাজার মানুষ পড়েছে মানবিক বিপর্যয়ে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ১ লাখ ৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি। ৫ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ও ২ হাজার ৫শ বাড়িঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাজেদা ইয়াসমিন জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তবে ইতিমধ্যে বন্যার্তদের ৯৫ মেট্রিক টন চাল, ৭৫ হাজার নগদ টাকা, বিস্কুট ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

তবে নাম মাত্র ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে বলে বন্যাকবলিত মানুষদের অভিযোগ।

সারিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাসুদ্দিন ফিরোজ জানান, রোপা আমন, বীজতলা, শাকসবজি, আউশ ও অন্যান্য ফসলসহ সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ৯ হাজার ২৫০ হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশেষায়িত শাখার ওয়াটার গেজ রিডার পরশুরাম চন্দ্র বর্মন জানান, যমুনার পানি দু-এক দিনের মধ্যে কমার সম্ভাবনা নেই।

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ধলীরকান্দি থেকে রৌহাদহ পর্যন্ত বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ চলতি বছর ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়। বাঁধটি দফায় দফায় যমুনা নদীর ভাঙনের মুখে থাকায় অবশেষে শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে বিলীন হয়ে যায়।

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ও ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ৮ বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি শনিবার অপরিবর্তিত রয়েছে।

পানি দ্রুত নেমে না যাওয়ায় প্রায় ৩ লাখ বানভাসির দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ। দুর্গত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে বাড়ছে ডাইরিয়া, আমাশয়সহ পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা।

জেলার চর ও দ্বীপ চরসহ অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকার পানিবন্দি মানুষজন বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ উচু স্থানে আশ্রয় নিয়ে গবাদিপশুসহ অবর্ণনীয় কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। সরকারিভাবে আশ্রয়কেন্দ্র না খোলায় বানভাসিরা খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছে।

ত্রাণ বিতরণের সমন্বয় না থাকায় ত্রাণ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল সংখ্যক বানভাসি। দুর্গম এলাকায় ত্রাণ না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বানভাসিরা। গ্রামঞ্চলের সড়ক ও হাট-বাজারগুলো তলিয়ে থাকায় খাদ্য, ওষুধসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে পারছে না তারা।

স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ৯ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ২৬ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে সামান্য কমেছে নুন খাওয়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র ও কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি।

গাইবান্ধা : গাইবান্ধা জেলায় ১৩০টি চর ও দ্বীপচরের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি দিন কাটাচ্ছে। হাড়োডাঙ্গা, উজান ডাঙ্গা, কোচখালী, পাতিলবাড়ী, হাসধরা, বোচারচর, গোবিন্দি, বেড়াসহ গাইবান্ধার চার উপজেলার চর ও দ্বীপচরে খাদ্যের সঙ্কট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। কাজকর্মহীন হয়ে পড়ায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের। ঘরে পানি ওঠায় বাধ্য হয়ে পশু-পাখি আর মানুষ একাকার হয়ে বসবাস করছে নৌকা, ঘরের চাল ও উঁচু মাচায়। বন্যা দুর্গত এসব এলাকায় ত্রাণ তো দূরের কথা খোঁজ খবর নিতেও যায়নি কেউ বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

বন্যা দুর্গত এসব এলাকায় দুর্ভোগের পাশাপাশি বিষাক্ত সাপের ভয়ে আরও বেশি আতংকিত জনগণ। উজান ডাঙ্গার আলম মিয়া বলেন, ‘গত কয়েকদিনে ৫টা সাপ মারা পড়ছে। মারতে না পারলে সাপের কামড়ে আমরাই মারা যাইতাম। সব সময় ভয় লাগে এই বুঝি সাপ আইলো।’

দুই সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি এই মানুষরা জানে না কত দিনে দূর হবে তাদের দুর্ভোগ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল জানালেন, বন্যার পানি নেমে যেতে আরো কয়েকদিন লাগতে পারে।

সিরাজগঞ্জ : যমুনার পানি বাড়তে থাকায় সিরাজগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। যমুনার সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নদ-নদীর পানির উচ্চতাও বেড়ে যাওয়ায় প্রবল স্রোতে ব্রহ্মপুত্র বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে প্রচণ্ড চাপ পড়ছে।

শুক্রবার পানির প্রবল তোড়ে কাজিপুর উপজেলার মেঘাই এলাকার রিং বাঁধ ধসে নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় নতুন করে অন্তত ৬০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

জেলার চরাঞ্চলে প্রায় কয়েক হাজার ঘরবাড়ি এক থেকে তিন ফুট পানিতে তলিয়ে রয়েছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে বাড়ছে ডাইরিয়া, আমাশয়সহ পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা।

জেলা প্রশাসক বিল্লাল হোসেন বলেন, নতুন করে পানি বাড়ায় বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আরো ত্রাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

জামালপুর : জামালপুর জেলার ৬৮ ইউনিয়নের মধ্যে বর্তমানে ৪০টি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি রয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি অনেকটা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসলামপুরের পাঁচ, মেলান্দহের চার ও জামালপুর সদরের দুইটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সানন্দবাড়ী এলাকায় বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে নতুন করে ২০টি গ্রামে প্রবেশ করেছে যমুনার পানি।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোসেন বলেন, দুর্গত এলাকায় এরই মধ্যে ১৪১ টন চাল ও ১১ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. শাহাবুদ্দিন খান জানান, আরও ত্রাণের জন্য আবেদন পাঠানো হয়েছে।

ঢাকা, ৩০ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, জেআই