সীমান্ত ঝুঁকি ও দেশ-বিদেশে অর্থনৈতিক উপকরণগুলোর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে এবার কোরবানির গরুর মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। এরই মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুসারে গরুর দাম বেড়েছে গড়ে ১৭ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত।
গতকাল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন হাটে বিক্রি হওয়া গরুর তথ্যানুসারে, গত বছর বড় আকারের গরু বিক্রি হয়েছে ১২ লাখ টাকায়, এবার তা বিক্রি হচ্ছে ১৪ লাখে। যে গরুর দাম ছিল ৬ লাখ টাকা তা বেড়ে হয়েছে ৮ লাখ। আর ছোট আকারের গরু গত বছর ৪০ হাজার টাকায় পাওয়া গেলেও এবার বিক্রি হচ্ছে ৬০ হাজারে।
তবে একেবারে ছোট গরুর দাম খুব একটা বাড়েনি, কারণ এর চাহিদা কম। গতবার এ ধরনের গরু বিক্রি হয়েছে ৩০ হাজার টাকায়; এবার বিক্রি হচ্ছে ৩২ থেকে ৩৫ হাজারে।
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক এক জরিপে বলা হয়েছে, গত বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৭ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে গরুর দাম আরও বেশি। প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের মতে, গত বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম বেড়েছে কমপক্ষে ২০ শতাংশ। তারা জানায়, এবার ভারতীয় গরু কম আসায় দেশি খামারি এবং চাষিরা গরুর দাম ভালো পাচ্ছেন।
রাজধানীর গাবতলীর হাটে গরুর বেপারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সীমান্তের ওপার থেকে গরু আসতে শুরু করেছে। আজকালের মধ্যে ওইসব গরু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে ঈদের আগে গরুর দাম আরও কমে যেতে পারে।
তারা আরও জানান, দেশে যেমন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গরু মোটাতাজা করা হয়, ভারতেও তেমনটি করা হয়। প্রতিবেশী দেশটিতে গৃহস্থালি কাজ ছাড়া গরুর ব্যবহার নেই। বয়স বেশি হলে গরুকে আর এসব কাজে লাগানো যায় না।
তাই কোরবানি ঈদ উপলক্ষে বেশি দাম পাওয়া যায় বলে ভারতীয়রা এই সময় গরু বিক্রি করেন। অন্যান্য সময় ভারতে গরুর দাম থাকে খুবই কম।
অর্থনীতিবিদরা জানান, দেশে গরুর খাবারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় লালনপালন ব্যয় বেড়েছে। এ ছাড়া চাহিদা অনুযায়ী গরু দেশে নেই। এ কারণেই দেশি গরুর দাম বেড়েছে। ফার্মগুলোর খরচও বেড়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে খামারের খরচ বেড়েছে। এসব কারণে দেশি গরুর দাম বেড়েছে।
ফেনীর একটি খামারের মালিক বলেন, গরুর খাবারের দাম বেড়েছে অনেক। এর মধ্যে খৈলের দাম ৩২ থেকে বেড়ে ৪০ ও ভুসি ২৮ থেকে বেড়ে ৩২ টাকা কেজি হয়েছে। খড়ের স্তূপ ১০-১২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অথচ কিছু দিন আগেও এর দাম ৩০০ টাকার কম ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গরু মোটাতাজাকরণ খাবারের দাম ৬৬০ টাকা, যা কয়েক মাস আগে ছিল ৬২০ টাকা।
ভারতীয় গরুর দাম বাড়ার নানা কারণ উল্লেখ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উপকরণগুলোর পাশাপাশি সীমান্ত ঝুঁকির প্রিমিয়াম বেশি হওয়া, দুই দেশের মূল্যস্ফীতির হার, দুই দেশের মুদ্রা বিনিময় হারের ওঠানামা গরুর দামে প্রভাব ফেলে।
এ ছাড়া গরুর মূল্য পরিশোধ হচ্ছে ডলার ও স্বর্ণে। স্বর্ণের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দরও একে প্রভাবিত করে। ভারত থেকে গরু কম এলেই দেশে গরুর দাম বেড়ে যায়।
