পানি বাহিত রোগগুলো অনেক মারাত্মক হয়ে থাকে। প্রতি বছরেই আমাদের দেশে সহস্রাধিক শিশু ও নারী মারা যায় এ রোগের কারণে। নিচের রোগগুলি প্রধানত পানির মাধ্যমে ছড়ায় অথবা দুষিত পানির কারনে হয়ে থাকে। তাই এ পানি বাহিত রোগ থেকে কিভাবে বেঁচে থাকা যায় তার জন্যই এ আয়োজন।
[b]আর্সেনিক দুষন[/b] - পানিতে মিশে থাকা অতিমাত্রায় আর্সেনিকের কারনে এই রোগ দেখা দেয়। ত্বকের, হৃদপিন্ডের, লিভার এবং কিডনীর সমস্যা এই আর্সেনিক দুষন বা আর্সেনিকোসিস থেকে হতে পারে।আর্সেনিক হলো একটি খুবই দূষিত পদার্থ। বিভিন্ন প্রকারের আর্সেনিকের মধ্যে As(III) হলো সবচেয়ে বেশী ক্ষতিকারী পদার্থ। আর্সেনিক 'পানীয় জল ও খাদ্য শৃঙ্খল'-কে দুষিত করে দেয়, কারণ আর্সেনিক মাটি, পলি, শিলা, পাথর এমনকি কারখানার বর্জ পদার্থ ও কীটনাশকের সঙ্গে থাকে। বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলার অর্ধেকের মত জায়গা জুড়ে যে সমস্ত কুয়ো (well water) গুলি আছে সেগুলো সবই আর্সেনিক দুষিত। বাংলাদেশের সরকার ০.০৫ মিলিগ্রাম আর্সেনিক প্রতি লিটার পানীয় জল কে নিরাপদ ঘোষণা করেছেন। মানব দেহে আর্সেনিকের ক্ষতিকারী কুফল ২-২০ বছর লাগে রক্ষিত হতে।
[b]কৃমি [/b]- কৃমির আক্রমন একটি প্রধান পানি বাহিত রোগ।কৃমি হলো এক ধরণের পরজীবি যা অন্ত্রে বাস করে। কিছু কৃমি ডিম্বাণু হিসেবে মানুষের মুখের মাধ্যমে প্রবেশ করে। আবার কিছু লাভা হিসেবে ত্বকের মাধ্যমে প্রবেশ করে। কৃমি অনেক সময় মানুষের যকৃত এবং অন্য অঙ্গতেও আক্রমণ করতে পারে।
কৃমির জীবাণু কিভাবে ছড়ায়-
দূষিত খাবার এবং পানি গ্রহণের ফলে, কৃমিতে আক্রান্ত ব্যক্তির মলের মাধ্যমে,মাটি থেকে শরীরের চামড়ার মাধ্যমে।
[b]কি ধরণের চিকিৎসা আছে-[/b]
প্রতি ছয়মাসে বা বছরে শিশুদের কৃমি নাশক ঔষধ খাওয়াতে হবে।শিশুকে খাওয়ানেরা পাশাপাশি বাড়ীর সবাইকে কৃমি নাশক ঔষধ খাওয়াতে হবে।ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবনের পাশাপাশি ডাক্তারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতে হবে।
কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়-
খাবার ও পানি সবসময় নিরাপদ ও পরিষ্কার হতে হবে।খাবার খাওয়া ও তৈরি করার আগে, খাবার পরিবেশনের সময়, খেলাধূলা করার পর এবং পায়খানা ব্যবহারের পর হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করে ধুতে হবে।রান্নার সময় ভালোভাবে শাক সবজি, মাছ, মাংস ধুয়ে রান্না করতে হবে।রান্না করা খাবার ভালোমত ঢেকে রাখতে হবে।পায়খানা (Toilet) সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে।হাতের নখ সব সময় ছোট এবং পরিষ্কার রাখতে হবে।বাইরে বের হওয়ার সময় জুতা বা স্যান্ডেল পড়তে হবে।
[b]কলেরা[/b] - এটি একটি পানি বাহিত মারাত্মক রোগ। এটি জীবানুর কারনে হয়। যথা সময়ে সঠিক চিসিৎসা না হলে এই রোগে প্রায় মড়ক লেগে যায়। সংক্রামক এই রোগটি হলে বমি ও পায়খানা একসঙ্গে শুরু হয়ে যায়। সাধারণত: মাছির মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। বমি ও পায়খানার সঙ্গে পিণ্ডলিতে আড়ষ্ট ভাব, পিপাসা, মূত্রাবরোধ শরীরে লবণের অভাব ইত্যাদি লক্ষণও দেখা যায়। প্রথম দিকে হলুদ হলুদ পাতলা দাস্ত হয় তারপরই ভাতের মাড়ের মতো পাতলা অনবরত দাস্ত হতে থাকে। বমির সময় প্রথমে পাকাশয়ে জমে থাকা খাবার বেরোতে শুরু করে তারপরে পাতলা জলের মতো তরল বেরোতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা না হলে রোগীর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে।
[b]কারণ: [/b]সাধারণত: যাঁরা পেট ভর্তি পরিমাণের বেশি খান, তাঁরাই এই রোগের শিকার হয়ে পড়েন। এছাড়া নোংরা জল পান, পচা-গলা বাসি খাওয়া, পচা মাছ সেবন, গুরুপাক তৈলাক্ত আহার অত্যধিক সেবন করলে কলেরা হওয়ার সম্ভাবনা থাক্ তবে আহারজনিত কলেরা জীবাণু দ্বারা সংক্রামিত কলেরার ক্ষেত্রে প্রায় গ্রামের পর গ্রাম মড়ক লেগে যায়। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব এই রোগের প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হয়। এছাড়া শুষ্ক কলেরাও হয়। এতে লক্ষণগুলো সবই হয় কলেরার মতো, কিন্তু বমি বা দাস্ত হয় না। এটাও কম বিপজ্জনক নয়।
[b]লক্ষণ: [/b]কলেরা রোগের শুরুতে রোগীর হাত-পায়ের আঙুলে ভীষণ ব্যথা হয়, আড়ষ্ট ভাব লক্ষ্য করা যায়, আর তার পরেই পিণ্ডলি, জঙ্ঘা, অন্ত্র এবং মাংসপেশীতে অস্বস্তি হতে শুরু করে। হাত-পায়ের আঙুল নীল হয়ে যায়। ত্বক বা চামড়া জড়-জড় হয়ে যেতে থাকে, প্রস্রাব কম হতে থাকে, গাঢ় হলুদ প্রস্রাব হয, পাকস্থলীতে জ্বালা করে, ব্যথা হয়, টিপলে কষ্ট হয়, জিভ সাদা হয়ে যায়। মুখের স্বাদ তেতো তেতো লাগে, অত্যধিক তৃষ্ণা পায়। অথচ জল খেলেই বমি ও দাস্ত হয়ে যায়। রোগের বাড়াবাড়ি অবস্থায় জলের মতো বা ভাতের মাড়ের মতো দাস্ত হয়, তবে তখন আর ব্যথা থাকে না, সেই সঙ্গে বমিও হয়। এসময়ে রোগীকে অজ্ঞান হয়ে পড়তেও দেখা যায়।
[b]প্রতিকার[/b]
১। ৫ গ্রাম হিং, ১০ গ্রাম কর্পূর, ১০ গ্রাম খয়ের এবং নিমের ১০ টি নরম বা কোমল (অর্থাৎ কচি) পাতা নিয়ে তুলসীর রসে মেড়ে মটরের ডানার মতো ছোট ছোট গুলি তৈরি করে নিতে হবে। দিনে ৩-৪ বার একটি করে গুলি গোলাপের আরকের সঙ্গে সেবন করতে দিলে কলেরা রোগে উপকার হয়।
২। ১০ গ্রাম জায়ফল চূর্ণ গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে এক-একটা তিন গ্রামের গুলি তৈরি করে নিন। এই রকম একটি করে গুলি আধঘণ্টা অন্তর খেয়ে হালকা গরম জল সেবন করলে কলেরার পায়খানা বন্ধ হয়ে যায়।
৩। কলেরার প্রকোপ দেখা গেলেই মাঝে মাঝেই খানিকটা করে পেঁয়াজের রস সেবন করতে দিলেও আরাম পাওয়া যায়। কলেরার গোড়াতেই ১ রতি পরিমাণ হিং মিশ্রিত পেঁয়াজের রস আধ ঘণ্টা অন্তর দিলে কলেরা রোগে উপকার হয়।
৪। আজমোদের পাতা ভালো করে ধুয়ে নিয়ে পিষে তার রস বের করে নিন। এই রস কলেরা হলে এক ঘণ্টা অন্তর সেবন করতে দিন। প্রথমে বড় চামচের চার চামচ করে দিন। পরে পায়খানা ধরে না আসা পর্যন্ত বা মল একটু ঘন হয়ে না আসা পর্যন্ত দু’চামচ করে দিয়ে যেতে হবে। এতে খুব অল্প সময়ে কলেরা প্রশমিত হয়ে আসে।
৫। ১০ রতি গোলমরিচ, ঘিয়ে ভাজা ১০ রতি হিং এবং ৪ রতি আফিম এক সঙ্গে মিশিয়ে ১২ টি গুলি তৈরি করে নিন। দিনে ৩-৪ বার একটি করে গুলি সেবন করতে দিন। এতেও কলেরা রোগ নিয়ন্ত্রিত হয়।
৬। ১০০ গ্রাম তেলে একটা জায়ফলের চূর্ণ দিয়ে অল্প আঁচে ভেজে নিন। ভালো করে পাক হলে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে রোগীর হাতে ও পায়ে মালিশ করুন। এতে রোগীর হাত-পায়ের ব্যথা দূর হবে।
৭। চিনি বা বাতাসার মধ্যে ২-৩ ফোঁটা লবঙ্গের তেল মিশিয়ে সেবন করতে দিন। এতেও কলেরাতে উপকার পাওয়া যায়।
[b]কলেরা রোগীর পথ্য[/b]
কলেরার হাত থেকে বাঁচতে অথবা নিয়ন্ত্রণে রাখতে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন রোগী অজ্ঞান না হয়। গরম ও টাটকা খাবার খেতে দেবেন। ভালো মতো খিদে পেলে তবেই খেতে দিবেন। খাবারের সঙ্গে অবশ্যই পুদিনা, পেঁয়াজ, পুরনো পাকা তেঁতুল, কাগজি লেবুর রস সেবন করতে হবে। বাড়িতে কুয়ো থাকলে তাতে পটাশিয়াম দিতে পরামর্শ দিন। নোংরা বাজারি খাবার, আ-ঢাকা খাবার, রাত্রি জাগরণ ইত্যাদি থেকে সাবধান থাকতে হবে।রোগীর মল-মূত্র ও বমি মাটিতে গর্ত করে পুঁতে দিন। জল ফুটিয়ে খেতে হবে।
ডাইরিয়া - বাংলাদেশে অন্যতম ঘাতক এই পানিবাহিত রোগটি। পানিতে মিশে থাকা জীবানু (ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, প্রোটেজোয়া ) কারনে ডাইরিয়া হয়ে থাকে। সাধারণত পানি বা খাবারের মাধ্যমে জীবানু পেটে যায়৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পাতলা পানির মতো পায়খানা শুরু হয়৷ ফলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে পানিশূন্যতার সৃষ্টি করে৷ খাবার বা পানীয়, মাছি, মল, অপরিস্কার হাত, বাসনপত্র বা সচরাচর ব্যবহৃত অন্যান্য জিনিসপত্রের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়৷
