পঞ্চগড় জেলা সদরের বাংগালপাড়া সীমান্তের যুদ্ধকালীন স্মৃতি খুঁজতে যুদ্ধভূমি পরিদর্শন করেছেন ওই ইউনিটের মুক্তিযোদ্ধাগণ।
শনিবার দুপুরে তারা বাংগালপাড়া এলাকার মুক্তিযুদ্ধকালিন ক্যাম্পে মিলিত হন। পরে সম্মিলিতভাবে হাড়িভাসা, ঢাঙ্গিপুকুরি, মানিমাছপুকুরি, মনোহর দিঘিসহ কয়েকটি যুদ্ধভূমি পরিদর্শন করেন।
কুশল বিনিময় করেন যারা একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছিলেন তাদের সাথে। দীর্ঘ ৪৩ বছর পর আবার দেখা হওয়ায় সবাই আবেক আপ্লুত হয়ে পড়েন। ওঠে আসে যুদ্ধকালীন নানা স্মৃতি। কেউ আর আগের মতো নেই। কেউ কেউ মারা গেছেন। কেউ বৃদ্ধ। তবে সবার কাছে যুদ্ধের স্মৃতি আজও অমলিন হয়ে আছে।
ঠাকুরগাঁও জেলা কমান্ডের সাবেক সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধকালিন বাংগালপাড়া হাইডাউটের ইউনিট প্রধান খায়রুল আলম স্মৃতিচারণ করে বলেন, ৬/ক সাব সেক্টরের সিভিল এ্যাডভাইজার সিরাজুল ইসলাম এম. পি. এর পরামর্শে ৬/ক সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর সদর উদ্দিন ১৯৭১ সালের ১৫ ই সেপ্টেম্বর পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী গ্রাম বাংগালপাড়ায় গহিমউদ্দিন উদ্দিন সরকারের বাড়িতে গেরিলা মুক্তিবাহিনী ক্যাম্প স্থাপনের নির্দেশ দেন।
সেই মতে অত্র এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আনোয়ার হোসেন সরকারের পরামর্শে কোম্পানি কমান্ডার মোখলেছুর রহমানকে বাংগালপাড়া ক্যাম্পের কমান্ডার করে পাঠানো হয়। এই ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ১৪-১৫ জনের দলে বিভক্ত হয়ে গ্রামে গ্রামে নিয়মিত টহল দিতেন।
পাশ্ববর্তী হাড়িভাসায় পাক বাহিনীদের ক্যাম্প ছিল। চোখের সামনে খপরাবান্দি, হাড়িভাসা ক্যাম্প কোলনি ও মাটিয়াপাড়া গ্রামে জ্বালিয়ে দেয় পাকসেনারা। এখান থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমনে পাকসেনারা এ এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
বাংগালপাড়া গ্রামের শাহাবুদ্দিন সরকার বলেন, আমার বাবা গহিম উদ্দিন একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি যুদ্ধকালিন সময়ে আনছার বাহিনীর ট্রেনিং প্রাপ্ত ছিলেন। তাই সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি আমাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প করতে সহায়তা করেন।
আমার মা শাফিয়া খাতুন (৬৫), চাচী সুফিয়া খাতুন (৭০) তাদের রান্না করে খাওয়াতেন। বাবা মারা গেছেন। কিন্তু আজও আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পান নি। তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দিলে শান্তি পেতাম।
বাংগালপাড়া ক্যাম্পের নোঙ্গরখানার মূল পরিচালক ছিলেন শামসুল হক (৬০)। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাজার করা থেকে রান্না পর্যন্ত সব করতেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের গাইড হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মাঝে মাঝে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন। তার সহায়তায় এক রাজাকারকে ধরে আনা হয়েছিল বলেও জানা যায়। কিন্তু তিনি আজও অবধি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি।
যুদ্ধভূমি ও ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে মুক্তিযোদ্ধারা নিজ নিজ স্মৃতি ব্যক্ত করেন। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইসমাইল হোসেন, বীরমুক্তিযোদ্ধা জাকির হোসেন, জফির উদ্দিনসহ বাংগালপাড়া ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা যেসব মুক্তিযোদ্ধাদের এখনো পরিচয়পত্র দেয়া হয়নি তাদের দ্রুত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার দাবি জানান। একই সাথে এসব যুদ্ধভূমি ও ক্যাম্প ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সংরক্ষণের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।
এসএইচ





