পাহাড় ধসের ঘটনায় বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পার্বত্যাঞ্চলে। গতকাল পর্যন্ত ১৫০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। স্বজনহারা মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে বাতাস। আহত ও গৃহহীনরা মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি পার করছেন। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী রাঙ্গামাটিতে ১০৬ জন, চট্টগ্রামে ৩৫ জন, বান্দরবানে ৬ জন, কক্সবাজারে ২ জন এবং খাগড়াছড়িতে ১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। স্থানীয়রা দাবি করেছেন এখনো বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। মৃতের সংখ্যা দেড় শতাধিক হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
রাঙ্গামাটিতে নিহত বেড়ে ১০৬
সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে রাঙ্গামাটি জেলায় নিহতের সংখ্যা সর্বমোট ১০৬ জনে দাঁড়িয়েছে। রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান কন্ট্রোল রুমে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি জানান, মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
এর মধ্যে রাঙ্গামাটি শহরে ৪ সেনা সদস্যসহ ৫৪ জন, কাউখালী উপজেলায় ২৩ জন, কাপ্তাই উপজেলায় ১৮ জন, জুরাইছড়িতে ৩ জন ও বিলাইছড়িতে ২ জন মারা গেছে। এর মধ্যে শিশু ৩২ জন, মহিলা ৩০ জন ও পুরুষ ৩৮ জন। নিখোঁজ রয়েছে অন্তত ২০ জন। আহত হয়েছেন ৭৭ জন। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বেশ কয়েকজন চলে গেলেও ৩৪ জনের মতো রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
এদিকে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের জানান, রাঙ্গামাটির ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও সহায়তায় সরকার সব রকম সহযোগিতা করবে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে রাঙ্গামাটির দুর্গত মানুষের জন্য ৫০ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল, ৫ শ’ বান্ডিল টিন ও পরিবারপ্রতি ৩ হাজার করে টাকা প্রদানের ঘোষণা দেন।
পরে তারা রাঙ্গামাটি শহরের মানিকছড়ি, শিমুলতলী, ভেদভেদি এলাকায় পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে ৭২০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির মধ্যে রাঙ্গামাটি সদরে ৯০, কাউখালীতে ১৯০, নানিয়ারচরে ৩০, বরকলে ৭০, চিংমরং, ওয়াগগার রাইখালীতে ৩৪০।
অন্যদিকে, রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই সড়ক, রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ছিল। এছাড়া, অভ্যন্তরীণ রুট রাজারহাট-লিচুবাগান-কারিগরপাড়া পাহাড় ধসে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। গত ৩দিনের একটানা ভারিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় নিম্নাঞ্চলে জেলার বিলাইছড়ির ফারুয়া, জুরাছড়ি এবং বরকলের ভূষণছড়ার নিম্নাঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। জুরাছড়িতে ৩৩ শতাংশ জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শোকে স্তব্ধ চট্টগ্রাম: পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনায় শোকে স্তব্ধ চট্টগ্রাম। নিহতদের পরিবারে চলছে মাতম। গতকাল বুধবার পাওয়া গেছে আরো ৯ জনের লাশ। এ নিয়ে আগের দিনের ২৬ জনসহ মোট ৩৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হলো দুইদিনে। নিহতের মধ্যে নতুন করে রাঙ্গুনিয়া থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৭ জন ও রাউজানের ২ জনকে। আগের দিন মঙ্গলবার রাঙ্গুনিয়ায় ৪ পরিবারের ১৩ জনসহ মোট ১৯ জনের লাশ মাটিচাপা অবস্থায় পাওয়া যায়।
সর্বশেষ গতকাল বুধবার সকালে উদ্ধার করা হয় ৭ জনের লাশ। এই নিয়ে কেবল রাঙ্গুনিয়াতেই ২৬ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এই উপজেলায় এখনো পাহাড় ধসে আরো অন্তত ১০ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা ইসলামপুর ও রাজানগর এলাকা থেকে ২৬ জনকে মৃত অবস্থায় পেয়েছি। আরো অনেক খবর আসছে। কিন্তু লাশ শনাক্ত না করা পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, অনেকে নিখোঁজ আছে। তাদেরকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে পাহাড় ধসে অনেক শিশুও মারা গেছে। আমরা যারা বেঁচে আছি তাদেরকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি। অন্যদিকে রাঙ্গুনিয়া ছাড়াও রাউজানে দুইজনের লাশ উদ্ধার করার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন। তবে এখনো বাঁশখালী ও চন্দনাইশের দুর্গম পাহাড়ের পাদদেশে বসতিগড়া লোকজনের অনেকের খোঁজ মিলছে না বলে জানা গেছে।
টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, টেকনাফে পাহাড় ধসে পিতা ও শিশু কন্যার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বুধবার রাত ২টায় টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং মডেল ইউনিয়নের পশ্চিম সাতঘরিয়াপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পাহাড় ধসে নিহতরা হলেন- আমির হোসেনের পুত্র মো. সেলিম (৪২) এবং তার শিশুকন্যা কিশোমণি (৩)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো পরিবারের সকলে ঘুমিয়েছিলেন। রাত ২টার দিকে বিকট শব্দে পাহাড় ধসে বাড়ির উপর মাটি চাপা পড়ে। খবর পেয়ে প্রতিবেশী লোকজন এসে দ্রুত উদ্ধার কাজে নেমে পড়লেও ঘটনাস্থলে পাহাড়ের মাটি চাপা পড়ে মো. সেলিম ও তার শিশুকন্যা কিশোমণির মৃত্যু ঘটে। হোয়াইক্যং মডেল ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারী সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
বান্দরবানে আরো ২ লাশ: অবশেষে মাটি চাপা পড়া মা-মেয়ের লাশ উদ্ধার করেছে উদ্ধারকর্মীরা। বুধবার দুপুরে জেলা শহরের নিকটবর্তী কালাঘাটার লেমুঝিরি আগাপাড়ার ঘটনাস্থল থেকে মা-মেয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার রাতে বান্দরবানে পৃথক এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে নিহত হয়েছেন চারজন। মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ জনে। এর আগে পার্শ্ববর্তী আগাপাড়ায় একই পরিবারের ৩ ভাইবোনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার রাতের ঘটনার পর পরেরদিন সকালে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় জনগণ উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণ করে। বুধবার সকালে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি স্থানীয় প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিক ও সেনাবাহিনী উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়।
এদিকে, গত দুইদিন ধরে ভারি বৃষ্টিতে অফিস, দোকানপাটসহ ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে কয়েকশ’ ঘরবাড়ি নিমজ্জিত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানিতে পানিবন্দি হাজারো মানুষ। এরমধ্যে কয়েকশ’ লোক বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যার কবলে পড়ে জেলার হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। সড়কে পানি উঠায়, ব্রিজ ডুবে যাওয়ায় ও সড়কের উপর পাহাড় ধসে পড়ায় জেলা শহরের সঙ্গে রাঙ্গামাটি জেলার সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে অল্প পরিমাণ পরিবহন কেরানীরহাট সড়কের বাজালিয়া এলাকায় সড়কের উপর পানি ভেঙে চলাচল করছে।
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার দুর্গম বর্মাছড়িতে পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় ১ জন নিহত এবং আরো ৭ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৩ জনকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় হতাহতের খবর পেতেও বিলম্ব হচ্ছে।
ঊর্মাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হরিমোহন চাকমা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দুপুরে দুর্গম দাদঙ্গাছড়া এলাকায় পাহাড় ধসে পরিমল চাকমা (৩০) নামে একজন নিহত হন। এ সময় ৩টি গৃহপালিত গরু মারা যায়। এতে তার বাড়ি ও গোয়ালঘরটিও সম্পূর্র্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি জানান, দুপুরের দিকে মাটি চাপা পড়লেও মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় বিকালে। অপরদিকে মধ্যম বর্মাছড়ার জয়প্রুতিমাপাড়ায় পাহাড় ধসে পড়ে ৭ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় গৃহিণী রজমালা চাকমা (২৫)কে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেলে প্রেরণ করা হয়েছে।
তার শিশুসন্তান পার্কি চাকমা (৯), তুশি চাকমা (৬)কে লক্ষ্মীছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আহত বাকি চারজন হলেন, ধনঞ্জয় চাকমা (৬৫), তিতুর বালা চাকমা (৫৭), সাবিত্রি চাকমা (৪৫) ও এটিন চাকমা (২২)। অতি দুর্গমতার কারণে তাদেরকে লক্ষ্মীছড়ি সদরে আনা সম্ভব হয়নি।
লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সুপার জ্যোতি চাকমা জানান, পাহাড় ধসের ঘটনা মঙ্গলবার দুপুরের হলেও দুর্গমতার কারণে তাদেরকে উদ্ধার করে আনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে, আহতদের চিকিৎসায় লক্ষ্মীছড়ি হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের নেতৃত্বে একটি মেডিকেল টিম দুর্গম বর্মাছড়িতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, লক্ষ্মীছড়ির বিভিন্ন এলাকায় আরো কয়েকটি পাহাড় ধস ও মৎস্য বাঁধ ভেঙে পড়াসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। খোঁজ-খবর নিয়ে তালিকা করার পরই বিস্তারিত জানা যাবে। লক্ষ্মীছড়ি থানার ওসি আরিফ ইকবাল পাহাড় ধসে একজন মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করলেও আহতদের ব্যাপারে কিছু জানাতে পারেননি।
এমবি