[b]ডাইরিয়ার লক্ষণ-[/b]
ঘন ঘন পাতলা পায়খানা,২৪ ঘন্টায় তিন বা তারো বেশি বার পায়খানা,পায়খানার সাথে বমি,নাড়ি দুর্বল হওয়া, চোখ, ঠোঁট, জিভ শুকিয়ে যাওয়া,ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া।
[b]ডায়রিয়া হলে কি করবেন-[/b]
ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়৷ লবণ ও পানির অভাব পূরণ করাই এর একমাত্র চিকিৎসা৷লবণ গুড়ের অথবা চালের গুড়ার স্যালাইন খাওয়াতে হবে৷খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি রোগীকে অন্যান্য খাবারও খেতে দিতে হবে৷ যেমন- পরিস্কার পানি, ভাতের মাড়, চিড়ার পানি, ডাবের পানি৷ এছাড়াও স্বাভাবিক খাবার চালিয়ে যেতে হবে৷শিশুর বুকের দুধ খাওয়া বন্ধ করবেন না৷যে বয়সের জন্য যে খাবার স্বাভাবিক তাই খাওয়াতে হবে৷বাজারে যে সমস্ত স্যালাইন পাওয়া যায় যেমন-ও আর এস, টেস্টি স্যালাইন খাওয়াতে পারেন৷অবস্থার উন্নতি না হলে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন৷ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ঔষুধ খাওয়াবেন না৷
[b]ডাইরিয়া থেকে রক্ষা পেতে কি করবেন-[/b]
বাসি, পচা বা মাছি বসা খাবার খাওয়া যাবে না৷নদী, পুকুর ও খাল বিলের পানি ফুটিয়ে পান করতে হবে৷ এ পানি না ফুটিয়ে গৃহস্থালির কোনো কাজে ব্যবহার করবেন না৷আর্সেনিক দূষণ মুক্ত টিউবয়েলের পানি পান করতে হবে৷কোন কিছু খাবার আগে হাত ভালো করে পরিস্কার করে নিতে হবে৷স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করতে হবে৷পায়খানা থেকে ফিরে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে৷ডায়রিয়া রোগীর মলমুত্র, বমি পুকুরের পানিতে ফেলা যাবে না৷
[b]বাড়িতে স্যালাইন তৈরির উপায়-[/b]
ডায়রিয়া হলে তিন আংগুলের এক চিমটি লবণ ও এক মুঠো গুড় আধা সের বিশুদ্ধ পানিতে ভাল ভাবে মিশিয়ে স্যালাইন তৈরি করে রোগীকে খাওয়ান৷আধা সের বিশুদ্ধ পানিতে প্যাকেট স্যালাইন মিশিয়েও রোগীকে খাওয়াতে পারেন৷মনে রাখবেন কোনো ধরনের গোলানো স্যালাইনই ছয় ঘন্টার বেশি রাখা যায় না৷ গরম করলে এর উপকারিতা নষ্ট হয়ে যায়৷
সতর্কতা: মনে রাখা দরকার যে, প্রস্তুতকৃত স্যালাইন ১২ ঘন্টার বেশি রাখা যাবে না৷
[b]স্যালাইন খাওয়ানোর নিয়ম-[/b]
বয়স  প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর কতটুকু দিতে হবে
২ বছরের কম ৫০-১০০ মিলি লিটার (সিকি গ্লাস থেকে আধা গ্লাস)
২-১০ বছর   ১০০-২০০ মিলি লিটার (আধা গ্লাস থেকে এক গ্লাস)
১০ বছরের উর্দ্ধ     যতটুক খেতে চায়
বিঃ দ্রঃ সকল বয়সেই যত বেশি স্যালাইন খাবে তত বেশি ভালো৷
[b]হেপাটাইটিস[/b] - এটি একটি পানি বাহিত ভাইরাস জনিত রোগ। এর ফলে জন্ডিস হয়ে থাকে। এটি লিভারকে নষ্ট করে ফেলতে পারে। জন্ডিসের ফলে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।হেপাটাইটিস বি এমন একটি ভইরাস যা বিশ্বব্যাপী মারাত্মক সংক্রামক রোগের জীবাণু হিসেবে পরিচিত। শিশুদের ব্যাপক হারে এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে পৃথিবীতে প্রতি বছর ২ থেকে ৫ লাখ নবজাতক হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করে যারা ভবিষ্যতে এই রোগের বাহক হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদি বাহক এবং এদের ২০ শতাংশ লিভার ক্যান্সার ও সিরোসিসের কারণে মারা যেতে পারে। বাস্তবে হেপাটাইটিস-বি এইডসের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি সংক্রামক এবং প্রতিবছর এইডসের কারণে পৃথিবীতে যত লোক মৃত্যুবরণ করে তার চেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ করে হেপাটাইটিস-বি’র কারণে।
