জাতীয় অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ সালাহ্‌উদ্দিন আহমেদ আর নেই (ইন্না...রাজিউন)।

রোববার সকাল ৬টার দিকে বার্ধক্যজনিত রোগে তিনি নিজ বাসভবনে মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।

ড. সালাহ্উদ্দীন আহমেদের জন্ম ১৯২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরে। কিন্তু একাডেমিক সার্টিফিকেটে তাঁর জন্ম সাল দেওয়া আছে ১৯২৪। তাঁর পুরো নাম আবুল ফয়েজ সালাহ্উদ্দীন আহমেদ।

ফরিদপুরে পূর্ব পুরুষদের বাড়ি এবং সেখানে জন্ম হলেও বাবার চাকরির কারণে খুব বেশি সময় সেখানে কাটেনি তাঁর। ছেলেবেলা ও শিক্ষাজীবনের অধিকাংশ সময়টাই কেটেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। বাবা ফয়জুল মহিন ছিলেন সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁর দাদাও ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট।

ফলে, বাবার চাকরির সূত্রেই ঘুরে বেড়িয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে। নানা স্থানে ঘুরে বেড়ানো, নানা জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষের সঙ্গে মেশাকে জীবনের অনেক বড় সঞ্চয় বলে মনে করেন ড. সালাহউদ্দীন আহমেদ।

তিনি জীবন কাটিয়েছেন একেবারে নিজের মতো করে মুক্ত বিহঙ্গের মতো। কোনো পিছুটান ছিল না। বরং এতে উৎসাহই দিতেন মা আকিফারা খাতুন। মা ছিলেন খুবই ধার্মিক। তাঁর কাছেই সালাহ্উদ্দীন আহমেদ ছোটবেলায় কোরান শরীফ পড়া শিখেছেন। সাত-আট বছরের মধ্যেই তিনি কোরান মুখস্থ করে ফেলেন। বাড়িতে চল ছিল উর্দু আর বাংলা ভাষার। তাঁদের পরিবারটি ছিল ধর্মের প্রতি অনুরক্ত। সালাহ্উদ্দীন আহমেদরা তিন ভাই ও তিন বোন। তিনি সবার বড়। অন্য ভাই-বোনরাও উচ্চশিক্ষিত।

১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে সালাহ্উদ্দীন আহমেদ ঢাকার জগন্নাথ কলেজে ইতিহাস বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। এখানে প্রায় ছয় বছর একটানা কাজ করেন। এখানে পড়ানোর সময়েই ঘটে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন। তখন জগন্নাথ কলেজে 'জগন্নাথ কলেজ বাংলা সংস্কৃতি সংসদ' নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। অজিত গুহ ছিলেন এই সংগঠনটির প্রাণ। সালাহ্উদ্দীন আহমেদসহ অন্যান্য শিক্ষকরা এখান থেকেই ছাত্রদের ভাষা আন্দোলনে উৎসাহিত করতেন।

এর জন্য অবশ্য তাঁদেরকে কলেজের পাকিস্তানপন্থী শিক্ষকদের নানা কটু কথা শুনতে হতো। ১৯৫৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হবার পর সেখানে তিনি ইতিহাস বিভাগে যোগ দেন। পরে পর্যায়ক্রমে তিনি ওই বিভাগের রিডার ও প্রফেসর-এর পদে উন্নীত হন।

ইতোমধ্যেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। সালাহ্উদ্দীন আহমেদ যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যান তখন সেখানে আরো একঝাঁক প্রতিভাবান মানুষ তাঁর সহকর্মী হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তখন সত্যিকার অর্থেই সাহিত্যের তীর্থভূমি। কবি ও সাহিত্যিক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও মুস্তাফা নুরউল ইসলামের সম্পাদনায় বের হয় 'পূর্বমেঘ'-এর মতো বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা। লোক গবেষক কবি মযহারুল ইসলাম বের করেন 'উত্তর অন্বেষা'। রাজশাহী থেকে বের হয় আরো তিনটি সাহিত্য পত্রিকা 'সুনিকেত মল্লার', 'বনানী' ও 'একান্ত'। আর অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক বদরুদ্দীন উমর, অধ্যাপক মশাররফ হোসেন, হাসান আজিজুল হক, গোলাম মুরশিদ, সনৎ কুমার সাহা, আবদুল হাফিজ, আলী আনোয়ার সবাই মিলে যেন এক শিল্প-সাহিত্যের রাজত্ব তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ড. সালাহ্উদ্দীন আহমেদ শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি অবসর জীবন-যাপন করছেন। সালাহ্উদ্দীন আহমেদের প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- 'Social Ideas and Social Change in Bengal 1818-1835', 'Bangladesh : Traditional and Transformation', 'বাংলাদেশের জাতীয় চেতনার উন্মেষ ও বিকাশ', 'স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব বরণীয় সুহৃয়' প্রভৃতি।

এএইচ