রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার বগাচতর ইউনিয়নের দক্ষিণ মারিশ্যাচর এলাকার দরিদ্র কৃষক হোসেন মিয়া (৩৫)। স্ত্রী আর ছেলে-মেয়ে নিয়ে অভাবের সংসার ছিল তার। বিভিন্ন জনের ক্ষেত-খামারে দিনমজুরি করে যা পাওয়া যেত তাতে ঠিকমত সংসার চলতো না। এটা ছিল বছর তিনেক আগের কথা।

হোসেন মিয়া অন্যের দেখাদেখি ফড়িয়াদের মাধ্যমে চট্টগ্রাম আড়তদারের কাছ থেকে করল্লা চাষের জন্য আগাম ৫০ হাজার টাকা দাদন নেন। এই টাকা নিয়ে নিজের সাড়ে তিন বিঘা টিলা জমিতে করল্লা চাষ শুরু করেন। খরচ বাদ দিয়ে প্রথম বছর ৩০ হাজার টাকা লাভ করেন। এভাবে ঘুরতে থাকে হোসেন মিয়ার ভাগ্যের চাকা।

চলতি বর্ষা মৌসুমে তিনি একই জমিতে ১ হাজার ২শ’ থালা (বীজ লাগানো গর্ত) করল্লার আবাদ করেছেন। করল্লার পাশাপাশি তিনি শশা ও চিচিঙ্গাও লাগিয়েছেন।

হোসেন মিয়া জানান, চারা লাগানোর তিন মাস পর থেকে তিনি তিন জাতের সবজি করল্লা, শশা ও চিচিঙ্গা ফলন এক সাথে কাটতে পারছেন। সপ্তাহে একবার করে ফলন কাটা হয়। এভাবে আট থেকে দশ বার পর্যন্ত ফলন কাটা যায়। আঁড়তদারের লোকেরাই ক্ষেত থেকেই ২৫ থেকে ২৬ টাকা দরে এগুলো কিনে চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে যায়।

এবার করল্লা, শশা ও চিচিঙ্গা মিলে বিক্রি হয়েছে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। এতে খরচ বাদ দিয়ে ৬০ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। এখন আর তার সংসারে অভাব নেই। এই করল্লা চাষ করে পরিবারে সচ্ছলতা এনেছেন বলেও তিনি জানান।

পার্শ্ববর্তী নতুন পাড়া গ্রামের লোকমান মিয়াও একই পদ্ধতিতে করল্লার চাষ করে পরিবারের অভাব দূর করেছেন। এরকম পাঁচ শতাধিক চাষি একে অন্যের দেখাদেখি করল্লার আবাদ করে যাচ্ছেন। তাদের উৎপাদিত করল্লা, চিচিঙ্গা ও শশা সরাসরি চট্টগ্রাম আড়তদারের কাছে চলে যায়। অনেকে আবার স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে থাকেন।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে চলতি মৌসুমে ১২ হেক্টর জমিতে ২০ মেঃ টন করল্লা, ৩৫ হেক্টর জমিতে ১৮ মেঃ টন শশা ও ১০ হেক্টর জমিতে ১৯ মেঃ টন চিচিঙ্গা উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং এ লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে অর্জিত হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এমএম শাহ্ নেয়াজ জানান, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া উপযোগী থাকায় ও নিয়মিত বৃষ্টি হওয়ায় সবজির আবাদ ভালো হয়েছে।

তিনি বলেন, রাসায়নিক কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারকে নিরৎসাহিত করতে হবে। কারণ পরিবেশবান্ধব জৈব পদ্ধতিতে সবজি আবাদ করলে বিষমুক্ত খাদ্য পাওয়া যাবে এবং পরিবেশও রক্ষা পাবে। তাই, জৈব পদ্ধতিতে সবজি আবাদ করার জন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

দেখা গেছে, বগাচতর ইউনিয়নের রাঙ্গীপাড়া, বৈরাগীবাজার, মারিশ্যাচর, শিবেরআগা, ভাসাইন্যাদম ইউনিয়নের চাইল্যাতলী ও গুলশাখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সবচে বেশি করল্লা, চিচিঙ্গা, ও শশা জাতীয় সবজির আবাদ হয়েছে।

এসব এলাকার কৃষকরা জানান, এখানকার মাটি করল্লা, চিচিঙ্গা ও শশা জাতীয় সবজি আবাদের জন্য খুবই উপযোগী। সামান্য পরিশ্রমে একই সাথে তিনটি সবজির আবাদ করা যায় এবং তাতে ফলনও ভাল হয়। তাই তারা এই সবজি আবাদের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছেন।

গত মৌসুমে এসব সবজির আবাদ করে অনেকে লাভবান হয়েছেন। তাই তারা এবারও এই ধরনের সবজির আবাদ করছেন। চলতি মৌসুমে করল্লা, শশা ও চিচিঙ্গা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি করা হচ্ছে। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

ঢাকা, ১২ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