[b]হেপাটাইটিস বি :[/b]
বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস একটি ভয়াবহ স্বাস্থ্য সমস্যা । হেপাটাইটিস বি এক ধরনের ভাইরাস যা মুলত লিভারকে আক্রমণ করে। এর সংক্রমণের ফলে পৃথিবীর অন্যতম ঘাতক ব্যাধি লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার হতে পারে। রক্ত ও রক্তজাত পদার্থ মূলত এই ভাইরাসের বাহক। প্রাথমিক পর্যায়ে এই ভাইরাসে আক্রান- রোগী সাধারণত কোনো লক্ষণ বহন করে না, অথচ এদের মাধ্যমে অন্যরা সংক্রমিত হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে রক্তরস, লালা, বীর্য ও বুকের দুধ এক দেহ থেকে অন্য দেহে ভাইরাস বিস্তারে সহায়তা করে। সাধারণত আক্রান্ত মায়ের শিশু সন্তান, আক্রান্ত পরিবারের অন্যান্য সদস্য, বহুবার রক্ত গ্রহণকারী রোগী, মাদকাসক্ত ব্যক্তি, মানসিক অবসাদগ্রস্ত ব্যক্তি, স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তথা হাসপাতালে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ-যেমন চিকিৎসক, সেবিকা, ল্যাবরেটরিতে কর্মরত ব্যক্তি, দন্তরোগের চিকিৎসকেরা এই ভাইরাসে আক্রান- হতে পারে ।
[b]হেপাটাইটিস বি’তে আক্রান- হওয়ার ঝুকি:[/b]
অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের অধিবাসী যেমন সাব সাহারা আফ্রিকা, এশিয়ার অধিকাংশ, প্রশান- মহাসাগরীয় অঞ্চলের অধিবাসী ও আলাস্কার আদি অধিবাসীদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি রোগের প্রকোপ অন্যদের তুলনায় অধিক।হেপাটাইটিস বি’তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুকি তাদের বেশী যারা রক্তক্ষরণ ও অন্যান্য কারণে সৃষ্ট রক্তশূন্যতার চিকিৎসায় বারবার ব্লাড ট্রান্সফিউশন করেন।
সমকামী পুরুষদের মধ্যে যৌন মিলনের ফলে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে সংক্রমিত নারী-পুরুষের মধ্যে একাধিক নারী-পুরুষের সঙ্গে যৌন মিলন।ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক দ্রব্য সেবন।একই নিডল ও সিরিঞ্জের মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তির মাদক দ্রব্য গ্রহণ।রোগীর দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহ, স্যালাইন বা ইনজেকশনের মাধ্যমে ওষুধ প্রয়োগ করার সময় কিংবা ল্যাবরেটরিতে রক্ত ও রোগীর দেহ থেকে সংগৃহীত তরল পদার্থ নিয়ে পরীক্ষা করার সময় অসাবধানতাবশত হেপাটাইটিস বি সংক্রমিত রক্ত কিংবা অন্য তরল জাতীয় পদার্থ স্বাস্থ্য কর্মীদের রক্তের সংস্পর্শে এলে।হেপাটাইটিস বি রোগের প্রাদুর্ভাব অধিক- এ ধরনের এলাকায় ছয় মাসের অধিক সময় অবস্থান করা।নার্সিং হোমে দীর্ঘ সময়ের জন্য অবস্থান বা কর্মরত থাকা।এছাড়াও হেপাটাইটিস বি’তে আক্রান- মায়ের গর্ভজাত সন্তানদের অনাক্রান্ত মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তানদের তুলনায় হেপাটাইটিস বি’তে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অধিক।
[b]শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ:[/b]
হেপাটাইটিস বি’তে নবজাতকরা পিতামাতার মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার হেপাটাইটিস বি ভাইরাস জন্মের সময় বাহক মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমিত হয়। এ ধরনের সংক্রমনকে ভার্টিক্যাল ট্রান্সমিশন বলা হয় । এছাড়া শৈশবে ও কৈশোরে খেলাধুলার সময় আঁচড়ের মাধ্যমে বাহক শিশু থেকে সুস্থ শিশুতে এ রোগ ছড়াতে পারে । একইভাবে সুচের মাধ্যমে নাক কান ফুটো করার মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে । আবার অশোধিত সিরিঞ্জ ও সুচ দ্বারা এবং চুল কাটার সময়ও সংক্রমন ঘটতে পারে ।
[b]উপসর্গ :[/b]
