আসামের সরকার প্রস্তাব দিয়েছে যে ধর্মীয় অত্যাচারের কারণে বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের শরণার্থী হিসাবে ঘোষণা করে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হোক।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নির্বাচনের প্রচারের সময়ে বারে বারে একই দাবী তুলেছিলেন। কিন্তু বিজেপি এখন বলছে, আসামের কংগ্রেস সরকারের এই সিদ্ধান্তের পিছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধি রয়েছে। আর বৃহত্তম আসামীয়া জাতীয়তাবাদী সংগঠন ‘আসু’ বলছে, এই প্রস্তাব তারা কিছুতেই মানবে না।

আসামের মন্ত্রীসভায় পাশ হওয়া প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে ১৯৪৭ সালের আগে যাঁরা অবিভক্ত ভারতের নাগরিক ছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে নতুন তৈরী হওয়া দেশে থেকে যান– এমন মানুষেরা যদি সেখানে ধর্মীয় অত্যাচারের শিকার হয়ে ভারতে ফেরত আসেন, তাঁদের শরণার্থী হিসাবে গ্রহণ করা হোক। এই সব মানুষদের নিজেদের দেশে ফেরত না পাঠিয়ে ভারতের নাগরিকত্ব সহ অন্যান্য মানবিক সাহায্য দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে বুধবার রাজ্য মন্ত্রীসভায় গৃহীত প্রস্তাবে।

আসাম সরকারের মুখপাত্র ও বনমন্ত্রী রকিবুল হোসেন বলছিলেন, “অবিভক্ত ভারতের যেসব নাগরিক আসামে ফেরত এসেছেন ধর্মীয় অত্যাচারের কারণে, তাঁদের বিদেশী বলে গণ্য না করে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলেছি আমরা। গুজরাট আর রাজস্থানে এই আইন চালু আছে। তবে আসাম চুক্তি অনুযায়ী যেহেতু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে আসা কোনও বিদেশীকে নতুন করে নাগরিকত্ব দেওয়া যায় না, তাই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই প্রস্তাব পাঠানো হল বিবেচনার জন্য। এবারে তারা সঠিক মনে করলে আইন করবে।"

মি. হোসেন আরও বলছিলেন, যদিও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটিতে লেখা হয় নি- তবে এই প্রস্তাব মূলত বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু-বৌদ্ধ সহ সেদেশের সংখ্যালঘুদের কথা মাথায় রেখেই তৈরী।

মন্ত্রী স্পষ্টতই জানিয়েছেন অন্যান্য কারণে যাঁরা আসামে এসেছেন বাংলাদেশ থেকে, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে না। যার অর্থ হল, অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয় নি এই প্রস্তাবে।

অন্যদিকে অসমীয়া জাতীয়তাবাদী সংগঠন সারা আসাম ছাত্র সংগঠন বা আসু জানিয়েছে অবৈধ বিদেশীদের মধ্যে হিন্দু–মুসলমান আলাদা করার এই সরকারী প্রস্তাব তারা কিছুতেই মানবে না।

আসুর প্রধান উপদেষ্টা সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্যের কথায়, “এভাবে অবৈধ বাংলাদেশীদের মধ্যে কে হিন্দু কে মুসলমান– তা আলাদা করতে দেব না আমরা। সব অবৈধ বিদেশীকেই আসাম ছাড়তে হবে। বিদেশী সমস্যাটা আসাম চুক্তি অনুযায়ী-ই মেটাতে হবে। আসামের মানুষ তো ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আসা বাংলাদেশীদের গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তারপরে আসা মানুষদের চাপ কেন আসাম সামলাবে। রাজনীতি করতেই এই প্রস্তাব এনেছে কংগ্রেস সরকার – ভোটে হেরে যাওয়ার পরে এখন ভোট ব্যাঙ্ক তৈরী করতে চাইছে তারা।"

ওদিকে বাংলাদেশ থেকে আসামে আসা হিন্দুদের অধিকার আদায়ের দাবীতে সোচ্চার সংগঠন– নাগরিক অধিকার সুরক্ষা সমিতির উপদেষ্টা হাফিজ রশিদ চৌধুরী বলছেন যে এটি মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের একটা রাজনৈতিক চাল।

মি. চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমার মনে হচ্ছে এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত আছে। সরকার তো নতুন কিছু করছে না। ১৯৫০ সালে তৈরী একটা আইনেই এই কথা বলা আছে। বরাক উপত্যকায় দুটি উপনির্বাচন রয়েছে, সেখানে ভোট পাওয়ার জন্যই এই প্রস্তাব এনেছে মন্ত্রীসভা।"

হাফিজ রশিদ চৌধুরী আরও বলছিলেন, “আমরা চাই যে মানুষেরা এসেছেন, তিনি হিন্দু হোন বা মুসলমান– দুই ধরণের মানুষই বাংলাদেশে অত্যাচারের শিকার হতে পারেন– তাঁদের শুধু সংস্থাপন দিলেই হবে না। নাগরিকত্ব দিতে হবে, ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। নাকি আবারও সেই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী খোঁজার নামে সন্দেহজনক ভোটার হিসাবে চিহ্নিত করে আটক করে শিবিরে রাখা হবে!"

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর নির্বাচনী প্রচারে বারে বারে বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের শরণার্থী হিসাবে গ্রহণ করার পক্ষে দাবী জানিয়ে এসেছেন। তবে আসামের কংগ্রেস সরকার এই প্রস্তাব মন্ত্রী সভায় পাশ করে নেওয়ার পরে বি জে পি বলছে এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। তবে দেরীতে নেওয়া হলেও এই প্রস্তাবকে বিজেপি স্বাগত জানাচ্ছে।

যদিও বিজেপি-র প্রাক্তন সংসদ সদস্য কবীন্দ্র পুরকায়স্থ আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিয়ে কিছু বলতে চান নি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

ঢাকা, ১৮ জুলাই(টাইমনিউজবিডি.কম)//এনএস