জুয়েল শীলচট্টগ্রাম ও ফেনীতে ভূমিকম্পে ১০টি ভবন হেলে পড়েছে। এর মধ্যে ৯টি ভবনই চট্টগ্রাম নগরের। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল মিয়ানমার থেকে খুব কাছাকাছি হওয়ায় চট্টগ্রামে ঝাঁকুনির মাত্রাও ছিল তীব্র। ভূমিকম্পের সময় বিভিন্ন বহুতল ভবন, বিপণিকেন্দ্র ও কারখানা থেকে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২১ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার রাত ৭টা ৫৫ মিনিটে প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে নগরের চান্দগাঁও, হালিশহর আবাসিক এলাকা, লাভলেইন, জুবিলী রোড, সাগরিকা, রহমতগঞ্জ, জিইসি, মোমিন রোড ও ঝাউতলা এলাকায় মোট নয়টি ভবন হেলে পড়ে।

ভূকম্পনের সময় নগরের বিভিন্ন স্থানে বাংলা বর্ষবিদায়ের অনুষ্ঠান চলছিল। হঠাৎ ভূকম্পন শুরু হলে ডিসি হিল এবং শিল্পকলা একাডেমিতে বর্ষবিদায়ের অনুষ্ঠানে দর্শক এবং শিল্পীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন ভয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন।

শিল্পকলা একাডেমির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সাইফুল আলম বলেন, ভূমিকম্পের সময় অনেক দর্শক বের হয়ে রাস্তায় চলে যান। চারদিকে হইচই পড়ে যায়।

নগরের মিমি সুপার মার্কেট, আফমি প্লাজা, কল্লোল সুপার মার্কেট, নিউমার্কেট, সানমার ওশানসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে গতকাল সন্ধ্যায় কেনাকাটা করতে আসা লোকজন ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কে ছোটাছুটি করতে থাকেন। তাঁরা ভবন থেকে বেরিয়ে এসব বিপণিবিতানের সামনের সড়কে অবস্থান নেন। এ সময় বিভিন্ন সড়কে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি আবাসিক হলের দুজন ছাত্র ভয়ে হল থেকে নিচে লাফ দিয়ে আহত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. আলী আজগর চৌধুরী প্রথম আলোকে জানান, শাহজালাল হলের তিনতলা থেকে ভয়ে লাফ দেন অ্যাকাউন্টিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রায়হান। এ ছাড়া শহীদ আবদুর রব হলের দোতলা থেকে লাফ দেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুম। মাসুমকে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। রায়হানকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বি ব্লকের ৮ নম্বর সড়কের একটি ছয়তলা ভবন ভূমিকম্পে প্রায় এক ফুট হেলে গেছে। ভবন থেকে লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আবু মো. শাহজাহান কবির প্রথম আলোকে বলেন, ভবনটিতে ১০টি পরিবার বসবাস করে। ভূমিকম্পে বাড়িটি প্রায় এক ফুট পশ্চিম দিকে কাত হয়ে গেছে।

ভবন হেলে পড়ার খবর পেয়ে সিডিএর চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম গতকাল রাতে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় ছুটে যান। তিনি ভবনের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার জন্য মাইকে ঘোষণা দেন। সিডিএ আবাসিক এলাকার বি ব্লকে আরেকটি পাঁচতলা ভবন সামান্য হেলে গেছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

নগরের আমতল এলাকায় সিদ্দিক শপিং কমপ্লেক্সের সাততলা ভবনের ছাদ পাশের বি এম মুক্তিযোদ্ধা সুপার মার্কেটের আটতলা ভবনের ছাদের সঙ্গে লেগে গেছে। এর অদূরে জুবিলী রোডে একটি পাঁচতলা ভবনও হেলে পড়েছে।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জসীম উদ্দিন প্রথম আলোকে জানান, জুবিলী রোডের দুটি ভবন আগে থেকে কিছুটা হেলে ছিল বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) সিডিএ প্রকৌশলীদের ডেকে হেলে পড়া ভবনগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হবে।

রহমতগঞ্জ এলাকায় বিবেকানন্দ নামের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল হেলে গেছে। চারতলা এই ভবনের ছাদের সঙ্গে পাশের ভবনের ছাদের দূরত্ব কমে গেছে। নগরের মোমিন রোডের ঝাউতলা এলাকায় পাঁচতলা একটি আবাসিক ভবনও হেলে পড়েছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটি পাশের আরেকটি ভবনের সঙ্গে লেগে গেছে।

জিইসি মোড়ে পাঁচতলা একটি বাণিজ্যিক ভবনের ছাদ পাশের ছয়তলা ভবনের সঙ্গে লেগে গেছে।

আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক এম এ মালেক বলেন, হালিশহর বি ব্লক আবাসিক এলাকায় পাঁচতলা ভবন এবং সাগরিকা শিল্প এলাকায় পাঁচতলা একটি পোশাক তৈরির কারখানার ভবনও হেলে গেছে। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা কাজ করছেন।

ভূমিকম্পের সময় হুড়োহুড়ি করে বের হতে গিয়ে ইপিজেড এলাকার বিভিন্ন কারখানার কমপক্ষে ৩০ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইপিজেড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল কালাম। আহত শ্রমিকদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বায়েজিদ এলাকার আরেকটি পোশাক তৈরির কারখানা থেকে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে অন্তত ৮ জন আহত হয়েছেন। তাঁরাসহ মোট ২১ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ভূমিকম্পের সময় নগরের আফমি প্লাজার চারতলার একটি দোকানে পণ্য দেখছিলেন শামসুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমি চারতলায় একটি দোকান থেকে জিনিস কিনছিলাম। হঠাৎ দেখি কাঁপছি। পরে হুড়মুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসি।’

কাজীর দেউড়ির বাসিন্দা মো. কায়সার বলেন, ‘এবারের কম্পনটি খুব বেশি ছিল। আমি আমার ছেলেকে নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসি।’

ফেনী: ভূমিকম্পে পৌরসভার সুলতানপুর এলাকায় একটি চারতলা ভবন অপর একটি পাঁচতলা ভবনের ওপর হেলে পড়েছে। ফেনীর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী, ফায়ার সার্ভিস, ফেনী থানা-পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল আজিজ বলেন, ভবনে থাকা আটটি পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এমই