এক-তৃতীয়াংশ লোক কিছুই বুঝতে পারেন না।এক-তৃতীয়াংশ লোকের ফ্লুর মতো মাথাব্যথা, গা শিরশির এবং জ্বর হয়।এক-তৃতীয়াংশ লোকের জন্ডিস, ক্ষুধামন্দা, ডায়রিয়া, বমি ও জ্বর দেখা দেয়।
হেপাটাইটিস বি’র দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব:
হেপাটাইটিস বি’তে আক্রান- রোগীদের অধিকাংশই কোনো প্রকার চিকিৎসা ব্যতিরেকেই আরোগ্য লাভ করে থাকে। পাঁচ বছর বয়সের আগে আক্রান্ত শিশুদের শতকরা ৯০ জনই লিভারের ক্রনিক বা দীর্ঘ মেয়াদি প্রদাহে ভুগতে থাকে। বয়স্কদের মধ্যে এ সংখ্যা হচ্ছে পাচ থেকে দশ ভাগ। ক্রনিক প্রদাহে আক্রান্ত রোগীদের শতকরা একজন প্রতি বছর চিকিৎসা ছাড়াই জীবাণু বিমুক্ত হয় আর শতকরা ৩০ জন লিভার সিরোসিসের মতো মারাত্মক জটিলতায় ভুগতে থাকে। ক্রনিক হেপাটাইটিস বি’তে আক্রান্ত রোগীদের শতকরা পাঁচ থেকে দশজন লিভার ক্যান্সার বা হেপাটোসেলুলার কারসিনোমায় আক্রান্ত হয়।
[b]হেপাটাইটিস বি নিরূপণের উপায়:[/b]
রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে হবে। সাধারণত রক্তে হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেন, হেপাটাইটিস বি আইজিএম কোর অ্যান্টিজেন , হেপাটাইটিস বি ই এন্টিজেন ও সেই সঙ্গে লিভার এনজাইমের অধিক মাত্রা নিশ্চিতভাবে হেপাটাইটিস বি-এর একিউট সংক্রমণের কথা বলে দেয়। ক্রনিক বা দীর্ঘ মেয়াদি হেপাটাইটিস বি নিশ্চিত হওয়ার জন্য রক্তে হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেনের দীর্ঘ মেয়াদি উপসি'তি, হেপাটাইটিস বি কোর আইজিজি (ওমএ) অ্যান্টিজেন, হেপাটাইটিস ই এন্টিজেন ও লিভার এনজাইম পরীক্ষা অত্যন- জরুরি। আর সময়ের ব্যবধানে বি ভাইরাস দেহ থেকে নিঃসৃত হয়ে গেলে রক্তে হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেনের মাত্রা হ্রাস পেয়ে এক সময় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যতের জন্য হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধক হেপাটাইটিস বি কোর এন্টিবডি ও বি সারফেস অ্যান্টিবডি তৈরি করে। কতগুলো বিষয়ে সতর্ক থাকলে এ রোগ থেকে দুরে থাকা সম্ভব ।
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা।ইনজেকশন ব্যবহারের সময় ডিসপোসিবল সিরিজ ব্যবহার করা।দাঁতের চিকিৎসার সময় জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া।রোগের বিরুদ্ধে নিজের শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্‌হা গড়ে তোলা । হেপাটাইটিস বি-র টিকা ৪টি ডোজ নেওয়া। প্রথম তিনটি ১ মাস পর পর এবং চতুর্থ ডোজটি প্রথম ডোজের ১ বছর পর নিতে হয়।
[b]চিকিৎসা:[/b]
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব নবজাতককে হেপাটাইটিস বি’র টিকা নেয়া অত্যন্ত জরুরি বলে ঘোষণা করেছে এবং ইতোমধ্যে ৮০টির বেশি দেশ এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে টিকা দেয়ার সম্প্রসারিত কর্মসুচি গ্রহণ করেছে।বাংলাদেশ সরকার সকল শিশুকে হেপাটাইটিস বি ভ্যাক্সিন দেয়ার জন্য একে ইপিআই ভ্যাক্সিন কার্যক্রমের অর্ন্তভুক্ত করেছে। এ টিকা যে কোনো বয়সে যে কোনো দিন নেয়া যায়। শতকরা নব্বই ভাগ মানুষের শরীরে এই ভ্যাক্সিন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে ।
নীরব ঘাতক এ সংক্রামক ব্যাধিটি প্রতি মিনিটে কেড়ে নেয় দুজন নারী-পুরুষের প্রাণ। প্রতি বছর ১০-৩০ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান- হচ্ছে । এ রোগ থেকে মুক্ত থাকতে সবার প্রতিষেধকমুলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত। সর্বোপরি এ মহামারী থেকে বাচাঁর জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।
