নিষ্ঠুরতার শেষ কোথায় জানা নেই কারো। ভাগ্যের পরিহাসে সোনালী সংসার ছেড়ে পরবাসী হয়ে অন্যের দরজায় কড়া নাড়তে হল। লেদা রোহিঙ্গা বস্তিতে এমন ৩ জনের সাথে পরিচয় হয়।
তাদের সাথে কথা বলে জানা যায় তারা তিনজনই সম্পর্কে শাশুড়ি ও পুত্রবধূ। একজনের স্বামীকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা ও দু’জনের স্বামীকে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে গেছে মিয়ানমারের মিলিটারি।
পরে খবর মেলে তাদেরও হত্যা করা হয়েছে। দু’জন এখন অন্তঃসত্ত্বা। প্রাণ বাঁচাতে তিনজনই গত ১লা ডিসেম্বর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন। বর্তমানে তাদের আশ্রয় স্থান টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা বস্তিতে।
লেদা রোহিঙ্গা বস্তিতে গিয়ে এক পর্যায়ে দেখা হয় স্বামী হারা একই পরিবারের তিনজন মহিলার সঙ্গে। এরা হচ্ছে আরকান রাজ্যের মংডু বড় গৌজিবিল গ্রামের সনজিদা বেগম (৫০) ও তার দুই পুত্রবধূ তছলিমা বেগম (২০) ও রমিদা বেগম (২১)।
সনজিদা জানান, সহিংসতার শুরুর সপ্তাহে তার স্বামী মো. ইলিয়াছ (৬০)কে চোখের সামনে নির্যাতন চালিয়ে ও পরে গুলি করে হত্যা করেছে। বাড়িতে আগুন দিয়ে সবকিছু পুড়িয়ে দিয়েছে। তবুও ছেলে-পুত্রবধূদের সঙ্গে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে গত দেড় মাস যাবৎ কোনোরকম জীবনযাপন করে আসছিল।
কিন্তু সামরিক জান্তা পুরো গ্রামের ঘরবাড়ি, মসজিদ ও মাদরাসা জ্বালিয়ে দিয়ে গ্রামের মানুষকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। অনেককে চোখের সামনে আগুনে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মারতে দেখা গেছে।
আলেম ও যুবকদের চোখ বেঁধে নিয়ে গেছে। সেখান থেকে তারা যেভাবে যেখানে পারে আশ্রয় নিয়ে কোনো রকমে দিন যাপন করে। হঠাৎ এক রাতে মিলিটারি বাহিনী আশ্রয় নেয়া ঘরে ঢুকে তার ছেলে উসমান গনি (২৮) ও মো. রফিক (৩১)কে চোখের সামনে লাথি, ঘুষি, বন্দুকের বাঁটের আঘাতে অমানুষিক নির্যাতন চালায়।
পরে চোখ বেঁধে কোথায় যে নিয়ে গেল হদিস মেলেনি। ১০ দিন পর খবর মেলে দু’জনকেই হত্যা করা হয়েছে।সনজিদা আরো জানায়, প্রতিদিন রাতে কোনো না কোনো ঘরে ঢুকে যুবতী মেয়েদের ধর্ষণ করছে মিলিটারি বাহিনী ও রাখাইনরা। তাদের চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠে।
এমন বর্বরতা ও অমানবিকতা থেকে ইজ্জত এবং প্রাণ বাঁচাতে দুই পুত্রবধূকে নিয়ে কোনো রকমে নৌকা ভাড়া জোগাড় করে গত ১লা ডিসেম্বর বাংলাদেশে চলে আসি।
দমদমিয়া থেকে অনুপ্রবেশ করে লেদা রোহিঙ্গা বস্তিতে এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় পায়। কিন্তু খাদ্য, বস্ত্র কিছুই নেই। অর্ধহারে অনাহারে দুই অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূকে নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় রয়েছি। তাদের স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও চিকিৎসা করাতে পারছি না। আমি খুবই অসহায় হয়ে পড়েছি।
স্বামী হারা তছলিমা ও রমিদা বেগম জানান, মিলিটারি বাহিনীর কাছে স্বামীকে হারিয়েছি। বর্তমানে আমরা অন্তঃসত্ত্বা। ইজ্জত বাঁচাতে শাশুড়ির মার সঙ্গে বাংলাদেশে চলে আসি। এখানে এসে খাদ্য, বস্ত্র ও শীতে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। তবুও মগের নির্যাতন থেকে রেহাই পেয়েছি। এতেই খুশি।
এখন তাদের মুখে শুধু আকুতি ‘আমাদের বাঁচতে দিন, একটু সহায়তা করুন, আরকানের রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ান।’
উল্লেখ্য, গত ৯ই অক্টোবর মিয়ানমারের আরকান রাজ্যে বিজিপি ক্যাম্পে সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিলিটারি বাহিনী অত্যাচার, নিপীড়ন, হত্যা, গুম, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে ব্যাপক বর্বরতা শুরু করে।
সেই নির্যাতন থেকে বাঁচতে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। তবে সীমান্ত বাহিনী বিজিবির কড়াকড়ি থাকায় দালালদের মাধ্যমে রাতে কিছু কিছু রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।
মাহমুদ





