পুরান ঢাকার চক বাজারের শাহী ইফতার বাজার ভোজনবিলাসী ঢাকাবাসী এক ঐতিহ্যের নাম।
এখানকার খাবারগুলো যুগ যুগ ধরে ঢাকাবাসী তথা বাঙাল মুলুকের মুসলিম জনগোষ্ঠির ভোজন রসিকতার প্রমাণ রাখছে। বাড়িতে তৈরি ইফতারের সঙ্গে বাড়তি আইটেম যুক্ত করতে অনেকেই চক বাজারে ছুটে আসেন ঐতিহ্যবাহী মুখরোচক খাবারের সন্ধানে।
শুক্রবার প্রথম রোজায় বাবার সঙ্গে চকের ইফতার বাজারে গিয়েছিল ৮ বছরের শিশু ফারিয়াজ। সেখানে এটা তার প্রথম যাওয়া। নানা ধরনের খাবারের মধ্যে সুতি কাবাব তার পছন্দ হয়।
জুম্মন মিয়ার দোকান থেকে আধা কেজি গরুর সুতি কাবাব ৩০০ টাকায় কিনে বাসায় ফেরে তারা। ফারিয়াজ বাসায় গিয়ে সুতি কাবাবের একটু খেয়েই বলল, ‘এটা টক আর গন্ধ’।
পরে ইফতারের সময় বাসার অন্যরাও দেখল তার কথাই ঠিক- বাজে গন্ধ আর টক। ঘেঁটে দেখা যায়, সুতি কাবাবের নামে ময়দা সদৃশ কিছুর সঙ্গে পেঁয়াজ ভাজা এবং সামান্য গরুর মাংস দিয়ে এটা বানানো হয়েছে। ওপর দিয়ে কড়া করে ভাজা ছিল বলে দেখে বোঝার উপায় নেই যে কাবারের ভেতরে এই অবস্থা।
একই দিন তেজগাঁও কলেজের অনার্সের ছাত্র ইকবাল আহমেদ চকবাজার থেকে দইবড়া কেনেন। ইফতারের সময় খেতে গিয়ে দেখেন, দইটা ফেনা ফেনা এবং বড়াগুলোও নষ্ট। কেনার সময় নানা ধরনের মসলা দেখে বোঝার কেনো উপায় ছিল না যে খাবারটা অনেক আগেই পচে গেছে।
চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী অনেক খাবারেরই আজ এ দশা। দিন দিন সেখানকার অনেক খাবার মানহীন ও অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে। আর এর পেছনে রয়েছে চকবাজারের ঐতিহ্যের নাম ভাঙিয়ে একশ্রেণীর মৌসুমি ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের ভেজাল ও নিুমানের খাবার পরিবেশন।
তার ওপর এখানকার খাবার পরিবেশন করা হয় খোলা আকাশের নিচে। অনেকে নামমাত্র ছাউনি ব্যবহার করে- অনেকে তা-ও করে না। ধুলাবালি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলে রান্না ও খাবার পরিবেশন।
শনিবার সকালে চকবাজারে সরেজমিন দেখা যায়, রাস্তার ওপরেই চলছে নানা ধরনের খাবার তৈরির তোড়জোড়। পোড়া তেলে ভাজা হচ্ছে সব খাবার। ভেসনে দেয়া হচ্ছে ইচ্ছেমতো খাবার সোডা।
তাতে যা-ই ভাজা হোক না কেন, তা যেন ফোলা আর বড় দেখায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেখানকারই এক দোকানদার বললেন, চকবাজারে হাতে গোনা কয়েকজন ইফতারি বিক্রি করেন, যারা বংশপরিক্রমায় এখানে ব্যবসা করে আসছেন। তারা এখানে বছরের অন্যান্য সময়ও বিভিন্ন ধরনের খাবার বিক্রি করেন।
তারা ছাড়া বেশিরভাগই এখন মৌসুমি ইফতারি ব্যবসায়ী। ভেজাল খাবারের প্রসঙ্গ টানতেই এ ব্যবসায়ী বললেন, ভেজালে পুরো দেশ ভরে গেছে। চকবাজারও এর বাইরে না।
ভেজাল তেল, ভেজাল ঘি, ভেজাল মসলা, ভেজাল রং, ভেজাল দুধ সবই চলতেছে। চকবাজার থানার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, প্রশাসনের সামনেই সব হচ্ছে। কে কী কইব?
আরও জানা যায়, চকবাজারে যেসব ইফতারি পদ বিক্রি হয়, তা প্রস্তুত হয় আগের দিন রাতে বা যেদিন বিক্রি করা হবে সেদিন সকালে।অথচ খোলা অবস্থায় সারা দিন এ খাবার রেখে দিয়ে খাওয়া হচ্ছে সন্ধ্যায় বা রাতে।
বিকালে আরেকবার চকবাজার গিয়ে দেখা গেল, ‘বড় বাপের পোলায় খায় ঠোঙ্গায় ভইরা লইয়া যায়’ নামের ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করা হচ্ছে। দোকানিরা অনেকে অস্বাস্থ্যকরভাবে বাম হাতে ডান হাতে মাংসসহ এই খাবারের নানা উপকরণ ছিঁড়ছেন, মেশাচ্ছেন।
পুরান ঢাকার মালিটোলার স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী আবদুর রহিম সুমন বলেন, আমার বাবা মারা গেছেন বছরপনেরো আগে। বাবা ‘বড় বাপের পোলা’ পছন্দ করতেন। ছোটবেলায় ‘বড় বাপের পোলা’ মুখে দিলে প্রত্যেকটা পদের একটা ফ্লেভার পাওয়া যেত। আগে যারা বানাতেন, তারা মানের দিকে কেনো ছাড় দিতেন না।
আর এখন তো ভেজাল মসলা, ভেজাল তেল, কম মাংস দিয়ে মানুষ ঠকানো হয়। আগের সেই স্বাদ নেই। তাই এখন আর চকবাজার থেকে ইফতারি কেনা হয় না। ঐতিহ্যবাহী খাবারের নামে বর্তমানে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির দিক উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও
খাদ্যবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. খুরশীদ জাহান বলেন, পুরান ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী যেসব খাবার বিক্রি হয়, তা খোলা বাজারে পরিবেশন করা হয়, যেখানে মশা-মাছি বসে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাইজেনিকভাবে খাবার প্রস্তুত হয় না। একই তেল দিনের পর দিন ব্যবহার করা হয়। এসব খাবারে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। এসব খাবার খেলে পেটের পীড়া, টাইফয়েড হতে পারে। তাছাড়া অর্গানিক ক্ষতির পাশাপাশি ক্রনিক ইনফেকশন হতে পারে। এএস