[b]আমাশয়[/b]- আমাশয় বা ইংরেজিতে Dysentery. এদেশের মানুষের কাছে যেটি খুব পরিচিত একটি রোগ। আমাশয় মূলত দুই ধরণের, অ্যামিবিক এবং ব্যাসিলারি। অ্যামিবিক আমাশয়ের মূলে রয়েছে এককোষী অ্যামিবা এবং ব্যাসিলারি আমাশয়ের মূলে রয়েছে একটি ব্যাক্টেরিয়া যার নাম সিগেলা/ shigella. এই দুই ধরণের আমাশয়ই মূলত আমাদের দেহে প্রবেশ করে দূষিত পানি এবং খাবারের মাধ্যমে। আক্রান্ত ব্যক্তির মলের সাথে বেরিয়ে আসা জীবাণু দ্বারা দূষিত পানি দিয়ে ধোয়া খাবার যেমন ফল, সালাদ খাওয়া, অবিশুদ্ধ পানি পান এগুলো আমাশয়ে আক্রান্ত হওয়ার বড় কারণ। আক্রান্ত ব্যক্তির সঠিকভাবে হাত পরিস্কার না করে থাকলে তার কাছ থেকেও ছড়াতে পারে আমাশয়। মাছির মাধ্যমেও জীবাণু খোলা খাবারে সংক্রমিত হতে পারে।
আমাদের দেশে বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের পরে আমাশয়ের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। আমাশয়ের উপসর্গের মাঝে রয়েছে মোচড় দিয়ে পেটে ব্যাথা, বার বার মল ত্যাগ করা, মলের সাথে আম অথবা রক্ত যাওয়া, সাথে জ্বর থাকা, অ্যামিবিক আমাশয়ের ক্ষেত্রে মলে হাল্কা দুর্গন্ধ হতে পারে। ডায়রিয়ার সাথে আমাশয়ের একটা পার্থক্য হচ্ছে ডায়রিয়ায় মলে পানির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে আর আমাশয়ে মলে পানির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে।
মলের সাথে রক্ত গেলে তাকে বলা হয় রক্ত আমাশয়। আক্রান্ত ব্যক্তির অন্ত্রের দেয়াল যখন জীবাণু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন ক্ষত সৃষ্টি হয়ে  রোগী আম এবং রক্ত মিশ্রিত মল ত্যাগ করেন। সাধারনত জীবাণু দেহের ভেতরে প্রবেশ করার ১ থেকে ৩ দিনের মাঝেই রোগের উপসর্গ প্রকাশ পেতে শুরু করে। একসপ্তাহের মাঝেই এটি অধিকাংশ সময়ে নিরাময় হয়ে যায়।
আমাশয়ের হাত থেকে বাঁচার প্রধান উপায় আমাদের সকলেরই জানা, তার পরেও আবার মনে করিয়ে দিতে চাইঃ
১। প্রতিবার মল ত্যাগের পরে হাত সাবান দিয়ে ভালো করে পরিস্কার করা
২। স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার করা
৩। না ধুয়ে কোন ফল বা অন্যান্য খাবার না খাওয়া
৪। খাবার খোলা না রাখা
৫। বাসি, পচা কোন খাবার না খাওয়া
৬। আক্রান্ত ব্যক্তিকে খাবার প্রস্তুত করতে না দেওয়া
আমাশয়ের চিকিৎসার মূল লক্ষ্য দুইটিঃ বার বার পাতলা পায়খানার ফলে পানি শূন্যতার হাত থেকে রোগীকে রক্ষা করা এবং জীবাণু নাশে ঔষধের ব্যবহার করা।
পাতলা পায়খানার জন্য ওরস্যালাইন ব্যবহার করতে হবে, এটা আমরা সবাই জানি। ব্যাকটেরিয়া জনিত আমাশয়ে ৫-৭ দিনের এন্টিবায়োটিকেই কাজ হয়, বর্তমানে সিপ্রোফ্লকসাসিন বা এজিথ্রোমাইসিন খুব ভালো কাজ করে। অ্যামিবিক আমাশয়ে মেট্রনিডাজল ৫ দিনের কোর্সই যথেষ্ট।
আমাশয় এমন একটি অসুখ যা  থেকে মুক্ত থাকতে চাইলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কিছু সাধারণ নিয়ম পালন করলেই চলে। তাই ব্যক্তিগত এবং সামাজিক পরিচ্ছন্নতার প্রতি সকলের নজর রাখা অতীব জরুরী এ ব্যাপারে।
[b]টাইফয়েড[/b] - একটি পানিবাহিত রোগ। সলমনেলা টাইফি এবং প্যারাটাইফি নামক পানিবাহিত জীবানু দিয়ে এই রোগটি হয়ে থাকে।টাইফয়েড জ্বর স্যালমোনেলা টাইফি নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা গুরুতর ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের কারণে সাধারণত টাইফয়েড জ্বর হয়ে থাকে। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তস্রোতে ও অন্ত্রনালীতে এই ব্যাকটেরিয়া অবস্থান করে এবং দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে তা দ্রুত সুস্থ ব্যক্তির দেহে সংক্রমিত হতে পারে। দুষিত খাবার ও পানি গ্রহণের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিযা দেহে প্রবেশ করা মাত্রই গুণিতক আকারে বেড়ে গিয়ে রক্তস্রোতে ছড়িয়ে পড়ে। আর তখনই দেহে জ্বরসহ নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়।
