সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত সুইস ব্যাংকের এক হিসাব নম্বরেই (অ্যাকাউন্ট) ৯৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আছে প্রিন্স মুসা খ্যাত মুসা বিন শমসেরের। সেই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান পদার্থ প্লাটিনাম, হীরা ও স্বর্ণের মালিকও তিনি।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে জমাকৃত সম্পদ বিবরণীতে মুসা বিন শমসের এসব সম্পদের কথা উল্লেখ করেছেন। গত রোববার দুপুরে তার আইনজীবীর মাধ্যমে দুদক সচিব বরাবর এ সম্পদের হিসাব জামা দেয়া হয়।
দুদক সূত্রে জানায়, দুই দফায় সময় নেয়ার পর গত ৭ জুন রোববার মুসা বিন শমসেরের যাবতীয় সম্পদের হিসাব জমা দেন তার আইনজীবী নূর হোসেন। সেখানে তিনি সুইজারল্যান্ডের সুইস ব্যাংকে ১২ বিলিয়ন ডলারের কথা উল্লেখ করেন। যার পরিমান বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৭৮ টাকা হিসাবে)। যৌথ অ্যাকাউন্টধারীদের মাঝে তারই নিজস্ব অ্যাকাউন্টে এ টাকা আছে বলে উল্লেখ আছে। তবে যৌথ অ্যাকাউন্টধারীদের সঙ্গে ‘ডিড অব অ্যাগ্রিমেন্ট’ থাকার কারণে ওই অ্যাকাউন্টে অন্যদের কি পরিমাণ অর্থ রয়েছে এবং ওই অ্যাকাউন্টের অংশীদার কতোজন সে বিষয়ে উল্লেখ নেই।
সম্পদ বিবরণীতে আছে, সুইস ব্যাংকের আরেক অ্যাকাউন্টে জমা রাখা আছে ৯০ মিলিয়ন ডলারের (৭১১ কোটি টাকা) সমপরিমান প্লাটিনাম, হীরা ও স্বর্ণালঙ্কার। এছাড়া উল্লেখ কার আছে, রাজধানীর গুলশানের ৮৪ নম্বর রোডে ‘দি প্যালেস’ নামের ১৫ নম্বর বাড়িটি বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে ২০ কোটি টাকা নিয়েছেন। ওই বাড়িটি মুসার নামে ছিল। পরে তিনি তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা চৌধুরীকে বাড়িটি দান করেছেন। এছাড়া গাজীপুর ও সাভারে তার নামে ১ হাজার ২০০ বিঘা জমি রয়েছে। তার কাছে ওইসব জমির দলিল থাকলেও জমিগুলো দখলে নেই। জমিগুলোর দখল ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আর এসব অর্থ উপার্জনের উৎস হিসেবে অস্ত্র ও ক্রুড অয়েলের (তেলের কাঁচামাল) ব্যবসাকে দেখানো হয়েছে। এছাড়া প্লাটিনামসহ অন্যান্য অলঙ্কার তিনি বিভিন্ন সময়ে ক্রয় করেছেন এবং উপহার হিসেবে পেয়েছেন বলেই উল্লেখ আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান বলেন, ‘মুসা বিন শমসের তার সম্পদ বিবরণী জমা দিয়েছেন। আমরা এগুলো যাচাই-বাছই করছি। তাই অনুসন্ধানের স্বার্থে তার জমাকৃত সম্পদের পরিমান নিয়ে এখন কিছু বলা যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘অনসন্ধানে যদি তার উল্লেখিত সম্পদ অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয় বা কোনো মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকেন তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হতে পারে।’
দুদক কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, ‘মুসা বিন শমসের ইতিমধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেছেন। তার উল্লেখকৃত সম্পদগুলো বৈধ কি না তা যাচাই-বাছাই চলছে। এর মধ্যে তার সম্পদগুলো জ্ঞাত আয়বহির্ভূত কি না, সেসব সম্পদের ট্যাক্স দেয়া হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘অনুসন্ধানে অবৈধ সম্পদ অথবা গোপনকৃত সম্পদ পাওয়া গেলে, কিংবা তার দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী মিথ্যা হলে মামলা দায়ের করা হবে। আবার অনুসন্ধানে তার নামে অবৈধ সম্পদ না পাওয়া গেলে তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে।’ এই সম্পদ বিবরণীতে তার সুইস ব্যাংকে থাকা অর্থের কথা বলা আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মুসা পরিচিতি:
১৯৫০ সালের ১৫ অক্টোবর ফরিদপুরের এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বর্তমানে প্রিন্স খ্যাত মুসা। চার ভাই এবং দুই বোনের মাঝে তিনি বাবা-মায়ের তৃতীয় সন্তান। তার বাবা শমসের আলী মোল্লা সেসময় স্থানীয় ব্রিটিশ সরকারের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা ছিলেন।
মুসা তরুণ বয়সেই ব্যবসা শুরু করেন। পরে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ড্যাটকোর ব্যানারে জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসার মাধ্যমে তার উত্থান। তাকে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির জনক হিসেবেও মনে করা হয় থাকে। তিনি ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে আন্তর্জাতিকভাবে অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবেও ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন।
তবে ১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে অনুদান দিতে চেয়ে সমালোচনার মুখে ও সারা বিশ্বের মিডিয়ার চোখে পড়েন ড. মুসা। লেবার পার্টির টনি ব্লেয়ার নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর জন্য তার পাঁচ মিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রত্যাখ্যানও করেছিলেন। তিনিই এ উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তি, যিনি এক বিলিয়ন পাউন্ড উপার্জন করেছেন ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র বেচাকেনার ব্যবসা করে।
এছাড়া ২০১১ সালে প্রকাশিত ফোর্বস ম্যাগাজিনে বলা হয়, মুসা বিন শমসেরই বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। যার সম্পত্তির মূল্য ১২ বিলিয়ন ইউএস ডলারের উপরে।
জেআই





