দেশের সাতটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে কুড়িগ্রাম, সিলেট, বগুড়া, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, জামালপুর ও সুনামগঞ্জে নদ-নদী গুলোতে বন্যার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ। বানের পানিতে তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার হেক্টর ফসলি জমি। বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশনের অভাবে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে খাদ্যের অভাব। বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বন্যার পানি প্রতিদিনই বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ভোগ। এখনো সরকারি ত্রাণ সহায়তা বন্যা কবলিত এলাকায় পৌঁছায়নি। কোথাও কোথাও ত্রাণ সহায়তা পাওয়া গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। রান্নার ব্যবস্থা না থাকায় সরকারি শুকনো খাবার পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে শত শত দরিদ্র পরিবার।
বগুড়া : বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২০ মিটার ধসে গেছে। অন্যদিকে ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ধুনট, সোনাতলা ও সারিয়াকান্দির চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে পানিবন্দি হয়ে থাকা ২৫ হাজার পরিবারের দিন কাটছে চরম দুর্ভোগে। বন্যা কবলিত এবং ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর অভিযোগ, তাদের সাহায্য করার জন্য কেউ নেই।
গাইবান্ধা : গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি বুধবারও অপরিবর্তিত রয়েছে। ঘাঘট নদীর পানি ১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে শহরের ডেভিড কোম্পানি পাড়া পয়েন্টে বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা, করতোয়া ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার নিচে থাকলেও পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার চর ও নদী তীরবর্তী নিম্না্ঞ্চলের বাড়িঘর থেকে এখনো পানি নামেনি। ফলে পানিবন্দি মানুষদের দুর্ভোগ কিছুতেই কমছে না।
বন্যা দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে বলে জানান সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু রাফা মো. আরিফ। তিনি বলেন, ‘বন্যা দুর্গত মানুষদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ সরবরাহ করা হচ্ছে।’
জামালপুর : জামালপুরে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনার পানি ১০ সে.মি. বেড়ে বুধবার সকাল থেকে বিপৎসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানির প্রবল তোড়ে মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ি ইউনিয়নের চর নাদাগাড়ি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় ১০০ মিটার এলাকা ভেঙে গেছে। এতে বন্যার পানিতে বিস্তীর্ণ জনপদ ডুবে গেছে। সুখনগরী, পূর্ব সুখনগরী, নাদাগাড়ি, শিলকাটি, তারতাপাড়া ও জোড়খালীসহ অন্তত : ১৫ টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে।
দু’সপ্তাহ ধরে যমুনার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জামালপুরের ৭ উপজেলার ২ লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। দুর্গত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গোখাদ্যের তীব্র সঙ্কট চলছে।
জামালপুর জেলা প্রশাসক মো. শাহাবুদ্দিন খান জানিয়েছেন, বন্যা দুর্গতদের জন্য এ পর্যন্ত ৬০ মে. টন চাল আর ৯ লাখ টাকার শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
লালমনিরহাট : লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তিস্তা ব্যারাজে পানিপ্রবাহ বিপৎসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বুধবার সকাল থেকেই।
তিস্তা ব্যারাজের কর্মকর্তারা জানান, উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে ভাটিতে লালমনিরহাটে তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে বুধবার (২৭ আগস্ট) পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগের দিন মঙ্গলবার পানিপ্রবাহ ছিল বিপদসীমার ২৫ সিন্টিমিটার উপরে। বুধবার পানি ৯ সেন্টিমিটার বেড়েছে। ফলে হাতীবান্ধা উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ও চর এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ওইসব ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামের ৯/১০ হাজার মানুষ। এসব জলমগ্ন এলাকায় চলছে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনা খাবারের সঙ্কট।
তবে এ উপজেলার পানিবন্দি এলাকা ও চরাঞ্চলের মানুষের মাঝে সরকারিভাবে ছয় মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমানের নেতৃত্বে এসব এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়।
এদিকে, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ইউনিয়নের তিন গ্রামের শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাটগ্রাম ইউএনও রফিকুল হক দহগ্রামে পানিবন্দি এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
অন্যদিকে ধরলার পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী, পাটগ্রাম, জগতবেড় গ্রাম ও লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।
লালমনিরহাট-২ (কালীগঞ্জ-আদিতমারী) নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এসময় তিনি স্থানীয় জন প্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি বন্যা কবলিত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানান।
তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া সার্কেলের বিভাগীয় প্রকৌশলী মাহাবুবুর রহমান তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, উজানে ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও গজলডোবা ব্যারাজের গেট খুলে দেয়ার কারণে তিস্তার পানি বিপদসীমার উপরে উঠেছে। এ কারণে আশপাশে এবং ভাটিতে নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে সার্বক্ষণিক অবহিত করা হচ্ছে।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘গত ১৫/১৬ দিন ধরে তিস্তায় পানি বিপদসীমার উপরে উঠা-নামা করার কারণে উজানে ও ভাটিতে কিছু কিছু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং পানিবন্দি লোকজনের সঠিক তালিকা করার জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোর নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী ত্রাণ চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।’
সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৯৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যায় দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও ছাতক উপজেলার দুই লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে আমন ধানের ক্ষেত, বীজতলা ও সবজি বাগান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা দুর্গতদের দেওয়া হয়েছে কিছু চাল ও নগদ টাকা।
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে গিয়ে আরো ৮ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। তবে গত ১০ দিন ধরে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটে জেলার লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, চৌহালী, শাহজাদপুর ও তাড়াশ উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নের মানুষ। তলিয়ে গেছে প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর ফসলি জমি।
বন্যার কারণ জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা আজিজুল হক জানান, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় প্রবল বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে ভারী বর্ষণ কমে গেলে বন্যার পানি ততটা বাড়বে না।
ঢাকা, ২৭ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, জেআই





