ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা শহরের চাপালি গ্রামের গান্না সড়কে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন পার্টি কালীগঞ্জ উপজেলা শাখার সেক্রটারী ও স্থানীয় শিয়া নেতা হাফেজ আব্দুর রাজ্জাক খান (৪০) নিহত হয়েছেন।

নিহতের ঘটনায় মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতের বড় ভাই শওকত আলী খান বাদি হয়ে অজ্ঞাত নামা ৫/৬ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন। হত্যার রহস্য উদঘাটন কিংবা জড়িত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ এখনো অন্ধকারে রয়েছে। হত্যার সাথে কারা সংশ্লিষ্ট এবং কি কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে এ বিষয়ে কোন তথ্য এখনো পুলিশ পায় নি।

মঙ্গলবার দুপুরে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নিহতের লাশের ময়না তদন্ত করানো হয়েছে। বিকালে কালীগঞ্জ কলেজ মাঠে জানাজা শেষে খড়াসুন্নি গ্রামের বাড়িতে লাশ দাফন করা হয়।

এ দিকে নিহতের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। শিশু কন্যা ইরানী (১০) ও ছেলে রাহবারের (৩) কান্না থামছেনা। বাবার ছবি বুকে আকড়ে ধরে কান্না থামছে না তাদের।

স্ত্রী শহানাজ খাতুন বলেছেন নিহত হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকেই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা ফোনে তাকে খুনের হুমকি দিয়ে আসছিল। এ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা বেশ আতংকিত ছিলেন বলে জানান স্ত্রী শহানাজ খাতুন । নিহতের মেজো ভাই হোসেন আলী খান বলেন কালীগঞ্জ উপজেলার শহরের নীমতলা বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন মসজিদ মার্কেটের চেম্বার বন্ধ করে বাড়ি যাওয়ার পথে সোমবার রাত ১০টার দিকে তাকে ৫/৬ জন অজ্ঞাত নামা দুবৃত্তরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে । পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে কালীগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে মারা যান তিনি ।

হাফেজ আব্দুর রাজ্জাক ঝিনাইদহ সদর উপজেলার খড়াশুনি গ্রামের মৃত হাশেম আলী খানের ৬ষ্ঠ ছেলে। গত কুড়ি বছর ধরে তিনি কালীগঞ্জে খোমিনী হোমিও হল পরিচালনা করে আসছিলেন।

কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, নিহত আব্দুর রাজ্জাক খান ইসলামী ঐক্য আন্দোলন পার্টির উপজেলা শাখার সেক্রেটারী ছিলেন। তিনি আরো জানান রাজ্জাক শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারী এবং ঈমাম ছিলেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে এ হত্যার ঘটনা ঘটেছে মর্মে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করা হচ্ছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

এ হত্যাকান্ডের সাথে জঙ্গি সংগঠন কিংবা ইসলামী উগ্রপন্থিদের জড়িত থাকার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। অপর দিকে হাফেজ আব্দুর রাজ্জাক খানের নিহত হওয়ার খবরে দুরদুরান্ত থেকে শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারীরা নিহতের বাড়িতে ভিড় করেছেন।

এ খুনের ঘটনায় কালীগঞ্জ উপজেলা শহরে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক নীরব হোসেন জানান, মোটিভ এবং ক্লু উদ্ধারে পুলিশ নিবিড় অনুসন্ধানে নেমেছে। হত্যার ধরণ ও নিহত হওয়ার আগে কার কার সাথে তার কথাবার্ত হয়েছে সেটা নিয়েও পুলিশ তদন্ত করছে।

এসআই নীরব হোসেন আরো জানান, কয়েকটা বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে পুলিশ তদন্তে নেমেছে। ঘটনার দিন নিহত আব্দুর রাজ্জাক ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছিলেন দেড় লাখ। সেই টাকার জন্য তাকে খুন করা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে বিরোধ, নারী ঘটিত কিছু বিষয় ও জমিজমা নিয়ে হোমিও চিকিৎসক আব্দুর রাজ্জাকের সাথে নলডাঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খড়াসুন্নি গ্রামের রুহুল বিশ্বাসের ছেলেদের বিরোধের বিষয় মাথায় রেখেই পুলিশ অগ্রসর হচ্ছে বলে এসআই নীরব হোসেন জানান।

তিনি আরো জানান, পত্রপত্রিকা ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা গেছে আব্দুর রাজ্জাক শিয়া সম্প্রদায় তরিকার সাথে চলাফেরা করতেন। ঘটনার দিন রাতে কালীড়গঞ্জ নিমতলা বাসষ্ট্যান্ডে খোমেনি হোমিও হলে বসে এই মতাদর্শের লোকজনের সাথে বৈঠকও করেন আব্দুর রাজ্জাক। এ ছাড়া হোসনি দালান, ইরানসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন তার ঘরে আসতেন বলেও প্রতিবেশি কয়েকজন দোকানদার জানান। পুলিশ তার দোকান থেকে খোমেনির পোষ্টারসহ বেশ কিছু কাগজপত্র উদ্ধার করেছে।

এলাকাবাসি জানায়, হোমিও চিকিৎসক রাজ্জাকের চাপালী গ্রামের বাড়ির পাশে মাদক দ্রব্য কেনা বেচা হতো। পুলিশের কাছে অভিযোগ দিলে দেড় মাস আগে মাদক ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করে দেয় পুলিশ। এ নিয়ে এলাকার মাদক ব্যবসায়ীরা তার উপর ক্ষুদ্ধ ছিল। এ সব বিষয় মাথায় রেখে পুলিশ অগ্রসর হচ্ছে। খুব দ্রত রাজ্জাক হত্যার রহস্য পুলিশ উন্মোচন করতে পারবেন বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা নীরব হোসেন আশা ব্যক্ত করেন।

এদিকে তিনি নিজে শিয়া মতবাদের হলেও তার বাবা ও ভায়েরা সবাই সুন্নী বলে জানা গেছে। তবে পরিবারের সদস্যরা দাবী করছেন, আব্দুর রাজ্জাক শিয়া মতবাদের ছিলেন না। ঝিনাইদহ ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের জেলা আমীর আব্দুর বারী জানান, ১০/১৫ বছর আগে নিহত আব্দুর রাজ্জাক তার দলের একজন সদস্য ছিলেন। এখন তিনি শিয়া মতবাদের উপর চলাফেরা করতেন বলে লোকমুখে শুনেছেন।
উল্লেখ্য সোমবার রাতে কালীগঞ্জ শহরের নিমতলা বাসষ্ট্যান্ড এলাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে উপজেলা কৃষি অফিসের পাশে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা চাপাতি দিয়ে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে।

প্রথমে আব্দুর রাজ্জাক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন বলে প্রচার করা হয়। পরে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চত হলে তার লাশ বাড়ি থেকে আবার থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। অন্যদিকে গত ৭ জানুয়ারী ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালুহাটী গ্রামের বেলেখাল বাজারে সমির খাজা নামে এক ধমান্তরিত খ্রষ্টান হোমিও চিকিৎসক খুন হয়েছিলেন।

 

এমআইএস।