রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুণগত মানের পতন হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যক্তি খাতে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সর্বত্রই আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। শ্রমবাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ীদের উদ্ভাবনী শক্তি নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
ইস্টার্ন ব্যাংকের সহযোগিতায় আজ মঙ্গলবার প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘বিনিয়োগে স্থবিরতা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন।
দেবপ্রিয় বলেন, এই এক ধরনের বৈকল্যের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতির যে স্থিতিশীলতার সুযোগ, তা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অথচ এই সময়ে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধির হার, বৈদেশিক মুদ্রার বড় মজুদ (রিজার্ভ), বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে এগিয়ে থাকা, স্থিতিশীল মূল্য পরিস্থিতির বড় সুযোগ রয়েছে।
এই আলোচনাকে কেন্দ্র করেই বিনিয়োগের বাধা ও উত্তরণের পথগুলো উঠে আসে আলোচকদের বক্তব্যে।
দেবপ্রিয় তথ্য দিয়ে জানান, ২০১১-১২ সাল থেকে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা শুরু হয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ে। ফলে মোট বিনিয়োগ বাড়ে। তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগও এ সময় কমেছে। আর মুনাফা হিসাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা বিদেশি কোম্পানি যে পরিমাণ লভ্যাংশ নিয়ে গেছে, তা তাদের বার্ষিক বিনিয়োগের প্রায় সমপরিমাণ।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিলে সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। গোলটেবিল সঞ্চালন করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদ্ক আব্দুল কাইয়ুম।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান সৈয়দ আবদুস সামাদ বলেন, অবকাঠামোর অভাব, বন্দর সমস্যা, বিদ্যুৎ সমস্যা, গ্যাসের অভাব এগুলো ৩০ বছর ধরেই শুনে আসছেন। কিন্তু নতুন হচ্ছে সুশাসনের অভাব। আগে এটা ছিল না। তখন বলা হতো সরকার কী করছে?
তিনি বলেন, যে দেশে নির্দেশিত ঋণ আছে সেখানে সমস্যা হবেই। তিনি বলেন, সাতটি সংস্থা বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত, এর একটি হচ্ছে বিনিয়োগ বোর্ড।
ইউনিলিভারের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরান বাকর সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) দেশের অগ্রাধিকারের মধ্যে আছে কি না, সেই প্রশ্ন তুলে বলেন, অগ্রাধিকারে থাকলে জাতীয় সংসদে আলোচনা হতে পারত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ নওশাদ আলী চৌধুরী বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে বলেন, যে শিরোনামে আলোচনা হচ্ছে সেই স্থবিরতা শব্দ নিয়ে তাঁর দ্বিমত আছে। বিনিয়োগ বাড়ানো যদি লক্ষ্য হয়, তবে সম্ভাবনার দিক তুলে ধরে আলোচনা করতে হবে। তিনি অর্থনীতির নানা সূচক তুলে ধরেন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রোকেয়া আফজাল রহমান বলেন, তিনি তাঁর ব্যবসায় আগে নেতিবাচক তথ্যগুলো জেনে নিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন। তিনি জানান, বিদেশিরা বাংলাদেশকে গ্রিন ফিল্ড বা এখনো অনুন্মোচিত মনে করেন। অনেক সম্ভাবনা আছে মনে করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতায় গত বছরের শেষ ভাগে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা বসে গেছে। অস্থিরতা এখনো কাটেনি। তিনি খেলাপি ঋণ সৃষ্টির এটা একটা বড় কারণ বলে মত দেন।
ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার তাঁর বক্তব্যে ব্যাংক খাত নিয়ে দুশ্চিন্তাকে নাকচ করে বলেন, দেশে তিন ধরনের ব্যাংক আছে—রাষ্ট্রীয়, দেশি বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংক। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ওপর দেরিতে হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকের বিনিয়োগে ধীরগতি থাকতে পারে, কিন্তু স্থবিরতা নেই। প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি আছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, বিনিয়োগের স্থবিরতা আছে, এটা ঠিক। তবে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে এটা নিশ্চিত করা কঠিন। ব্যাংকের অর্থায়নে সমস্যা আছে, আর সঙ্গে অন্যান্য সমস্যাও আছে। তিনি বলেন, দেশি বিনিয়োগ আগে দরকার। তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। আর লম্বা সময়ের বিদেশি বিনিয়োগ পেতে অনেক সময় বাংলাদেশের লাগবে। এ ধরনের বিনিয়োগ বিশ্বের ২০০ দেশের মধ্যে ১০-১২টি দেশে যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গটি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের সভাপতি আফতাব-উল ইসলামও তোলেন।
তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ না আসার প্রধান কারণ অনিশ্চয়তা। আমেরিকায় নয়-এগার অর্থাৎ টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর বিশ্বের হিসাব বদলে গেছে। তার আগে বিদেশি বিনিয়োগ শুধু ফেরত নেওয়ার নিশ্চয়তা ও লভ্যাংশ পাওয়ার সুযোগ থাকলেই কোনো দেশে যেত। এখন নিশ্চয়তা ও তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্যে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ নীতি ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়টি আনেন।
তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেই যদি নীতি পরিবর্তন হয়, তবে বিনিয়োগকারী বিভ্রান্ত হয়।
তিনি বলেন, নীতি প্রণয়ন করে এক দল, আরেক দল তা পালন করে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা তা পালন করছে না। ব্যাংক খাতে যে ঋণ কেলেঙ্কারি হচ্ছে তাতে নীতির কোনো অভাব আছে, এটা মনে হয় না।
সাবেক গভর্নর বলেন, অর্থমন্ত্রী যখন স্বয়ং বলেন, রাজনৈতিক কারণে তিনি ব্যাংক দিয়েছেন, তখন বিদেশিরা এসব ব্যাংকের প্রতি কোনো আস্থা রাখতে পারে না। এদের কোনো ঋণপত্র (এলসি) তাঁরা নেন না। রাষ্ট্রখাতের ব্যাংকগুলোর এলসিও তাঁরা নেন না।
সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালেদ অবশ্য বিনিয়োগ স্থবিরতার ক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক গ্রুপের বিনিয়োগ না করার সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ তোলেন।
তিনি বলেন, শীর্ষ ১০০ বড় বিনিয়োগকারীর তালিকা নিলে দেখা যাবে ১০-১৫ এখন আর বিনিয়োগ করছে না। এদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধীর তালিকাতে দুই-একজনের নাম আছে।
তবে আমানত ও ঋণের সুদ হারে ব্যবধানের এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন সিটিব্যাংক এনএর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাশেদ মাকসুদ ও ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।
রাশেদ মাকসুদ বলেন, তাঁদের তহবিল ব্যয় ২ থেকে ৩ শতাংশ। এখন ৫ শতাংশ ব্যবধানে যদি ঋণের সুদ হয়, সেটা কী ঠিক হবে? আর সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণে হিসাবটি তো ভিন্ন সেখানে একটা প্রকল্পের ব্যয় আর বড় ধরনের ঋণ প্রকল্পের ব্যয় কি তুলনীয় হবে। তারা উভয়ই প্রশ্ন তোলেন, ব্যবধান হিসাবে পদ্ধতি নিয়ে।
মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, নতুন নয় ব্যাংক এসেছিল কিছু অঙ্গীকার করে। যেমন তারা রেমিট্যান্স নিয়ে কাজ করবে, কৃষি খাতে কাজ করবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তারা পুরানো ৪৭ ব্যাংকের মতোই ব্যাংকিং করছে।
ইসলামী ব্যাংকের এমডি আবদুল মান্নান বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ঋণের ১৭ শতাংশ তাঁদের ব্যাংক দিচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে এ ক্ষেত্রে ঋণে তাঁদের অভিজ্ঞতা ভালো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক কাজী সাইদুর রহমান বলেন, বিদেশ থেকে ঋণ আনতে দেওয়া হচ্ছে যখন বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ২২০০ কোটি ডলার তখন। ফলে এই ঋণ পরিশোধের সমস্যা হবে না।
এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক নওশাদ আলী চৌধুরী বলেছিলেন, বিদেশ থেকে বেসরকারি খাত ঋণ আনছে বলেই ব্যাংক খাতে অলস অর্থের পরিমাণ এত বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে তিন হাজার কোটি টাকার অলস অর্থ আছে।
সূত্র: প্রথম আলো
ঢাকা,৯ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেএ





