প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তিনদিনের দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারত যাওয়া হঠাৎ স্থগিত হওয়া নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। নতুন সফরসূচি নিয়েও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। কেন এই সফর স্থগিত করা হলো তা নিয়ে সুস্পষ্ট করে কিছু বলছে না কোনোপক্ষই। তবে, একাধিক কুটনৈতিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী চীনের সাথে বিপুল অর্থের একের পর এক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং তিস্তার অভিন্ন পানি বন্টন ইস্যুতে ভারতের সাথে চুক্তির বিষয়টি এখনো ঝুলে থাকার পটভূমিতেই প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর স্থগিত হলো।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে আগামী ১৮ ডিসেম্বর তিনদিনের দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লি যাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। গত বছরের [২০১৫] জুনে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তখন তিনি শেখ হাসিনাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিজয়ের মাসের নানা কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সূচিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এজন্য ভারত সফরের প্রস্ততির জন্য বাড়তি সময় দরকার। তাই সফরটি পিছিয়ে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে আয়োজন করার জন্য ভারতকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

তবে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বরাত দিয়ে ঢাকায় একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, আগামী ২৬ জানুয়ারি ভারতের জাতীয় দিবসের র‌্যালিতে প্রধান অতিথি হিসেবে শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে।

একাধিক কূটনৈতিক সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবরে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং-এর দুই দিনের বাংলাদেশ সফরে বাংলাদেশের অবকাঠামো, রেলওয়ে ও বিদ্যুতখাতসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সেক্টরে ২৪ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের ২৬টি নানা ধরনের চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি উষ্ণ সম্পর্কে কিছুটা ভাটা পড়ে।

গত ১৪ নবেম্বর বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বহরে ২০ কোটি ৩৩ লাখ ডলার বা প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার চীনের তৈরি দুটি সাবমেরিন আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর হয় যা টর্পেডো ও মাইন দ্বারা সুসজ্জিত এবং শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোজাহাজে আক্রমণ করতে সক্ষম। এ ঘটনায় নতুন করে টনক নড়ে দিল্লির।

সবশেষ বৃহস্পতিবার [৮ ডিসেম্বর] আমদানিকৃত তেল সহজে ও কম খরচে পরিবহণের জন্য সাগরের নিচ দিয়ে ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন ও সাগরে তেলবাহী জাহাজ নোঙ্গরের মুরিং বা ঘাট নির্মাণের জন্য চীনের পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ব্যুরো-সিপিপিবি’র সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫,৪২৬ কোটি টাকা যার সিংহভাগ অর্থাৎ ৪,২৯৩ কোটি টাকার যোগান দিবে চীন। আগামী ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের কার্যক্রম চালু করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একইদিনে, বাংলাদেশের পায়রা বন্দরের মূল অবকাঠামো নির্মাণ, তীর রক্ষাবাঁধ, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের স্থাপনা নির্মাণে চীনের দুই কোম্পানির সঙ্গে তিনটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর (এমওইউ) করেছে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চীনের কাছ থেকে যখন বাংলাদেশ বিপুল অর্থের একের পর এক সহযোগিতা পাচ্ছে তখনও প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে একচেটিয়া সুবিধাই পেতে চাচ্ছে। এ নিয়ে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপা অসন্তোষ তৈরি হয়।

গত বুধবার [৭ ডিসেম্বর] ভারত-বাংলাদেশ নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে একটানা চাপের মুখে ট্রানজিট পণ্য পরিবহণে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিতে দেশটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মত হয় বাংলাদেশ। এই চুক্তিতেও ভারত একতরফা সুবিধা পেতে চাপ প্রয়োগ করে।

ভারতের চুক্তির খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রশাসনিক ফি ছাড়া আর কোন শুল্ক বা কর আরোপ করতে পারবে না। দুই বন্দরে পণ্য পরিবহণের জন্য অতিরিক্ত কোনো ফি ছাড়াই বিশেষ বা ডেডিকেটেড স্থান বরাদ্দ দিতে হবে ভারতকে, যেটি আর কোনো দেশ ব্যবহার করতে পারবে না।

এছাড়াও ভারতীয় প্রস্তাবে সে দেশের পণ্যবাহী জাহাজকে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রথম অগ্রাধিকার দিয়ে প্রবেশের ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে। তবে, ভারতের এই একতরফা প্রস্তাবের ব্যাপারে বাংলাদেশ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র বিরোধিতা রয়েছে বলে জানা গেছে।

এমনই এক পটভূমিতে হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর স্থগিতের ঘোষণা এলো। তবে ঘোষণা বিলম্বিত করার ঘোষণাটি বাংলাদেশ নাকি নয়াদিল্লি থেকে এসেছে বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে বলা হয়, ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান নিয়ে দেশেই প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ততা আছে। এর পরদিন আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিজয় দিবসের আলোচনা সভায় উপস্থিতির কারণে প্রধানমন্ত্রীকে ওই দিনও দেশে থাকতে হবে। ফলে ১৮ ডিসেম্বর সফর শুরু হলেও ১৯ ডিসেম্বর একাত্তরে আত্মোৎসর্গকৃত ভারতীয় সেনাসদস্যদের পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে দিল্লির বাইরে পূর্বনির্ধারিত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার কথা থাকায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিত থাকা নিয়ে সংশয় ছিল। তাই তাকে ছাড়া এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজন ঠিক হবে না। এটি বিবেচনায় নিয়ে সফরটি পিছিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। তা ছাড়া এই সফরের পরপরই চীন সফর নিয়ে মোদির ব্যস্ততা রয়েছে। এই আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বাইরে যে আরো কিছু আছে সেটি অবশ্য অস্পষ্ট থাকেনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে আরো জানা যায়, ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের সূচিতে পরিবর্তন আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে শেখ হাসিনার সফর পেছানোর বিষয়টি হাইকমিশনারের পক্ষ থেকেই এসেছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, শুধু সময়সূচির জটিলতার কারণে সফরটি পেছানো হয়নি; বরং দুই প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীদের বৈঠকটি ফলপ্রসূ করতে যথাযথ প্রস্তুতির অভাব রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রাপ্তির খাতা অনেকটাই শূন্য। ভারতের নেতৃত্বের ধারাবাহিক আশ্বাসের পরও তিস্তা চুক্তি নিয়ে শুধু ভরসায় থেকেছে বাংলাদেশ। কিন্তু শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে অভিন্ন নদীটির পানি বণ্টন চুক্তি সইয়ের কোনো আভাস মিলছে না। অপরদিকে, ভারতের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন একটি রূপরেখা সইয়ের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া পায়রা বন্দরসহ একাধিক বড় প্রকল্পে অর্থায়ন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উপাদান যুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হলেও এর মধ্যে চীন ঢুকে পড়ায় বিষয়টি একটু অন্যরকম হয়ে গেছে। এসব স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে দিল্লির চেয়ে এখন বেইজিংয়ের দিকেই ঢাকার নজর বেশি বলেও কূটনৈতিক সূত্র জানায়।

চীনের কাছ থেকে দুটি সাবমেরিন কেনার চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর পরই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতির বিষয়ে আলোচনার জন্য গত ৩০ নবেম্বর ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পার্রিকর দুই দিনের সফরে ঢাকায় আসেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় এ দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সামর্থ্য বাড়াতে নতুন নতুন উদ্যোগ নেয়ার প্রস্তাব দেন পারিকর। এ নিয়েও চিন্তা-ভাবনার জন্য বাংলাদেশের কিছুটা সময় দরকার।

সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিস্তা চুক্তিতে কোনো অগ্রগতি না থাকলেও এটিকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। তাই দিল্লির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের বোঝাপড়ার বিষয়টিকে বাংলাদেশ সে দেশের নিজস্ব বিষয় মনে করে। ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্যও দ্রুত চুক্তিটি সই করা উচিত বলে মনে করে বাংলাদেশ।

তিস্তার পানি বন্টনে চুক্তি করার বিষয়টি এত দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে অথচ সমুদ্র বন্দর ব্যবহার ও নামমাত্র শুল্ক দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা আদায়সহ ভারত তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব সুবিধাই একচেটিয়া আদায় করছে- এটা কিছুতেই মানতে পারছে না বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরকে আরো ফলপ্রসূ করতেই এই সফর পেছাতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে।

এই সফরে প্রতিরক্ষা, বড় প্রকল্পে অর্থায়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ছাড়াও মহাকাশ, স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন খাতে অন্তত ৩০টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এছাড়া সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, সড়কসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে সৃজনশীল পন্থায় ভারতের অর্থায়নের ব্যাপারে প্রস্তুতি রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে।

এদিকে শুক্রবার ঢাকায় আসছেন ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এমজে আকবর। অভিবাসন সংক্রান্ত ‘গ্লোবাল ফোরাম ফর মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (জিএফএমডি) সম্মেলনে যোগদানের লক্ষ্যে তিনি ঢাকায় এলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেও সফরসূচি নিয়ে কথা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সুত্র: southasianmonitor

এমই