হলি আর্টিজানে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার তিন বছর আজ। ২০১৬ সালের আজকের রাতে গুলশানের কূটনৈতিক এলাকার হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় অস্ত্রধারী জঙ্গিরা আচমকা হামলা চালায়। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলা ছিল এটি। ওইদিন জঙ্গিরা রেস্তোরাঁর ভেতরে থাকা দেশি-বিদেশি সকল নাগরিককে জিম্মি করে ফেলে।

তাৎক্ষণিক তাদেরকে প্রতিহত করতে গিয়ে নিহত হন গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এছাড়া রাতভর হামলায় জঙ্গিরা ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা ছাড়াও জাপানি, ইতালি, আমেরিকান নাগরিকসহ ১৭ বিদেশী ও ৩ বাংলাদেশীকে হত্যা করে। পরদিন সকালে যৌথ বাহিনীর কমান্ডো অভিযান অপারেশন থান্ডারবোল্টে হামলাকারী ৫ জঙ্গি নিহত হয়। জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জিম্মিকে।

নারকীয় এই হামলায় ওই বছরের ৪ জুলাই নিহত পাঁচ জঙ্গিসহ অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এই মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভয়াবহ এই হামলার পর পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র-বোমা সংগ্রহ ও সমন্বয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করে তদন্তসংস্থা। মামলা তদন্তকালে বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা, টেকনোলজি, বিশেষজ্ঞের মতামত, আলামত সংগ্রহ, স্বাক্ষ্য গ্রহণ করে অপরাধীদের চিহ্নিত করা হয়। তদন্তে অস্ত্র সংগ্রহে কারা জড়িত, অস্ত্রের উৎস, অর্থের যোগানদাতা, আশ্রয়দাতা, কোর্ডিনেটরদের সকলকে শনাক্তসহ অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করার জন্য ঘটনা সংশ্লিষ্ট আলামত সংগ্রহ করে পুলিশ।

তদন্ত সংস্থা সিটিটিসি সূত্র জানিয়েছে, হলি আর্টিজান হামলার ঘটনায় তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট জমা দেয়া হয়েছে গত বছরের জুলাই মাসে। মামলার তদন্তে এই ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২১ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

তারা হলেন- তামিম চৌধুরী, সরোয়ার জাহান ওরফে আব্দুর রহমান, তানভীর কাদেরী ওরফে জামসেদ, নূরুল ইসলাম মারজান, বাশারুজ্জামান চকোলেট, মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান, মেজর (অব) জাহিদুল ইসলাম, রায়হান কবির ওরফে তারেক, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিরবাস ইসলাম, মীর সামিহ মোবাশ্বের, খায়রুল ইসলাম পায়েল, শফিকুল ইসলাম উজ্জল ওরফে বিকাশ, জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলামুল ইসলাম ওরফে রাশেদ, সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ, হাদীসুর রহমান সাগর, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, মামুনুর রশিদ রিপন ও শরীফুল ইসলাম খালিদ। এই ২১ জনের মধ্যে ১৩জন বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছেন। নিহতদের ভ্থমিকা উল্লেখ করে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। বাকি আটজনকে সরাসরি অভিযুক্ত করে চার্জশিট জমা দেয়া হয়েছে।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ তদন্ত শেষে আমরা জীবিত আট জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দিয়েছি। আট জনের মধ্যে ৬ জন বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার ছিল আমাদের কাছে আর পলাতক ছিল দুইজন। চার্জশিট দাখিলের পর পলাতক দুইজনের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পরবর্তীতে তারা র‌্যাবের হাতে আটক হন।

এখন এই হামলার চার্জশিটভুক্ত সকলেই কারাগারে আছে। তিনি বলেন, এই আট জনের বাইরে আর নতুন করে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অ্যান্টিটেরোরিজম ট্রাইব্যুনালে বিচার চলমান আছে।

খুব শিগগিরই শুনানি শুরু হবে এবং বিচার প্রক্রিয়া খুব দ্রুত শেষ হবে। মনিরুল বলেন, হলি আর্টিজানে হামলা হবে এমন কোন তথ্য আমাদের কাছে ছিল না। তবে হামলার পর আমরা জানতে পেরেছি শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানসহ আরো কিছু স্থানে জঙ্গিদের হামলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আমরা সেটি রুখে দিয়েছি।

তারা হামলার পরিকল্পনা করে যেখানে যেখানে আস্তানা করে বিস্ফোরক তৈরি করছিল ওসব স্থানে অভিযান চালিয়ে আমরা তাদেরকে প্রতিহত করেছি। এজন্য হলি আর্টিজান, শোলাকিয়া, সিলেটের একটি ঘটনা ছাড়া তেমন বড় কোন ঘটনা ঘটেনি।