সূত্র জানায়, গত বছর ৬ সেপ্টেম্বর প্রতি ডলারের দাম ছিল ৭৭ টাকা ৮০ পয়সা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৭৮ টাকা ৪০ পয়সা। ওই সময়ে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়েছে দশমিক ৭৭ শতাংশ। একই সময়ে টাকার বিপরীতে রুপির দাম কমেছে ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। গত বছরের এই সময়ে ১ রুপির দাম ছিল ১ দশমিক ৮৮ টাকা। এখন তা হয়েছে ১ দশমিক ২২ টাকা। এতে টাকার মান বেড়েছে।
এদিকে ডলারের বিপরীতেও রুপির দাম বেড়েছে। গত বছরের এই সময়ে এক ডলারের দাম ছিল ৬৮ দশমিক ৫০ রুপি। এখন তা হয়েছে ৬৬ দশমিক ৩৫ রুপি। বিনিময়ের এই হারও গরুর দাম হ্রাস-বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বেড়েছে। গত বছরের এই সময়ে প্রতিআউন্স স্বর্ণ ছিল ১১ হাজার ডলার। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩৫০ ডলার। দাম বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। হিসাব অনুযায়ী ডলার ও স্বর্ণের দাম বাড়ায় গরুর মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে বেশি টাকা দিতে হচ্ছে।
শুধু ডলার বা স্বর্ণের দাম বাড়াই নয়, গত বছরের তুলনায় এবার দুই দেশেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ভারতে এ হার ৮ শতাংশ এবং বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ। এ কারণেও বেড়েছে গরুর দাম।
প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে এবার প্রায় ৫৫ লাখ গরু কোরবানি হতে পারে। কিন্তু কোরবানিযোগ্য গরু আছে ৩৩ লাখ। ঘাটতি ২২ লাখ। প্রতিবারই এ ঘাটতি মেটানো হয় ভারতীয় গরু দিয়ে। অন্যদিকে দেশে থাকা কোরবানির উপযোগী সব গরু এবার বিক্রি হবে না। এ ক্ষেত্রেও বাড়ছে ভারতীয় গরুর চাহিদা।
ব্যবসায়ীরা জানান, সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় এতদিন ভারত থেকে গরু এসেছে কম। এখন আবার আসতে শুরু করেছে। দাম বাড়ার অপেক্ষায় ভারত গরু ছাড়তে দেরি করছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গরুর দাম বৃদ্ধির বহুমুখী কারণ থাকে।
শুধু দেশি গরুতে কোরবানির চাহিদা মেটে না। কোরবানি ছাড়াও অন্য সময় ভারত থেকে গরু আসে। সীমান্তে গরু আনতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা নিহতও হন। তার মানে সারা বছরই ভারত থেকে গরু আসছে।
তিনি আরও বলেন, যে পণ্যের মাধ্যমে গরুর দেনা শোধ করা হয়, তার মূল্য ও সীমান্ত পরিস্থিতির কারণেও গরুর দাম বাড়ে। কেননা গরু নিয়ে সীমান্ত পার হওয়া একটি ঝুঁকির বিষয়। এ কারণে ঝুঁকির একটি প্রিমিয়ামও এখানে যুক্ত হচ্ছে।
সূত্র জানায়, এর বাইরে গরুর পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ট্রাকে গরু আনতে ভাড়া গুনতে হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। গত মাসেও এ ভাড়া ছিল অর্ধেক, অর্থাৎ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। গাড়ি ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগের বর্ডার গার্ড-১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শাহজাহান সিরাজ জানায়, চলতি বছর এখন পর্যন্ত চার লাখের বেশি গরু এসেছে। মহিষ এসেছে প্রায় ৫০ হাজার। এই গরু আনা-নেওয়ার জন্য দুই দেশেরই একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যাদের মাধ্যমে গরু আসছে। এসব চক্রই দেশের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
এমএনজে





