আমবয়ানের মধ্য দিয়ে শুক্রবার শুরু হচ্ছে মুসলিম জাহানের বৃহত্তম তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। ইতোমধ্যে ইজতেমায় অংশ নিতে নৌকা, বাস, ট্রাক, ট্রেনসহ বিভিন্ন যানবাহনে টঙ্গীর তুরাগ তীরে সমবেত হচ্ছেন মুসল্লিরা।

গত বুধবার থেকেই ইজতেমার মাঠে আসতে শুরু করেছেন দেশ-বিদেশের মুসল্লিরা। জামাতবদ্ধ হয়ে দলে দলে ইজতেমা মাঠের নির্ধারিত স্থানে (খিত্তায়) প্রয়োজনীয় মালামাল ও ব্যাগ নিয়ে অবস্থান করছেন তারা।

তিন দিনব্যাপী ইজতেমার প্রথম পর্ব আগামী ১০ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে। দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে আগামী ১৫ জানুয়ারি। ১৭ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ৫০তম ইজতেমা।

দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মুসল্লি দূর-দূরান্ত থেকে চলে আসায় ইতোমধ্যে টঙ্গী স্টেশন রোড ও কামারপাড়াসহ বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের আশপাশের এলাকায় মাঝেমধ্যেই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে স্টেশন রোড থেকে কামারপাড়া সড়কে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত থেমে থেমেই যানজট লেগে থাকে। ইজতেমা ময়দানের উত্তর পাশের রাস্তাটি ব্যবহার করেই বিদেশি মুসল্লিসহ উত্তরাঞ্চলের মুসল্লিদের মূল ময়দানে প্রবেশ করতে হয়। আর এ পথে মালবাহী ট্রাক, লেগুনাসহ অন্যান্য যানবাহন চলাচল করায় যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের ছুটি বাতিল : বিশ্ব ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা দিতে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

গাজীপুরের সিভিল সার্জন মো. আলী হায়দার খান এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা দিতে সরকার এ নির্দেশ দিয়েছে। এ কারণে আগামী ৭ জানুয়ারি থেকে ইজতেমা চলা পর্যন্ত জেলার কর্মরত স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

এছাড়া ইজতেমা মাঠ সংলগ্ন মন্নু গেট, বাটা গেট, অ্যালাস হোন্ডা গেট এবং বিদেশি নিবাস এলাকায় চারটি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে মুসল্লিদের চিকিৎসা দেয়া হবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতে ১৫টি স্যানিটেশন টিম ইজতেমা মাঠের আশপাশের এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবে।

ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের সেবা শুরু : ইজতেমায় মুসল্লিদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা দিতে এবারও সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মন্নু নগরসহ ইজতেমা ময়দানের আশপাশের এলাকায় প্রায় অর্ধশত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের স্বাস্থ্য সেবা দেয়া শুরু করেছে এসব ক্যাম্পে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা। এতে হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ, ইবনে সিনাসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মুসল্লিদের বিনামূল্যে ওষুধ ও ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছে।

দুপুরে হামদর্দ ল্যাবরেটরিজের ফ্রি মেডিকেল কার্যক্রম উদ্বোধন করেন ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান।

নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা : বৃহস্পতিবার ইজতেমাস্থলের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে পুলিশ ব্রিফিং করেছে। এ সময় পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মইনুর রহমান চৌধুরী, গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. হারুন অর রশীদসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ জানান, প্রথম পর্বে ইজতেমা মাঠের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য পুলিশের পাঁচ হাজার সদস্য কাজ করবেন। এরই মধ্যে পুরো ময়দানে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। টঙ্গী ব্রিজ থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা, মন্নুগেট থেকে কামারপাড়া পর্যন্ত এবং তুরাগ নদীসহ পুরো এলাকাকে পাঁচটি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি সেক্টরে একজন করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের পদমর্যাদার অফিসারের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করবেন।

এছাড়া বিভিন্ন স্থানে থাকবে চেকপোস্ট, ওয়াচ টাওয়ার। ইজতেমার প্রতিটি প্রবেশ পথে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বিক নিরাপত্তা মনিটরিং করা হবে। এছাড়া বাইনোকুলার, মেটাল ডিটেক্টর, কন্ট্রোল রুমও স্থাপন করা হচ্ছে। খিত্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে পোশাকে ও সাদা পোশাকে নিরাপত্তা কর্মীরা নিয়োজিত থাকবেন বলেও জানান তিনি।

দুই ধাপে ৩২ জেলা : স্থান সঙ্কুলান না হওয়া ও মানুষের কষ্ট লাঘব করতে এবারও দুই পর্বে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে তাবলিগ জামাতের সকল সাথী এতে অংশ নিতে পারছেন না। প্রথমবারের মতো দেশের মোট ৩২টি জেলা নিয়ে এ বছর ইজতেমার দুই পর্ব শুরু হবে। বাকি ৩২ জেলা নিয়ে পরবর্তী ২০১৭ সালে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে।

শুক্রবার ফজরের নামাজের পর থেকে আমবয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে সভাপতিবিহীন বিশ্ব ইজতেমা। এতে অংশ নেবে ঢাকার একাংশসহ ১৬টি জেলার তাবলিগ অনুসারীরা।ইজতেমা মাঠের প্রস্তুতির কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা তাবলিগের মুরব্বি গিয়াস উদ্দিন জানান, ইজতেমার মাঠের সব কাজ করা হয় মাশওয়ারার (পরামর্শ) ভিত্তিতে। বিদ্যুৎ সংযোগ, পানির লাইন বসানো, প্যান্ডেল তৈরি, গ্যাস সরবরাহ প্রতিটি কাজই আলাদা আলাদা গ্রুপের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে। ইজতেমায় আগত বিদেশি মেহমানদের জন্য উত্তর-পশ্চিম পাশে বিশেষ কামরা তৈরির কাজও সম্পন্ন হয়েছে। বিদেশি মুসল্লিদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাদের জন্য নির্মিত আবাসস্থলের প্রবেশ পথে আর্চওয়ে বসানো হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ইজতেমার মাঠে স্থাপিত নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন তিন কোটি লিটারেরও বেশি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের সব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। অজু ও গোসলের হাউজ ওএবং টয়লেটসহ প্রয়োজনীয় স্থানে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া পাকা দালানে প্রায় ছয় হাজারের মতো টয়লেট রয়েছে। এর মধ্যে নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত অজু-গোসলখানা এবং টয়লেটগুলো সংস্কার করে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে। তুরাগ নদী পারাপারের জন্য সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের সদস্যরা আটটি স্থানে ভাসমান সেতু নির্মাণ করেছে।

উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সালে টঙ্গীর পাগাড় এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্ব ইজতেমা। আর তাবলিগ জামাতের উদ্যোগে ২০১১ সাল থেকে দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ১৬০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ইজতেমা মাঠে বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম দেশ থেকেই তাবলিগ জামাতের অনুসারীরা অংশ নেয়। তারা এখানে শীর্ষ আলেমদের বয়ান শোনেন এবং ইসলামের দাওয়াত বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেয়ার জন্য জামাতবদ্ধ হয়ে বেরিয়ে যান।

এমএইচ