বিভিন্ন অভিযানে ১৩ জঙ্গি যেভাবে নিহত হয়: এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম চৌধুরীকে। ২০১৬ সালের ২৭শে আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় পুলিশ সদর দপ্তর ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের জঙ্গিবিরোধী এক অভিযানে দুই সহযোগীসহ মারা যায় তামিম। এছাড়া পরিকল্পনায় অন্যতম সহযোগী হিসেবে উল্লেখ রয়েছে সরোয়ার জাহান ওরফে আব্দুর রহমানের নাম।

২০১৬ সালের ৮ই অক্টোবর আশুলিয়ায় সারোয়ার জাহানের বাড়িতে র‌্যাবের অভিযানে পাঁচ তলা থেকে পালাতে গিয়ে নিচে পড়ে নিহত হয় সরোয়ার। গুলশান হামলায় হামলাকারীদের আশ্রয় ও অর্থদাতা হিসেবে নাম এসেছে তানভীর কাদেরী ওরফে জামসেদের। ২০১৬ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর আজিমপুর এলাকায় সিটিটিসির এক অভিযানে নিহত হয় তানভীর।

নূরুল ইসলাম মারজানকে গুলশান হামলার পরিকল্পনাকারীর সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে চার্জশিটে। ২০১৭ সালের ৬ই জানুয়ারি মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এক সহযোগীসহ নিহত হয় মারজান। মারজানের মতো বাশারুজ্জামান চকোলেটও শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর সহযোগী হিসেবে গুলশান হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭শে এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে সিটিটিসি’র এক জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয় বাশার। গুলশান হামলায় অস্ত্র ও গ্রেনেড সরবরাহে মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজানের ভূমিকা ছিলো বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

বাশারুজ্জামানের সঙ্গে একই দিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে সিটিটিসি’র জঙ্গিবিরোধী অভিযানে মারা যায় মিজান। গুলশান হামলায় অংশ নেয়া হামলাকারীদের প্রশিক্ষক হিসেবে তদন্তে নাম এসেছে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলামের। ২০১৬ সালের ২রা সেপ্টেম্বর মিরপুরের রূপনগরে সিটিটিসি’র জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয় জাহিদ।

জাহিদের পাশাপাশি রায়হান করিব ওরফে তারেকও হামলাকারীদের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল। তারেক ২০১৬ সালের ২ শে জুলাই কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে আট সহযোগীসহ নিহত হয়।

হলি আর্টিজানে হামলায় নিহতরা: আচমকা ওই হামলায় প্রাণ যায় ১৭ বিদেশি ও তিন বাংলাদেশীসহ ২০ জনের। নিহত ৩ বাংলাদেশি হলেন, ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের নাতি ফারাজ আইয়াজ হোসেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অবন্তি কবির, ও শিল্প ব্যক্তিত্ব ইশরাত আকন্দ। এছাড়া জঙ্গি হামলা প্রতিরোধ করতে গিয়ে জঙ্গিদের ছোঁড়া গ্রেনেডে প্রাণ হারান ঢাকা মহানগর (উত্তরের) গোয়েন্দা পুলিশের সহকারি কমিশনার রবিউল আলম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন খান। পরদিন সকালে সেনা অভিযানে সময় মারা যান ওই রেস্তোঁরা শেফ সাইফুল ইসলামের।

এছাড়া বিদেশীদের মধ্যে একজন ভারতীয়, ৯ জন ইতালিয়ান ও সাতজন জাপানী নাগরিক প্রাণ হারান। নিহত একমাত্র ভারতীয় নাগরিক ছিলেন তারুশি জৈন।

নিহত ৯ ইতালিয়ান হলেন- ক্লাউদিয়া মারিয়া ডি এন্তোনা (৫৬), সাত মাসের অন্তঃসত্বা সিমোনা মন্টি (৩৩), মারকো তোন্দাত (৩৯), নাদিয়া বেনেদেত্তি (৫২), আদেলে পুগলিসির (৫০), ?ক্রিসটিয়ান রোজি (৪৭), ক্লাউডিও কাপেল্লি (৪৫), ভিনসেনজো দাল্লেসত্রো (৪৬) ও মারিয়া রিবোলি (৩৪)। নিহত সাত জাপানী হলেন, তানাকা হিরোশি, ওগাসাওয়ারা, শাকাই ইউকু, কুরুসাকি নুবুহিরি, ওকামুরা মাকাতো, শিমুধুইরা রুই ও হাশিমাতো হিদেইকো।

এসএম