[b]কাদের টাইফয়েড জ্বর হতে পারে :[/b] টাইফয়েড জ্বর বাংলাদেশে খুবই সচরাচর একটি রোগ এবং স্যালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া বাহিত দূষিত খাবার গ্রহণ বা পানি পানের মাধ্যমে যে কেউ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এ কারণে বসতিপূর্ণ এলাকার লোকজনের টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
টাইফয়েড জ্বর কিভাবে ছড়ায় : টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তি স্যালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া বহন করে। এছাড়াও টাইফয়েড জ্বর হতে আরোগ্য লাভ করেছেন কিন্তু এই ব্যাকটেরিয়া বহন করছেন এমন কিছু সংখ্যক ব্যক্তিও এই রোগের বাহক হতে পারে।
টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং স্যালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া বহনকারী উভয় ধরনের ব্যক্তিরাই মলত্যাগের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ঘটিয়ে থাকে।
পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা যথাযথ না হলে এবং তার ফলে টাইফয়েড রোগীর মলত্যাগের পর এই ব্যাকটেরিয়া পানির সংস্পর্শে আসলে এবং পরবর্তীতে এই দূষিত পানি খাবারে ব্যবহৃত হলে অথবা টাইফয়েড জ্বরের ব্যাকটেরিয়া বহন করছে এমন কোন ব্যক্তির স্পর্শকৃত বা হাতে বানানো খাবার গ্রহণ থেকেও টাইফয়েড জ্বর সংক্রমিত হতে পারে।
[b]টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ :[/b] ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত টানা জ্বর।ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটে ব্যথা অনুভূত হওয়া, মাথাব্যাথা করা।গা ম্যাজ ম্যাজ করা, কফ বা কাশি হওয়া, হার্ট রেট বা হৃদস্পন্দন কমে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা।
[b]টাইফয়েড জ্বর সনাক্তকরণ :[/b] কেবল আপনার চিকিৎসকই বলতে পারবেন যে আপনার টাইফয়েড জ্বর হয়েছে কিনা। দ্রুত সনাক্তকরণের জন্য ব্লাড কালচার নামক রক্ত পরীক্ষা করতে হয়। স্যালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার জন্য জ্বর হওয়ার ২য় সপ্তাহে উইডাল টেস্ট নামে এক ধলনের ননস্পেসিফিক ব্লাড টেস্ট করতে হয়।
[b]টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসা :[/b] এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। নির্দিষ্ট এন্টিবায়োটিক শুরুর পর জ্বর কমতে পাঁচদিনও লেগে যেতে পারে। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পরও যারা দ্রুত চিকিৎসা করেন না তাদের সপ্তাহ বা মাসব্যাপী জ্বর থাকতে পারে এবং বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
অধিক পরিমাণে তরল খাবার গ্রহণে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর এবং ডায়রিয়ার কারণে সৃষ্ট পানি স্বল্পতা দূরীভূত হয়। এছাড়া তীব্র আকারে পানি শূন্যতা দেখা দিলে শিরাপথে ওষুধ প্রদানের মাধ্যমেও তরলজাতীয় খাবার প্রদান করা যেতে পারে।স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণে অসুস্থতাকালীন সময়ে হারানো পুষ্টি পুনরুদ্ধারে উচ্চ ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা উচিত।যতদিন পর্যন্ত চিকিৎসক এন্টিবায়োটিক গ্রহণের পরামর্শ দিবেন ততদিন পর্যন্ত তা গ্রহণ করতে হবে।প্রতিবার বাথরুম ব্যবহারের পর আপনার হাত পানি ও সাবান দিয়ে ভাল করে ধুয়ে ফেলুন।খাবার তৈরি করা বা খাবার পরিবেশন করা থেকে বিরত থাকুন।
টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে : টাইফয়েড জ্বরের জন্য নির্ধারিত ভ্যাক্সিন (টিকা) চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করুন। ইনজেকশন এবং মুখে খাওয়ার উভয় ধরনের ভ্যাক্সিন বাজারে খুবই সহজলভ্য। কোন ধরনের ভ্যাক্সিন গ্রহণ করবেন সে বিষয়ে আপনার চিকিৎসককের পরামর্শ নিন। শুধু ভ্যাক্সিনই ১০০% কার্যকর হবে তা নয়, এর সাথে নিম্নলিখিত কার্যকরী পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করতে হবে।
