পানির বিকল্প কিছুই নেই। প্রতি মুহূর্তে জীবন ধারণে পানির প্রয়োজন। খাওয়া, গোসল,রান্না,কাপড় ধোয়াসহ জনজীবনের নানা কাজে পানির ব্যবহার অবধারিত।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397534356.jpg[/img]
এজন্য বলা হয় পানির অপর নাম জীবন।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397534345.jpg[/img]
তাই যদি হয়-রাজধানীর মানুষ ‘জীবন সঙ্কটে’ আছে। পানি নিয়ে ভয়াবহ ভোগান্তি পোহাচ্ছেন রাজধানীবাসী। ওয়াসার পানি দূষিত ও দুর্গন্ধ এ অভিযোগ তো আছেই। সাথে আছে পানি সংকটের মতো হতাসার খবর।
[b]চাহিদা ও সরবরাহ: [/b]
ওয়াসা সূত্র জানায়,বর্তমানে রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে পানির চাহিদা ২১০ কোটি লিটার। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশ পানি আসে ভূগর্ভস্থ থেকে এবং বাকিটুকু আসে নদী থেকে। মোট চারটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও ৫৪৬টি গভীর নলকূপ দ্বারা এ পানি উত্তোলন করা হয়ে থাকে। সব গভীর নলকূপ বিদ্যুৎ সমস্যার সময়ে সার্বক্ষণিক চালু রাখতে মোট ২৩৪টি ফিক্সড জেনারেটর এবং ৬০টি মোবাইল জেনারেটর সচল রাখা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে যান্ত্রিক ক্রটির কারণে প্রায় ৫০টি জেনারেটর বন্ধ থাকে।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397534331.jpg[/img]
এছাড়া অনেক জেনারেটর পুরাতন হয়ে যাওয়ায় মাঝে মধ্যে কিছু জেনারেটর বিকল হয়ে যায়। বিদ্যুৎ সমস্যা কম থাকলে ওয়াসা চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিন ১৯০ থেকে ১৯৭ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করতে পারে।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397534325.jpg[/img]
এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ সিস্টেম লস বাদ দিলে নগরবাসী প্রতিদিন পানি পাচ্ছে ১৩০ কোটি লিটার । প্রতিদিন প্রায় ৭০/৮০ কোটি লিটার পানি ঘাটতি নিয়েই চলছে ঢাকা ওয়াসা।
[b]মারাত্মক দুর্গন্ধ:[/b]
রাজধানীতে ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। একে তো পানি সংকট তার উপর দুর্গন্ধময়। বিশুদ্ধ পানি যেন নগরবাসীর কাছে দুর্লভ বস্তুতে পরিণত হয়েছে। শতভাগ পরিশোধন না করেই মহানগরবাসীকে দূষিত পানি খাওয়াচ্ছে ঢাকা ওয়াসা। ফলে পেটের পীড়াসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397534335.jpg[/img]
জেনে শুনে অসহায়ের মত এই ‘বিষ'পান করতে বাধ্য হচ্ছে নগরবাসী। এই দূষিত পানি পান করে প্রতিনিয়তই তারা নানা রোগ-বালাইয়ের শিকার হচ্ছেন। গায়ে খোস-পাচরা সহ শরীরে সৃষ্টি হচ্ছে নানা রোগের।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397534339.jpg[/img]
বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বলছেন,মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে আমাশয়,ডায়রিয়া, জন্ডিস গণহারে ছড়াতে পারে। জানা গেছে,মহাখালীর উদরাময় হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন চিকিৎসালয়ে পানিবাহিত রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা আগের চেয়ে শতকরা ৩০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,ঢাকা ওয়াসার ময়লা ও ঘনকালো কুচকুচে দুর্গন্ধময় পানি পান করার কারণে এভাবে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার শুধু ছেলে মেয়ে নয় সব বয়সের লোকজনই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অবস্থা এমন যে পানি ফুটিয়েও পান করা যাচ্ছেনা। ওয়াসা বলছে,যথাযথভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397534346.jpg[/img]
