'ভাই আমরা জাইল্লারা খুব খারাপ অবস্থায় আছি। ইলিশ নদীতেও নাই, জালেও পড়ছে না। না খাইয়া আছে আমাগো বউ পোলা মাইয়া…।' চারদিন আগে বেলায়েত গাজীর জালে ধরা পড়েছে একটি মাত্র ইলিশ। এরপর থেকে আর কোনো ইলিশের দেখা পাননি তিনি।

পটুয়াখালীর উত্তর চরতাদীর তেতুঁলিয়া নদীতে মাছ ধরে বাড়ি ফেরার পথে বেলায়েত হোসেন গাজী একথা বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশের জন্য জাল ফেলে নৌকায় বসে আছেন প্রবীণ রকমান মাঝি। তিনি আক্ষেপের সুরে বললেন,বাবারে বৃষ্টি অইতে আছে। নদীতে ঝো চলে, এ্যাহন-তো ইলিশ ধরা পড়বে জালে। কোনো মাছই নাই নদীতে। গত এক সপ্তাহে একটা ইলিশও পাই নাই। ভাগ্যের জোরে দুই একজনে, দুই একটা পায়।

ইলিশ না পাওয়ার হতাশা দূর করতে দেখা গেল আরেক জেলেকে। নাম সিরাজ মাঝি। বাড়ি চর ওয়াডেল গ্রামেই। চলতি ইলিশ শিকার মওসুমে দুইবার ট্রলার নিয়ে সাগরে প্রায় ১২ দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু ইলিশ মিলছে না জালে। তাই হতাশাগ্রস্ত ওই জেলে ইলিশ পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করে তার ফিশিং বোর্ডে দোয়া মিলাদের আয়োজন করেন।

সোমবার সিরাজ তার পরিবারের ছোট বড় সব সদস্যকে উপস্থিত করান। ফিশিং বোর্ডের অন্য সদস্যদের নিয়ে মৌলভী ডেকে দুপুরে দোয়া মিলাদ করান। এ সময় দীর্ঘক্ষণ প্রার্থনা করা হয়, যেন আর কোনো লোকসান গুনতে না হয় সিরাজ মাঝিকে। ইলিশ যেন তার জালে ঝাঁকেঝাঁকে ধরা পড়ে। তাই এ বিশেষ দোয়া মিলাদের আয়োজন করা হয়।

সিরাজ মাঝি বললেন, ‘বচ্ছরে একবারই ইলিশের মওসুম অয়। এই সময় ইলিশ না পাইলে হারা বচ্ছরই ধার দেনায় পইরগা জামু। এই লইগ্যা মিলাদ পড়াই। আমনেরাও দোয়া কইরগেন।দোয়া মিলাদ শেষে আখের গুড়ের পায়েস খাওয়ানো হয় মিলাদে অংশ নেয়া লোকজনকে।

কিন্তু ভরা মওসুমেও পটুয়াখালীর নদীসহ উপকূলীয় এলাকায় ইলিশ নেই। সাগর বা নদী থেকে খালি হাতেই ফিরছে জেলেরা। আড়তদাররাও কাটাচ্ছেন অলস সময়। অভাবের কারণে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন অনেক জেলে। জাটকা নিধন ও সাগর মোহনায় চর জেগে ওঠা, নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় ইলিশের গতিপথ পরির্বতন হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন আড়তদারসহ বিশেষজ্ঞ মহল। ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে গবেষণার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তারা।

কলাপাড়ার মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য আড়ৎদার সমিতির নেতা মাসুম ব্যাপারী ও আনছার উদ্দিন মোল্লা জানান, সাগরে ইলিশ নেই। কারণ অসংখ্য ডুবচরের কারণে ইলিশ গভীর সমুদ্র থেকে আসতে পারছে না। তাদের চলার গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে বর্ষায় ইলিশ প্রজনন মওসুমে বঙ্গোপসাগরের ইলিশ গতি পরির্বতন করে অন্য পথে চলে যেতে পারে। তাছাড়া সরকারকে ঝাটকা নিধন বন্ধ করার দাবি জানান তারা।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের অ্যাকুয়া কালচার বিভাগের চেয়ারম্যান ড. লোকমান আলী বলেন, মূলত জলবায়ু পরির্বতন ও পরিবেশ বিপর্যয়ে ইলিশ শূন্যতা দেখা দিচ্ছে। এজন্য সরকারকে কিছু উদ্যোগী ভুমিকা পালন করতে হবে। নিতে হবে পদক্ষেপও। নদীতে কলকারখানার বর্জ সরাসরি ফালানো বন্ধসহ সাগরের সঙ্গে আমাদের যে নদীগুলো মিশেছে ডুবোচরে ভরাট হয়ে যাওয়া সেইসব চ্যানেলগুলো খনন করতে হবে।

ড. লোকমান আলী আরো জানান, খরস্রোতা নদী গুলোর নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় গভীর পানির ইলিশ আমাদের নদীতে উঠতে বাধা পাচ্ছে। এছাড়াও অধিক বৃষ্টির ফলে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে মিঠা পানি সাগরে পতিত হওয়ায় ইলিশ মিঠা পানিতে উঠে আসে। চলতি বছর এখনও পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি তাই এখনও ইলিশ মিলছে না।

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, সাগরের মোহনায় নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের পদক্ষেপ রয়েছে। জাটকা সংরক্ষণে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত দুই বছর ধরে মে ও জুন মাসের পরিবর্তে জুলাই মাসের শেষ দিকে বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় ইলিশ মিলেছে। এবার ওই সময়ে ভারি বৃষ্টিপাতে ইলিশ পাওয়া যাবে। সূত্র: বাংলামেইল২৪.কম।

ঢাকা, ৮ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেএইচ