টানা চারদিনের ভারি বর্ষণে চট্টগ্রামের ১১টি উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, সড়ক, ফসলি জমি ও চিংড়িঘের। বানের পানিতে ভেসে গেছে গৃহপালিত পশুসহ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র।
চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এসব এলাকার অনেক লোকজন রান্না করতে না পারায় সেহেরি না খেয়ে রোজা রেখেছে। বানের পানিতে ঘর ডুবে যাওয়ায় অনেক মানুষ সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন,‘সাতকানিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা ও রাউজান উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের লোকজন পানিবন্দী রয়েছে বলে খবর পেয়েছি। বাকি উপজেলাগুলোর আংশিক এলাকায় পানি উঠেছে। পানিবন্দী লোকজনকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ’
তিনি বলেন,‘মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আশা করছি আজকের মধ্যে বরাদ্দ পাবো। শনিবার বানভাসি লোকজনের সহায়তার জন্য সবগুলো উপজেলায় বরাদ্দ দেওয়া হবে।’
সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম বাজালিয়া, পূর্ব বাজালিয়া, বড় দুয়ারা, ঘিলাতলী, মাহালিয়া এলাকা পানিতে ডুবে আছে। এখানে পাহাড়ি ঢল ও শঙ্খ নদীর পানিতে চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়কের উপর পানি বয়ে যাচ্ছে। ফলে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এসব এলাকার লোকজন বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে।
এছাড়া চরতি ইউনিয়নের ১৬টি গ্রাম পানির নিচে ডুবে আছে। এসব এলাকার সড়কগুলোও পানিতে ডুবে গেছে। উপজেলা সদরের সঙ্গে এসব এলাকার সড়ক যোগাযোগও বন্ধ রয়েছে। নলুয়া ইউনিয়নের চারটি গ্রাম ও আমিলাইশ ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের লোকজনও পানিবন্দী রয়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্ল্যাহ বলেন,‘সাতকানিয়া উপজেলার সবগুলো গ্রামে কমবেশি পানি উঠেছে। কিন্ত বাজালিয়া, চরতি, নলুয়া ও আমিলাইশ এ চারটি ইউনিয়নে একটু বেশি পানি উঠেছে। লাগাতার বৃষ্টি হতে থাকলে অবস্থা আরও অবনতি হবে। আমরা পানি সরিয়ে নিতে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যারা আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে তাদের মাঝে শুকনো খাবারের বিতরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’
লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া, আমিরাবাদ ও লোহাগাড়ার লোকজন পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার সড়ক ও ঘরবাড়ি ডুবে গেছে।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফিজনূর রহমান বলেন,‘কমবেশি সব এলাকায় পানি উঠেছে। তবে বড়হাতিয়া, আমিরাবাদ ও লোহাগাড়া এলাকায় একটু বেশি পানি উঠেছে।’
বাঁশখালী উপজেলার শেখেরখীল, বাহারছড়া, চাম্বল, গন্ডামারা, খানখানাবাদ এসব ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামের লোকজন পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বঙ্গোপসাগরের বেড়িবাঁধও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে জানা গেছে।
খানখানাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু ছিদ্দিক আবু বলেন,‘ইউনিয়নের চারটি গ্রামের প্রায় ১৭’শ পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বেড়িবাঁধের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশ ভেঙ্গে গেছে। যেকোন মুহূর্তে পানি ঢুকে পড়তে পারে। এছাড়া কয়েকটি মাছের ঘের ডুবে গেছে। স্লুইস গেইটগুলো দিয়ে পানি সরিয়ে নেওয়া চেষ্টা করা হচ্ছে।’
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ আহমেদ খান বলেন,‘কয়েকটি গ্রামের লোকজন পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বাঁধ কেটে কয়েকটি এলাকায় পানি নামিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। বৃষ্টি বন্ধ হলে পানি নেমে যাবে বলে আশা করছি। ’
তবে জলাবদ্ধতা এখনো সহনীয় পর্যায়ে আছে বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।
আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর, জুইদণ্ডী, বরুমচড়া এলাকায়ও পানি উঠেছে। তবে শঙ্খ নদী ও উপকূলীয় এলাকার লোকজন বেশি দুর্ভোগে পড়েছে বলে জানা গেছে।
চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী ইউনিয়নের চাগাচর দিয়াকুল, নয়াপাড়া, রায়জোয়ারা, কিল্লাপাড়া ও বৈলতলী ইউনিয়নের লোকজন পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার সড়কগুলো পানির নিচে ডুবে গেছে। শঙ্খ নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়া ও পাহাড়ি ঢলে এসব এলাকায় পানি বাড়ছে বলে জানা গেছে। নদী ভাঙনের শিকার হচ্ছে শঙ্খপাড়ের লোকজন।
চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীদা শরমিন বলেন,‘টানা বৃষ্টিতে শঙ্খ নদীর পানি বেড়ে গেছে। শঙ্খপাড়ের এলাকার লোকজন পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক যোগযোগ রাখছি। পানি বিপদ সীমার উপরে বয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পটিয়া উপজেলার জুলধা ইউনিয়নের জুলধা, ডাঙ্গারচর ও বড় উঠান ইউনিয়নের বড় উঠান, দৌলতপুর ও শাহমীরপুর এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামীণ সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোকেয়া পারভীন বলেন,‘দুইটি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি বন্ধ হলেই পানি নেমে যাচ্ছে। লাগাতার বৃষ্টি হলে পানিবন্দী হয়ে পড়বে লোকজন।’
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম মজুমদার বলেন,‘ভারি বর্ষণের কারণে প্রায় সবগুলো ইউনিয়নে পানি উঠেছে। সকাল থেকে বৃষ্টি কম হওয়ায় পানি নেমে যাচ্ছে।’
একই কথা বললেন রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কুল প্রদীপ চাকমাও।
ফটিকছড়ি উপজেলার নারায়ণহাট, হারুয়ালছড়ি, ভুজপুর, লেলাং, ধুরুং, গজারিয়া ও বারোমাসিয়া গ্রামে পানি উঠেছে বলে জানা গেছে।
তবে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন,‘বৃষ্টিতে পানি জমেছে। তবে পানিবন্দী হয়ে পড়েনি লোকজন।’
হাটহাজারী উপজেলার ফরহদাবাদ, ধলই, নাঙ্গলমোড়া, গুমানমর্দন, মেখল, শিকারপুর ও আলমপুর এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোয়াজ্জম হোসাইন।
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া দপ্তর।
পূর্ভাবাসে বলা হয়েছে, আকাশ মেঘলা থেকে মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। সেই সঙ্গে অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ী দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরণের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
চট্টগ্রামে কোথাও কোথাও মাঝারি ধরণের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া দপ্তরের আবহাওয়াবিদ নিলুফার জাহান বলেন,‘মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকায় আরও কয়েকদিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।’
জেআই