প্রতিবছর শুষ্ক মওসুমে শীতলক্ষা ও বুড়িগঙ্গা নদীর পানি মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কারণে পানি শোধনে অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করতে হয়। ফলে পানির স্বাদ ও গন্ধে কিছুটা পরিবর্তন হয়। এ পানি ব্যবহারের ফলে স্বাস্থের কোন ক্ষতি হবে না। ওয়াসা বলছে,বুড়িগঙ্গা আর শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে দূষণের মাত্রা এতটাই বেশি যে তা উচ্চ মাত্রার কেমিক্যাল ব্যবহার করেও শতভাগ পরিশুদ্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে পানিতে দুর্গন্ধ থেকেই যাচ্ছে। তাই ওয়াসা কর্তৃপক্ষ নগরবাসীকে গন্ধ সহ্য করে ফুটিয়ে পানি পান করার অনুরোধ জানিয়েছে।
এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এম মুজিবুল হক বলেন,নদীর দূষিত পানি পরিশোধন করতে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে আমাশয়, ডায়রিয়া,জন্ডিস গণহারে ছড়াতে পারে। এছাড়াও দূষিত পানি দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে কিডনি,আলসার,রক্তচাপ,রিউমেটিক ফিবার,এ্যাজমা,যক্ষ্মা এমনকি বুড়িগঙ্গার পানিতে মাত্রাতিরিক্ত সীসার উপস্থিতির কারণে পানি ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ছে।
[b]পানি ঘাটতির কারণ :[/b]
ঢাকা মহানগরীতে অস্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধিও সাথে সংগতি রেখে প্রয়োজনীয় পানি উৎপাদন ও সরবরাহ অবকাঠামো নির্মিত সম্ভব না হওয়ায় পানি সরবরাহ ঘাটতির অন্যতম কারণ বলে জানায় ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397534351.jpg[/img]
পানি উৎপাদন ব্যবস্থা বহুলাংশে গভীর নলকুপ কেন্দ্রীক হওয়ায় পানি সরবরাহ কাঙ্ক্ষিখত মানে উন্নীত করা যাচ্ছেনা। এ ছাড়া পানির স্তরও প্রতিনিয়ত নিচে নেমে যাচ্ছে। নলকুপগুলো পানি উত্তোলন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। বহু পুরাতন পানির লাইন দিয়ে পানি সরবরাহ বাধা প্রাপ্ত হচ্ছে। জনাকীর্ণ পাইপের কারণে পানির অপচয় হচ্ছে স্বাভাবিকের অনেক বেশী।
সমস্যা কবলিত এলাকা:
জানা গেছে,রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় কমবেশী পানি সংকট চলছে। এর মধ্যে পুরোনো ঢাকার বেশীর ভাগ এলাকা,মোহাম্মদপুরের কিছু এলাকা, হাজারীবাগ,পল্টন,শান্তিবাগ,গুলবাগ,মিরপুরের প্রায় পুরো এলাকা,বাড্ডার কিছু এলাকা,সূত্রাপুর বাজার,যাত্রাবাড়ী,শনির আখড়া,শ্যামলী,কাফরুল,কল্যাণপুর অন্যতম। এ ছাড়াও কূটনৈতিক পাড়া খ্যাত গুলশান,বনানী ও বারিধারা এলাকায়ও পানি সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
হতাস রাজধানীবাসী:
মিলটন নামে এক বাসিন্দা বলেন, সকাল শুরু হয় অনেক সমস্যা নিয়ে। ঢাকার অধিবাসীদের এধরনের বহুবিধ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। মাঝে মাঝে ভাবি, এমন কি কোন সরকার আসবে না,যারা অতীতের সব রেশারেশি ভুলে এই দেশটাকে গড়বে। দেশের মানুষের জন্য ভাববে।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397534348.jpg[/img]
আতিক বলেছেন, উত্তরখানে ছিলাম কিছু দিন। ভয়াবহ অবস্থা,সকাল ৬ টার আগে গ্যাস চলে যায়,আসে রাত সাড়ে ১১ টায়। পুকুর পাড়ে সেলো পাম্প লাগানো,যেটা দিয়ে পাতালের পানি তুলে খাবারের কাজে ইউজ করতাম। গ্যাস না থাকায় ফুটানোর কোনো ব্যাবস্থা ছিলনা। পুকুর পারে হওয়াতে পানিতে বিশেষ গন্ধ পেতাম। যাক আল্লাহই হেফাজত করেছিল,এখোনো করছে। আল্লাহই আমাদেরকে হেফাজত করবেন।
নাহিয়ান বিন হোসেন বলেন, বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এই শহরে যেখানে আজ থেকে কম করে হলেও ত্রিশ বছর আগে থেকে পানি-বিদ্যুৎ এর মত মৌলিক চাহিদা গুলো নিয়ে ভেবে মাস্টার প্ল্যান করা অবশ্য কর্তব্য ছিলো,সেখানে এখন পর্যন্ত আমাদের এই বিষয়ে তেমন কোন ভাবনা নেই। পানির সমস্যা হলে পরিকল্পনাহীন ভাবে ইচ্ছেমত পাম্প বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে কি মারাত্বক বিপদ যে আমরা ডেকে আনছি,তা এখন কারো অজানা নয়।
