কুষ্টিয়ায় খুঁড়িয়ে চলছে সাড়ে তিনশ পোস্ট অফিস। লোকবল সংকট, অচল যানবাহন ও নিজস্ব স্থাপনা না থাকার কারণে কাঙ্খিত সেবা দিতে পারছে না জেলার ডাক বিভাগ। অনেক ক্ষেত্রে সুবিধা বাড়লেও নানা সমস্যার কারণে সাধারণ সেবা গ্রহীতাদের অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। জেলা থেকে গ্রাম-অঞ্চল সব খানেই চলছে ডাক বিভাগের দুরবস্থা।
এদিকে গ্রামের ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসগুলো চলছে বাড়ি কিংবা মুদি দোকানে। জেলা ও উপজেলা পোস্ট অফিসগুলোতে কিছুটা কাজকর্ম হলেও ইউনিয়ন পর্যায়ের ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসগুলো খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অনেক স্থানে চুরি হয়ে গেছে ডাকবক্স।
স্থানীয় দোকান আবার কোথাও কোথাও বাড়িতে বসে ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসের কাজ চলছে। বাইরে থেকে মাঝে মধ্যে চিঠি আসলেও পোস্ট করলে তা আর পৌঁছায় না। জেলা ডাক বিভাগ সুত্র জানায়, কুষ্টিয়া পোস্টাল ডিভিশনে ৪টি জেলায় সব মিলিয়ে ৩৫০টি পোস্ট অফিস রয়েছে। জেলাগুলো হলো-কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও রাজবাড়ী। প্রায় সব অফিসে লোকবল সংকট রয়েছে।
এসব জেলায় এখনো চলছে পুরনো পরিবহন দিয়ে। বেশির ভাগ পরিবহন অকেজো। রাস্তার মাঝে অনেক সময় নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে। দু-একটি ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিস ছাড়া বেশির ভাগ অফিসেরই নিজস্ব ভবন নেই। পোস্টমাস্টার অফিস করেন নিজের বাড়ির বৈঠকখানা অথবা নিকটবর্তী কোনো দোকানে। উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে একতারপুর বাজার। প্রায় ৩০ বছর আগে এ বাজারে ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিস খোলা হয়।
প্রথমদিকে পোস্টমাস্টার কিংকর বিশ্বাস সরকারি জমিতে খড়ের ঘর তুলে অফিস করতেন। কিন্তু ঘর ও জমি বেদখলে চলে যাওয়ার পর থেকে তিনি অফিস করেন বাঞ্ছারামের মুদি দোকানে। খোকসা উপজেলার ডাক বিভাগের প্রায় একই অবস্থা। যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এলাকাবাসী। এখানেও ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসের কাজ চলে মুদি দোকানে।
জানা গেছে, এ উপজেলার ২টি পোস্ট অফিস ও ১২টি ব্রাঞ্চ পোষ্ট অফিস চালু রয়েছে। এর মধ্যে জোতপাড়া (গোপগ্রাম), বরইচারা, চাঁদট, মোড়াগাছা, একতারপুরসহ ৯টি ব্রাঞ্চ পোষ্ট অফিসের কাজ চলে স্থানীয় বাজারের মুদি দোকানে ও মাষ্টারের বাড়ির বৈঠক খানায়। একটি চিঠি বিলি হতে সময় লাগে দুই সপ্তাহ। মানি অর্ডার হলে তো কথাই নেই, তিন মাসেও বিলি না হওয়ার নজির মেলে অহরহ।
ইলেকট্রোনিক্স মানি অর্ডার, ক্যাশ কার্ড, সেভিংস ব্যাংকিং, রেজিঃ পার্সেল, বীমাসহ আধুনিক পরিসেবা চালু হয়নি ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসগুলোতে। খোকসা উপজেলা পোস্ট মাস্টার (ভারপ্রাপ্ত) মনোয়ার হোসেন জানান, ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসের কর্মচারীদের যে বেতন দেয়া হয় তা দিয়ে কাজ করানো অমানবিক। প্রতি মাসে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ডাক বিভাগের দুরবস্থার দেখে যাচ্ছে তাই আমাকে আর কিছু লিখতে হচ্ছে না।
রানার ইয়ার আলী জানান, পোষ্ট অফিসে পর্যাপ্ত রানার না থাকায় তাকে একাই ৩টি কখনও ৪টি লাইনের কাজ করতে হচ্ছে। পোস্টম্যান দেলোয়ার হোসেন জানান, পূর্বের তুলনায় কাজের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। সে তুলনায় কর্মচারী সংকট থাকায় গ্রাহকদেও সেবা দিতে বিপাকে পড়ছে ডাক বিভাগ। তারপরেও সেবা দিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
পোষ্ট অফিসের কার্যক্রম বৃদ্ধি ও ডিজিটাল হলেও অফিসের আসবাবপত্র সে আমলেরই রয়ে গেছে। ভেড়ামারা উপজেলা পোষ্ট মাষ্টার মনিরুজ্জামান জানান, লোকবল সংকট থাকায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। দ্রুত লোকবল নিয়োগ না দিলে ডাক বিভাগ থেকে গ্রাহকদের সেবা দিতে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হবে। ডাক পরিদর্শক (প্রশাসন) মতিউর রহমান জানান, লোকবল সংকট প্রকট। গ্রামীণ পোস্ট অফিস উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসগুলো ঠিক করার ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। তবে জমি পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে এতকিছুর পরও পোস্ট অফিসের কয়েকটি সেবা দারুণ সাড়া ফেলেছে ব্যবসায়ী ও সাধারণ লোকজনের মাঝে। বিশেষ করে পোস্ট অফিসের মোবাইল মানি অর্ডার, পোস্টাল ক্যাশকার্ড সিস্টেম। এছাড়া সঞ্চয়পত্র, পেনশন সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র, ৩ মাস অন্তর মুনাফা বৃদ্ধি সঞ্চয়পত্র কার্যক্রম পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পুরনো যানবাহন এখন গলার কাঁটা। অফিসারদের গাড়িগুলোও সেকেলে।
একজন কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, ইউএনও ও ডেপুটি পোস্টমাস্টারের পদ সমমর্যাদার। কুষ্টিয়া পোষ্টাল ডিভিশনের ডেপুটি পোষ্ট মাষ্টার জেনারেল মো: আমান উল্যাহ মজুমদার জানান, যানবাহন, লোকবল ও বাজেট না বাড়ালে পোষ্ট অফিস থেকে মানুষ পুরো সেবা পাবে না।
তারপরও জোড়াতালি দিয়ে আগের তুলনায় বেশি কাজ করা হচ্ছে। পোষ্ট অফিসের অনেক সেবার কথা সাধারন মানুষ জানে না। কাজও বেড়েছে। নতুন কিছু সেবা চালু করায় আবারও পোষ্ট মুখী হচ্ছে লোকজন।
সবুজ/ জেড





