গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বিকল্প ছিল না বলে আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, শুধু নির্বাচন গণতন্ত্রের মাপকাঠি নয়।
বিএনপিবিহীন দশম সংসদ নির্বাচনের সমালোচনামুখর প্রবীণ এই রাজনীতিক শনিবার এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অকার্যকরিতায় হতাশা প্রকাশ করে একথা বলেন।
মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘বাংলাদেশের শাসন পরিস্থিতি ২০১৩ : গণতন্ত্র, দল এবং রাজনীতি’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় কামাল বলেন, “শুধু নির্বাচন দিয়েই কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের জন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।”
সভায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, “৫ জানুযারি নির্বাচন না হলে দেশে ওয়ান ইলেভেনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারত। সরকারের দায়িত্ব হল এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষা করা, মহাজোট সরকার সেটাই করেছে।”
২০১৩ সালজুড়ে রাজনৈতিক সংঘাতের পর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হয়ে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের আপাত শান্ত পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট হলেও বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে।
এই পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক মনে করছেন কামাল হোসেন। “এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এই অস্বাভাবিক অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় যেতে হলে একটি পথ বের করতে হবে।”
এ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও একই কথা বলেন এবং তিনি সেইসঙ্গে সরকারকেই দায়ী করেন। “দলের ভেতর গণতন্ত্রের পাশাপাশি দেশে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারও থাকতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার অনুপস্থিত। গণতন্ত্রের জন্য স্পেস দরকার। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে সে স্পেস আজ পাওয়া যাচ্ছে না।”
অবস্থার পরিবর্তনে জাতীয় সংলাপের আহবান জানিয়ে কামাল হোসেন বলেন, “কেবল আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে সংলাপ হলে চলবে না। সংলাপ হতে হবে ছোট-বড় সব দলের মধ্যে। তবে সংবিধানের মূলনীতি মেনেই সংলাপে বসা উচিৎ।” বিএনপি নেতা আমীর খসরুও সংলাপের মধ্য দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
সংলাপে অনাপত্তি জানিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজাকার’ বলে তারেক রহমানের বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে পাল্টা বলেন, “কেউ এ পর্যায়ে নেমে গেলে সংলাপের পরিবেশ থাকে না। মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান মেনেই সংলাপ করতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী এবং স্বাধীনতার পক্ষের মধ্যে কোনো সংলাপ হতে পারে না।”
বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা কামাল হোসেন বলেন, “বহুদলীয় গণতন্ত্রে সব বিষয়ে সব দলের ঐক্য হবে না এটাই স্বাভাবিক, তবে সংবিধানের মৌলিকতার বিষয়ে সব দলের ঐক্য থাকতে হবে।”
অনুষ্ঠানে বক্তব্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন সংলাপের জন্য দুই প্রধান দলকেই ছাড় দেওয়ার আহবান জানান। আওয়ামী লীগকে সংলাপে আসার, বিএনপিকে জামায়াত ত্যাগ করার এবং জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধীদের ত্যাগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের এই অনুষ্ঠানে বিআইজিডি’র নির্বাহী পরিচালক সুলতান হাফিজ রহমান সভাপতিত্ব করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে ছিলেন।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে রাষ্ট্র, জনগণ, গণতন্ত্র, রাজনীতি, দল, ক্ষমতা, সংবিধান, বাক স্বাধীনতা, সহিংসতা, রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন, মনোনয়ন পদ্ধতি, প্রতিনিধিত্ব, প্রভাব, কমিটি কার্যক্রম, রাজনেতিক দলের নিয়ন্ত্রণ, সংসদীয় প্রতিনিধিত্বসহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি বিআইজিডির এ ধরনের সপ্তম প্রতিবেদন।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, “আমাদের রাজনীতির ভাষা অনেক বদলে গেছে। রাজনীতিবিদরা এখন জনগণের ভাষায় কথা বলেন না।”
জেআই