শাকসবজি, ফলমূল এবং রান্নার বাসনপত্র পরিষ্কার পানিতে ধৌত করতে হবে।ভালভাবে রান্নাকৃত বা সিদ্ধকৃত খাবারই কেবলমাত্র পান করুন।খাবার গ্রহণ, প্রস্তত বা পরিবেশনের পূর্বে খুব ভালভাবে হাত ধৌত করুন।ভালভাবে ফুটানো, পরিশোধিত বা বোতলজাত বিশুদ্ধ পানিই কেবলমাত্র পান করুন। পর্যাপ্ত পরিমাণে ফুটানো পানি বা পরিশোধিত পানি সংরক্ষণ করুন এবং পানি যাতে দূষিত হতে না পারে সে জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংরক্ষণকৃত সেই পানি পান করুন।বোতলজাত, পরিশোধিত বা ফুটানো পানি হতে বরফ তৈরি করা না হলে সেই বরফ মিশিয়ে পানি বা অন্য কোন পানীয় পান করা হতে বিরত থাকুন।
যে সমস্ত সবজি বা ফলমূলের খোসা উঠানো যায় না সেগুলো এড়িয়ে চলুন। আর যে সমস্ত ফলমূলের খোসা উঠানো যায় সেগুলোর ক্ষেত্রে আগে ভালভাবে সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করে তারপর খোসা উঠানো উচিত এবং সেই খোসা খাওয়া উচিত নয়।রাস্তার পার্শ্বস্থ দোকানের খাবার গ্রহণ এবং পানি পান করা থেকে বিরত থাকা উচিত।টয়লেট ব্যবহারের পর ভালভাবে হাত পরিষ্কার করুন, এছাড়া টয়লেট সব সময় পরিষ্কার রাখুন।
[b]কখন আপনার হাত ধুয়ে নিবেন :[/b]
টয়লেট ব্যবহারের পর।আপনার শিশুকে পরিষ্কার করার পূর্বে।খাবার প্রস্তুত বা পরিবেশন করার পূর্বে।খাওয়ার পূর্বে বা আপনার শিশুকে খাওয়ানোর পূর্বে।
[b]হাত ধোয়ার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা-[/b]
সব সময় সাবান ব্যবহার করুন।প্রচুর পরিমাণ পারিষ্কার পানি ব্যবহার করুন।হাতের সম্মুখভাগ, পশ্চাতভাগ, আঙ্গুলগুলোর মাঝামাঝি অংশ এক কথায় হাতের সকল অংশই যথাযথভাবে পরিষ্কার করুন।
মনে রাখা উচিত : চিকিৎসা ছাড়াও যদি টাইফয়েড-এর উপসর্গগুলো এমনিতে বিতাড়িত হয় তারপরও স্যালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার জীবাণু আপনার দেহে থাকতে পারে এবং এই অসুস্থতা পরবর্তীতে দেখা দিতে পারে বা আপনার কাছ থেকে অন্যত্র বাহিত হতে পারে। ভ্যাক্সিন নেয়ার পরেও খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় নির্বাচনে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে আপনি যখন টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত রোগী বেশি আছে এমন এলাকা পরিদর্শনে থাকবেন।
খোস পাচড়া - ত্বকের পানিবাহিত রোগ। দুষিত পানির সংস্পর্শে খোস পাচড়া, চুলকানি সহ নানান ত্বকের রোগ হয়।খোস-পাচড়া
[b]লক্ষণ-[/b]
দুই আঙ্গুলের মাঝখানে ছোট্ট দানার মত হয়।যৌনাঙ্গে ছোট্ট দানার মত দেখা যায়। শরীরের অন্যান্য অংশে বিশেষ করে চামড়ার ভাঁজে একইভাবে দেখা যায় ।দানা চাপ দিলে পানি বের হয়।ভীষণ চুলকালে আক্রান্ত জায়গায় প্রদাহ হয় ও পুঁজ জমে।
চিকিৎসা-
পরিষ্কার কাপড়-চোপড় পরতে হবে।ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে হবে।
[b]প্রতিরোধ- [/b]
পাঁচড়া ও খুঁজলির ক্ষেত্রে রোগীকে আলাদা রাখা।পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।দূষিত পুকুরে গোসল না করা।দৈনন্দিন পরিধেয় কাপড় পরিস্কার রাখা।নখ কেটে ছোট রাখা।গামছা, বিছানা ও বালিশ পরিস্কার রাখা।পাঁচড়া ও খুঁজলি সেরে গেলে রোগীর ব্যবহার্য কাপড়-চোপড় বিছানাপত্র ধুয়ে দিতে হবে।
এগুলি ছাড়াও পরোক্ষ ভাবে আরো কিছু রোগের জন্য পানি দায়ী যেমন ডেংগু, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি।
তাই যেভাবেই হোক সব সময় বিশুদ্ব পানি পান করুন। অধিকাংশ রোগ আপনার থেকে ১০০ হাত দুরে থাকবে। এবং আপনিও ডাক্তারের কাছ থেকে ২০০ হাত দুরে থাকতে পারবেন।
[b]ঢাকা, ৪ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম)//এসএইচ[/b]