তৃণমূলে মাঠপ্রশাসনের শীর্ষপদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) রাজনৈতিক মতাদর্শ জানতে তদন্ত করছে পুলিশ।
পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) কর্মকর্তারা যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেছেন সেখানেও তথ্য তালাশ করছে। গ্রামের বাড়িসহ আগের কর্মস্থলেও যাচ্ছে পুলিশ।
বিভাগীয় মামলার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে করা যে কোনো অভিযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছেন তারা। পুলিশের এমন তদন্তে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে প্রশাসনের সর্বত্র। তবে এ তদন্তের বিষয়ে কিছুই জানে না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এ তথ্য।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানান, ‘বিষয়টি এখনও তার সামনে উপস্থাপিত হয়নি। উপস্থাপিত হলে পর্যালোচনা করবেন।’
পুলিশের বিশেষ শাখার (রাজনৈতিক) দফতর থেকে পাঠানো ছকে সংশ্লিষ্ট তথ্য পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার নিম্নে নয় এমন কর্মকর্তাদের দিয়ে অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে। তিন কলামের এ ছকে প্রার্থীর ১১টি তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রার্থীর বাবা-মায়ের নাম, স্থায়ী ঠিকানা ও কর্মস্থলের থানার রেকর্ড (সিডিএমএস তথ্য যাচাই) চাওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ইউএনও যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন তার নাম, সেশন ও সাল জানতে চাওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকলে তা নিশ্চিত হতে হবে।
ছকে কর্মকর্তার পূর্ববর্তী কর্মস্থল, সময়কাল ও পদবির বিবরণ চাওয়া হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা ওএসডি থাকলে বা তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা থাকলে তাও উল্লেখ করতে বলা হয়েছে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে। কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ যদি থাকে, তার পরিবার বা নিকটাত্মীয়/স্বজনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার তথ্য থাকলে সে বিষয়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
পাশাপাশি কর্মকর্তার স্থায়ী ঠিকানায় যোগাযোগ করে এসব তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। কর্মকর্তা সম্পর্কে তার সহকর্মীদের সার্বিক ধারণা, কর্মকর্তার সততা, সুনাম বা অন্য কোনো তথ্য থাকলে তাও তুলে ধরতে বলা হয়েছে। কর্মকর্তা সম্পর্কে ডিএসবির তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং ডিএসবির এসপির সুস্পষ্ট ও সার্বিক মতামত চাওয়া হয়েছে।
এ অনুসন্ধান প্রতিবেদন ১ জুলাইয়ের মধ্যে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু বেশিরভাগ জেলা থেকে এ অনুসন্ধানপত্র প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বেশিরভাগই জেলা প্রশাসক (ডিসি), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমতি ছাড়া অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাকে তথ্য-উপাত্ত দেননি। এক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তারাই বিব্রত হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বর্তমানে ইউএনও পদে সাধারণত বিসিএস ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০ ব্যাচের কর্মকর্তারা কর্মরত। মাঠ প্রশাসনের এসব কর্মকর্তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হলেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মাঠপ্রশাসনের এসব কর্মকর্তাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের বিষয়ে রোববার জানতে চাওয়া হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন ও অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক) মো. সামছুর রহমানের কাছে।
তারা বলেন, ‘এ জাতীয় তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে কিছু জানি না। এমন কোনো নির্দেশনাও দেয়া হয়নি। এ ছাড়া ডিসি-ইউএনওদের তথ্য জানতে চাইলে অবশ্যই তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বা তাদের অবহিত করেই জানতে হবে।’
সূত্র জানিয়েছে, মাঠ প্রশাসনে পুলিশি এ তদন্তে যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে তা প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়েও ছড়িয়ে পড়েছে। অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও। এসব ব্যাচের কর্মকর্তারা বিষয়টি তাদের সিনিয়র কর্মকর্তাদেরকে জানিয়েছেন।
জানিয়েছেন তাদের ব্যাচভিত্তিক ফোরাম ও প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনকেও। নিজেদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজেও ক্ষোভ ও অসন্তোষ জানিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন মাঠ প্রশাসনের এসব কর্মকর্তারা। কোনো কোনো ডিসি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমতি ছাড়া তথ্য দিতে নিষেধ করেছেন বলেও ওই পেজে তুলে ধরা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গা থেকে আমিও বিষয়টি শুনেছি। বিস্তারিত জেনে পরে মন্তব্য করব।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২১ ব্যাচের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। তারা মূলত জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা। যদি তাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য দরকার হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই তা জানার রেওয়াজ।
কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় তথ্য জানা হচ্ছে তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো জানে না। সরকারের কোন সিদ্ধান্তের আলোকে এসব তদন্ত করা হচ্ছে তা চিঠিতে উল্লেখ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যখন চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছি তখনই আমাদের পুলিশি তদন্ত হয়েছে। এখন আবার কেন তদন্তের নামে আমাদের স্কুল, কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ যাচ্ছে। এতে আমার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।’
২৭ ব্যাচের এক কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠপ্রশাসনে অস্থিরতা সৃষ্টি করতেই এসব করা হচ্ছে। কারণ আগামী জাতীয় নির্বাচনে এরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বৃহত্তর ফরিদপুরের একটি উপজেলার ইউএনওর তথ্য নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলার এসবি কর্মকর্তা।
ওই ইউএনওর গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরায় এসবির লোক পাঠানো হয়েছে তথ্য যাচাই করতে। এতে এলাকায় এক ধরনের উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। এএস





