যমুনা নদীর নজীর বিহীন ভাঙ্গনে শতাব্দি প্রাচীন ৪টি গ্রাম টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম শাখারিয়া ও চক ভরুয়া ইতিমধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বিগত এক সপ্তাহে চর সোনামুই গ্রামের অর্ধেক নিমজ্জিত হয়েছে।

এছাড়া নাগরপুর উপজেলার ভাড়রা ইউনিয়নের চরাঞ্চলের ৩টি গ্রামে নতুন করে নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে কমপক্ষে ৫ শতাধিক পরিবার। ভাঙ্গনের শিকার হয়ে নদীতে তলিয়ে গেছে দুটি মসজিদ ও একটি কবরস্থান সহ কমপক্ষে ২০০ একর ধানি জমি।

এছাড়া ৪টি কাঠালের বাগান, বাঁশ ঝাড়েরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় এক শতাধিক পরিবারের বসত ভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গৃহহীন এসব পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন জাপন করছে।

ভাঙ্গন কবলিত এলাকাবাসীরা জানান, ভাঙ্গনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গোপালপুর উপজেলার চক সোনামুই গ্রামটিও নদী গর্ভে নিশ্চিহ্ন হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সোনামুই গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি ছানোয়ার হোসেন জানায়, তারাকান্দি-ভূঞাপুর যমুনা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের সময় ৪টি শতাব্দী প্রাচীন জনপদকে বাঁধের বাইরে রাখা হয়। এটিই ছিল মূল সর্বনাশের কারণ।

পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মিত হলে যমুনার মূল স্রোত ধারা পূর্ব দিকে ক্রমান্বয়ে সরে আসতে থাকে। বর্ষাকালে তা গ্রামে হানা দেয়। গত দশ দিনের ভাঙ্গনে সহস্রাধিক একর আবাদী জমি, পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়েছে। স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, দোকানপাট কিছুই রেহাই পায়নি।

নিন্মবিত্ত চাষীরা ঝাওয়াইল কৃষি ব্যাঙ্কের ঋণে ৫০০ একরে গ্রীস্মকালীন সবজির আবাদ করেছিল। ভাঙ্গনে যমুনা তা গ্রাস করেছে। ক্ষতিগ্রস্তরা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বাঁধের পশ্চিম পাড়ের অনেক বাসিন্দা এখনো পানি বন্দী। ঘরে খাবার নেই। ডায়রিয়া দেখা দিয়েছে। একমাত্র স্কুলটি নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে।

উপজেলা চেয়ারম্যান ইউনুস ইসলাম তালুকদার জানান, বাঁধে আশ্রয় নেয়া পরিবারগুলো অনাহারে অর্ধাহারে দিনযাপন করছে। তিনদিনের লাগাতার বৃষ্টি জীবনকে আরো অসহনীয় করে তুলেছে। বরাদ্দের অভাবে নিঃস্ব মানুষের মধ্যে নূন্যতম ত্রাণ সামগ্রী ও বিতরণ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে গত এক সপ্তাহে নাগরপুর উপজেলায় যমুনা নদীর তীরবর্তী ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নতুন করে তীব্র ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ওই নদীর পুর্বপার নাগরপুর উপজেলার ভাড়রা ইউনিয়নের আটাপাড়া, মারমা ও ধলাই গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙ্গনের তীব্রতা এখন ভয়াবহ রুপ নিয়েছে।

গত সাত দিনের ব্যবধানে নতুন করে ভাঙ্গনের শিকার হয়েছে ওই ৩ গ্রামের অন্তত শতাধিক পরিবারের বসত ভিটা। নদী তীরবর্তী শত শত পরিবার হুমকির মুখে পড়ায় তাদের ঘরবাড়ী অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। প্রতি বছর ধলাই, খাষধলাই, আটাপাড়া ও মারমা গ্রাম ভাঙ্গনের শিকার হলেও ভাঙ্গন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন এ পর্যন্ত কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

ভাড়রা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, ভাঙ্গন রোধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু না করলে যে কোন মুহুর্তে ৩টি গ্রাম নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে, ধলাই, আটাপাড়া ও মারমা গ্রাম।

ভাঙ্গনের শিকার ওই গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধা রং বাহার, আইয়ুব আলী সিদ্দিক, সালাম, সামাদ, ছরোয়ার সন্তোষ, তমেজ, বাবু ও ফরিদসহ শতাধিক পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এখনও ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছায়নি। ভাঙ্গনের শিকার এ তিন গ্রাম দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেন জানান, নাগরপুরে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বরাদ্দ করা হয়েছে। ইউএনও'র মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পৌঁছানো হয়েছে। এছাড়া গোপালপুরে ইউএনও এখনও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে বরাদ্দ চায়নি। চাওয়া মাত্রই দেয়া হবে।

ঢাকা, ১৯ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেআই