কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহুমুখী লেনের টানেল নির্মাণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ঠিকাদার নিয়োগ ও জ্বালানি তেল আমদানিসহ মোট ১৫টি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

এছাড়াও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ৫০ হাজার টন গম আমদানির অপর একটি প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। এজন্য সরকারের মোট ব্যয় হবে এক লাখ সাত হাজার ৯২২ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

বুধবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে অনুমোদিত ক্রয় প্রস্তাবগুলোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোস্তাফিজুর রহমান।

কর্ণফূলী নদীর তলদেশে সড়ক টানেল নির্মাণে চীন সরকার মনোনিত প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কন্সট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (সিসিসিসি) ঠিকাদার নিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

এ টানেল নির্মাণের জন্য গত বছর ১০ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বেইজিংয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরপর বাংলাদেশ সেতু র্কতৃপক্ষ, সিসিসিসি ও অভি অরুপ অ্যান্ড পার্টনার্স হংকং লিমিটেড যৌথভাবে টানেলের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা করে। এরপর গত ৩০ জুন সেতু কর্তৃপক্ষ ও সিসিসিসির মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি হয়।

বৈঠক শেষে অতিরিক্ত সচিব বলেন, পাঁচ হাজার ৬শ’ ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এ টানেল নির্মাণ হবে। ভ্যাটসহ এতে খরচ হবে ছয় হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ নির্মাণ করে কর্ণফুলী নদীর দুই তীরকে যুক্ত করতে গত ২৪ নভেম্বর সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

টানেল নির্মাণকে সরকারের ‘স্বপ্নের প্রকল্প’ অভিহিত করে প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এর মধ্য দিয়ে সরকার চট্রগ্রামকে চীনের সাংহাইয়ের আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। ২০২০ সালের আগেই এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার কথা রয়েছে।

এ প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যার ৪ হাজার ৭৯৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার যোগান দেবে চীনের এক্সিম ব্যাংক। বাকি ৩ হাজার ৬৪৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সেতু কর্তৃপক্ষ।

এ টানেল একদিকে চট্টগ্রাম শহররে বন্দর এলাকা ও অন্যদিকে আনোয়ারা উপজেলাকে সংযুক্ত করবে। টানেল চালু হলে পর্যটন নগরী কক্সবাজারসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। কর্ণফুলীর দুই সেতুর ওপর যানবাহনের চাপ কমবে বলেও সরকার আশা করছে।

এদিকে বৈঠকে পাবনার রূপপুরে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ান ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠান এটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের সঙ্গে ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে কমিটি।

বৈঠক শেষে অতিরিক্ত সচিব মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে বা টাকার হিসাবে ( প্রতি ডলার ৮০ টাকা দরে) এক লাখ এক হাজার ২০০ কোটি টাকায় রাশিয়ান এ প্রতিষ্ঠানটি ১২শ মেগাওয়াট করে ২৪০০ মেগাওয়াটের দুটি পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করবে। প্ল্যান্টের মেয়াদকাল হবে ৫০ বছর।

গত আগস্ট মাসে পাবনার রূপপুরে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনায় কোম্পানি গঠন করতে সংসদে বিল পাস হয়। এ আইন অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকানা থাকবে বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশনের হাতে। আর কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব পাবে ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ’।

দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ার কারনে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ২০১০ সালে সংসদে প্রস্তাবও পাস করা হয়। গঠন করা হয় একটি জাতীয় কমিটি। ওই বছরই রাশিয়ার সঙ্গে একটি কাঠামো চুক্তি করে সরকার।

২০১৩ সালের অক্টোবরে পাবনার রূপপুরে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিত্তি স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুই ইউনিটে দুই হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট ২০২১ সালের মধ্যে চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আট দেশ থেকে ১১টি ক্রয় প্রস্তাবের বিপরীতে ১০ লাখ ৮৫ হাজার টন বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করবে। আর এজন্য সরকারের মোট ব্যয় হবে প্রায় চার হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে জ্বালানি তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ৩৬ দশমিক ৪৩ ডলার হলেও আগের সম্পাদিত চুক্তির কারনে বাজার দরের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি তেল আমদানি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতি ব্যারেলের দাম পড়বে ৬১ দশমিক ৩১ ডলার। বৈঠকে জ্বালানি তেলের প্রিমিয়ামও নির্ধারণ করা হয় বলে জানান অতিরিক্ত সচিব।

তিনি বলেন, জুলাই থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য জ্বালানি তেল আমদানির ১১টি ক্রয় প্রস্তাব অুনমোদন দেওয়া হয়েছে। চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে। তবে বেশির ভাগ জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে চীন, মালয়েশিয়া এবং ফিলিপাইন থেকে।

মোস্তাফিজুর রহমান আরো বলেন, খাদ্য মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ৫০ হাজার টন গম আমদানির করবে। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবও কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। দুবাই ভিত্তিক মেসার্স ফিনিক্স কমোডিটিজ নামের একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে। এ জন্য সরকারের ব্যয় হবে ৯৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

এসএইচ