লুৎফুল কাদের বলেন, ওয়াসার লাইনে মাঝে মধ্যে পানি আসলেও তা তীব্র দুর্গন্ধ। কালচে দুর্গন্ধযুক্ত পানি মুখে দেয়া যাচ্ছে না। ফুটানোর পর পানির পাত্রের তলায় কালো কাঁদার ন্যায় গাদ জমা হচ্ছে। বিশুদ্ধ না হওয়ায় পানি পান করা সম্ভব হচ্ছে না। ময়লাযুক্ত দুর্গন্ধময় পানি থালা-বাসন মাজা এমনকি কাপড়-চোপড় ধোয়ার কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন নগদ টাকায় পানি কিনতে হচ্ছে। এই দুরবস্থা আর কত কাল চলবে জানিনা।
[b]সুখবর দিতে পারছেনা ঢাকা ওয়াসা: [/b]
এ মুহূর্তে পানি নিয়ে রাজধানীবাসীর জন্য কোন সুখবর দিতে পারছেনা ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। তবে সংকট যাতে সহনীয় পর্যায়ে থাকে সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ সমস্যা কাঁধে নিয়েই চলতি শুষ্ক মওসুমের বাকি সময়টা পার করতে হবে ওয়াসাকে।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397534337.jpg[/img]
শুধু তাই নয়,শুষ্ক মৌসুমের এ ঘাটতি আগামী ২ বছর অব্যাহত থাকবে। তবে বিদ্যুতের আশা যাওয়ার খেলায় ঘাটতির পরিমাণ উঠানামা করবে। নতুন প্লান্ট বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের পাগলায় পদ্মা নদীর পানি ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও খিলক্ষেতে মেঘনা নদীর পানি ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন না করা পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর ব্যাপারে আর কোন সুখবর নেই।
[b]পানি সরবরাহের ইতিহাস: [/b]
ঢাকা মহানগরীর সূচনা হয় মোঘল আমলে। আর এই শহরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা শুরু হয় ১৮৭৪ সালে নবাব খাঁজা আব্দুল গনি নির্মিত চাঁদনীঘাট পানি বিশুদ্ধিকরণ প্ল্যান্টের মাধ্যমে। তবে তা ছিল খুবই সীমিত আকারে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সরকার জনস্বাস্থ প্রকৌশল অধিদপ্তর সৃষ্টি করে। ১৯৬৩ সালে পানি সরবরাহ ও পয়:নিষ্কাশনের জন্য ঢাকা ওয়াসাকে সৃষ্টি করা হয়। সে সময় পানির চাহিদা ছিল দৈনিক ১৫ কোটি লিটার। এখন তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২১০ কোটি লিটারে।
[b]পানির উৎস : [/b]
ওয়াসার সরবরাহ করা পানির মধ্যে ১০ শতাংশের উৎস শীতলক্ষ্যার পানি ব্যবহারকারী সায়েদাবাদ শোধনাগার,৩ শতাংশ আসে বুড়িগঙ্গাপারের চাঁদনীঘাট ও নারায়ণগঞ্জ পানি শোধনাগার থেকে,যাতে ব্যবহূত হয় বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার পানি। বাকি ৮৭ শতাংশ পানি আসে ভূগর্ভস্থ থেকে।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397534344.jpg[/img]
মোট চারটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও ৫৪৬টি গভীর নলকূপ দ্বারা এ পানি উত্তোলন করা হয়ে থাকে। সব গভীর নলকূপ বিদ্যুৎ সমস্যার সময়ে সার্বক্ষণিক চালু রাখতে মোট ২৩৪টি ফিক্সড জেনারেটর এবং ৬০টি মোবাইল জেনারেটর সচল রাখা হয়েছে।
[b]ওয়াসা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:[/b]
পানির তীব্র সংকটের কথা স্বীকার করে ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আমাদের ইচ্ছা আছে কিন্ত সাধ্য নেই। বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় আমরা স্বাভাবিক পানিও সরবরাহ করতে পারছি না। যেহেতু আমাদের পানির উৎস ভূগর্ভস্থ থেকেই বেশী তাই বিদ্যুৎ না থাকলে পানি উত্তোলন করা যায়না।

[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397534365.jpg[/img]
তিনি বলেন,সাড়ে ৫'শ গভীর নলকূপের বিপরীতে জেনারেটর আছে মাত্র আড়াইশত। এগুলোও অনেক সময় বিকল হয়ে পড়ে। তিনি বলেন,পানির চাহিদা মেটাতে নতুন জেনারেটর ক্রয়ের সিদ্ধান্ত হয়। এসব জেনারেটর চালু করা গেলে সমস্যা কিছুটা লাগব হবে।

[b]ঢাকা, ১৪ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেএ[/b]