‘আর কয়েন না ভাই। দুই পাও, আর কোমরটা ব্যথা হয়ে যায়। এত কষ্ট করে গাতি চালানে যায়? রাস্তাডা এতই খারাপ। কি করব এই রাস্তাই চলাচল করতে হয়।’ জানতে চাইলে কাছিকাটার নছিমন চালক এনছের আলী এসব কথা বলেন।

চাটমোহর থেকে বিশ্বরোড কাছিকাটা যেতে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি এখন এ পথে চলাচলকারী মানুষ ও যানবাহন চালকদের কাছে এক কষ্টের সড়ক সেটিই এনছের আলীর কথায় উঠে এসেছে। এই সড়কের কুকড়াগাড়ী থেকে কাছিকাটা পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার সড়ক সবচেয়ে খারাপ হয়ে পড়েছে। বাকি ৬ কিলোমিটার চাটমোহর থেকে কুকড়াগাড়ী পর্যন্ত এখনো মোটামুটি চলাচলযোগ্য রয়েছে।

কেউ জানতে চাইলে এই পথের ১৪ কিলোমিটার সড়কের কোন জায়গাটা ভালো, তা নির্দিষ্ট করে কাউকে বলা যাবে না যে, অমুক জায়গা ভালো। গোটা পথটাই যেন পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। সব ধরনের যানবাহনই চলে এ পথে। বাস-ট্রাক-পিক আপ-প্রাইভেট কার-সিএনজি-অটো। আর স্থানীয় অবৈধ নছিমন-করিমন তো আছেই।

রাস্তা দেবে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। সেখানে গাড়িগুলো এসে থামছে। তারপর সাবধানে গর্ত পার হতে হচ্ছে। গুনে দেখা যায় সড়কটিতে রয়েছে ৬৫৮টি বড় গর্ত। আর পিচ উঠে গিয়ে ইট বেরোনো স্থানের দূরত্ব ও সংখ্যা হিসাবের বাইরে। এমন জায়গা আছে, যেখানে ১০০-১৫০ মিটার জায়গা পর্যন্ত পিচ উঠে গিয়ে ইট-খোয়াতে চলাচল কঠিন করে দিয়েছে। শুক্রবার বিকেলে সড়কটি সরেজমিনে দেখতে গিয়ে এসবই চোখে পড়ে।

বিশ্ব রোর্ডের মান্নান নগরের সিএনজি অটোচালক নাসিম আলীর সঙ্গে কথা হয় কাটেঙ্গার বামন বাজারে। তিনি বলেন, ‘ভাই, অতি সাবধানে গাড়ি চালাতিচি। একটু এদিক-সেদিক হলিই তিন উল্টান খাওয়া লাগবি।’

বরদানগর বটতলা কথা হয় পাবনার ট্রাকচালক আবদুল কাহারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘লোড ট্রাক নিয়ে এ রকম রাস্তায় চলা বিশাল ঝুহির ব্যাপার। ভয়ে ভয়ে বেরেকে পা দিয়ে আল্লাহ আল্লাহ কোরে চালাই। একবার রাস্তার এধারে যাই, আবার ওই ধারে যাই। এইতো অবস্থা বুজিচেন?’

কাটেঙ্গা বউবাজারের পরে দেখা হয় চাটমোহর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরার সঙ্গে। তিনি প্রাইভেট কার নিজেই চালিয়ে যাচ্ছেন ছাইকোলার দিকে। বলেন, ‘লেখেন ভাই লেখেন। যাতে তাড়াতাড়ি রাস্তাটা দিকে নজর দেয় সড়ক বিভাগ।’


বরদা নগরের সজীব আর ঝাকড়ার আতিক হাসানের সঙ্গে কথা হয় বামন বাজারে। তারা বলেন, ‘আমাগারে চাটমোহর বা বিশ্বরোডে যাওয়ার দরকার হলি গায়ে জ্বর আসে। এত ঝাঁকি লাগে যে কোমর আর শরীরের ব্যথা সাত দিনেও যাবের চায় না। আপনেরা বেশি করে লেখেন। তাহলি রাস্তাডা ভালো করে দিবিনি।’

ছাইকোলা ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক পৌসভার কাজীপাড়া মহল্লার বাসিন্দা কাজী মান্নাফ বলেন, ‘মোটরসাইকেলে যাতায়াত করি কলেজে। ভয়ে ভয়ে যাই প্রতিদিন। রাস্তা এত খারাপ হয়ে গেছে যে, মনে হয় কখন পল্টি খেয়ে হাত-পা ভেঙে যাবে।’

কথা হয় ছাইকোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান তোতার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় গর্ত হয়ে দেবে গেছে। প্রতিদিনই যানবাহন দুর্ঘটনাকবলিত হচ্ছে। শুকনো মৌসুম শুরু হলেও সড়কটি মেরামত হচ্ছে না। আমার ভীষণ বিপদে আছি এই সড়কে চলাচল করতে গিয়ে।’

স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) চাটমোহরের উপজেলা প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, ১৯৯৯-২০০৩ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির অর্থায়নে এলজিইডির প্রকল্প-৭-এর আওতায় প্রায় ৬ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে সড়কটি নির্মিত হয়। এরপর ২০০৫ সালে ১৩ কিলোমিটার এই সড়কটি এলজিইডি থেকে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পাবনার সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মোফাজ্জল হায়দার বলেন, ‘সড়কটি বন্যা এলেই ক্ষয়ক্ষতি হয়। তা ছাড়া, সব সময় ভারী যানবাহন চলাচল করে। বন্যার সময় সড়কটির দুই পাশে পানি থাকায় দেবে যায়। আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু মেরামত করেছি চলতি অর্থবছরে। বড় মেরামতের জন্য বাজেট চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। এখনো বরাদ্দ পাইনি।’

জেআই