ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডের বিছানায় শুয়ে আছেন মো. কামাল হোসেন আরিফ। পায়ের দুই পাতায় এখনো শুকিয়ে আছে রক্ত। হাঁটুর নিচ থেকে পাতা পর্যন্ত ব্যান্ডেজে মোড়া। ব্যান্ডেজ ভিজে চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ছে রক্ত।
কামাল ছাড়াও নয়জন ওই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। সবারই পায়ের আঘাত তীব্র। আঘাত আছে হাতে আর কাঁধেও। শরীরের ভেতর ঢুকে গেছে স্প্লিন্টার। অন্যদিকে মাথায় তীব্র আঘাত নিয়ে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি আছেন লেস-ফিতা ব্যবসায়ী মো. জামাল হক।
হাসপাতালের উপপরিচালক মো. আবদুল গণি বলেন, ‘শুক্রবার রাত দুটোর পর থেকে ৬২ জন এসেছেন হাসপাতালে। এদের মধ্যে ১২ জনকে ভর্তি করা হয়। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ১২ জনের মধ্যে সাজ্জাদকে হাসপাতালের আনার পরপরই মৃত ঘোষণা করা হয়। আমরা ধারণা করছি, ও ঘটনাস্থলেই মারা যায়।’
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্যরা হলেন-নূর হোসেন, মো. সানোয়ার হোসেন, মো. মনির হোসেন, মো. জনি, মোসাম্মৎ হালিমা বেগম, আয়েশা বেগম, রিনা বেগম, সোহান ও মো. হাসান।
ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন কমপক্ষে আটজনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। শারীরিক যন্ত্রণা আছে সবার। তবে সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবিশ্বাসের যন্ত্রণা। আহতদের কেউ বিশ্বাসই করতে পারছেন না হোসনি দালানের মতো জায়গায় বোমা হামলা হতে পারে।
বোমা হামলায় আহত নূর হোসেন বলেন, স্ত্রী, সন্তান ও বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে হোসনি দালানের ভেতরে ছিলেন তিনি। মিছিল শুরু করার জন্য তারা যখন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান তখনই একটা শব্দ শুনতে পান। দ্বিতীয়বার শব্দটা আরেকটু স্পষ্ট হলে মিছিলের সংগঠকেরা তাদের দালান ছেড়ে বের না হওয়ার পরামর্শ দেন। তাদের বিশ্বাস ছিল হোসনি দালানের মতো পবিত্র জায়গায় কিছু হবে না। এর মধ্যেই মিছিলের ওপর মুহুর্মুহু বোমা হামলা হয়।
পা দুটোর কি হবে নূর হোসেন জানেন না। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে, এটুকু জানেন। নূর হোসেন আরও বলেন, ‘আমি ছয় বছর বয়স থেকে মিছিলে যাই। রাস্তায় বাইর হইলে দু’একবার কেউ কেউ ছুরি মারছে। কিন্তু বোমা? আমরা কোনো দিন ভাবি নাই।’ পাশের বিছানায় শুয়ে ছিলেন নূর হোসেনের ছোট ভাই মো. জনি। তাঁর গায়ের কাপড়ের রং আসলে কি ছিল বোঝা যাচ্ছিল না। রক্তে মাখামাখি হয়ে শুয়েছিলেন হাসপাতালের বিছানায়।
মো. সানোয়ার হোসেনের দুই পা, হাত ও কপালে আঘাত। বোন রিনা বেগম ও ভাগনে মো. হাসানকে নিয়ে মিছিলে গিয়েছিলেন। তিনজনই আহত। হাসপাতালের দোতলায় বোন ও ভাগনের জায়গা হয়েছে একই বিছানায়। 
কাঁদতে কাঁদতে রিনা বলেন, ‘আমাদের তিন বোনের ঘরে শুধু মেয়ে, এই একটাই ছেলে। মানতি করছিলাম মিছিলের সামনে নিব ছেলেকে। কোনো দিন ভাবি নাই দালানের ভেতর এমন কিছু হইব।’ পায়ে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে তিনি যখন পথে পড়েছিলেন, একটু দূরে আহত ছেলে গোঙাচ্ছিল। তিনি উঠে গিয়ে ছেলেটাকে কোলেও নিতে পারেননি।
যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে পাশেই অনবরত ছটফট করছিল ১০ বছরের সোহান। প্রতিবছরের মতো এবারও আশুরার আগে পতাকা ধুয়ে ইস্তিরি করে দিয়েছিলেন বাবা মো. সেলিম। বাবার হাত ধরেই মিছিলে দাঁড়িয়েছিল সে। বোমা বিস্ফোরণের পর বাবার হাত থেকে ছুটে যায় সোহান। তার ফুপু হোসনে আরা বলেন, ‘পায়ে তো ব্যথা পাইছেই। কত রক্ত যে গেছে। দুই ব্যাগ রক্ত দিছি। আরও চার ব্যাগ লাগবে। পেটে অপারেশন করে স্প্লিন্টার বাইর করতে হবে।’
সকালে আহতদের দেখতে যান প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। সবার চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। আলাদা আলাদাভাবে প্রত্যেকের সঙ্গে কথাও বলেন তিনি।
আহতদের দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছিলেন সাংবাদিক আবুল মকসুদ। তিনি বলেন, ‘আহতদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল। গোয়েন্দা নজরদারি ও পুলিশ-র্যাবের জোরদার নিরাপত্তা থাকলে এ ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা এড়ানো সম্ভব হতো।
তিনি আরো বলেন, কিছুদিন থেকেই মন্ত্রী পর্যায়ের নেতারা বলছেন সন্ত্রাসী নাশকতা হতে পারে। তারপরেও কেন নিরাপত্তা জোরদার করা হলো না? আমাদের দাবি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হোক।’
ইআর





