বিশ্বে ১২০ কোটি তরুণ ভোটার থাকলেও তাদের মধ্য থেকে প্রতিনিধিত্ব করতে মাত্র এক দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ সংসদ সদস্য রয়েছেন। যাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। যদিও এসব ভোটারের ৫৭ শতাংশের বয়স ২০ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে।

আবার সারা বিশ্বে এক তৃতীংশ সংসদে ৩০ বছরের নিচে কোনো সংসদ সদস্যই নেই বলে জানিয়েছেন আইপিইউ ইয়াং পার্লামেন্টারিয়ানদের সংগঠন ফোরাম অব ইয়ং পার্লামেন্টেরিয়ানস।

আজ মঙ্গলবার আইপিইউ সম্মেলনের চতুর্থ দিনে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তরুণ সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ১২৮টি দেশের এমপিদের ওপর ‘ইয়ুথ পার্টিসিপেশন ইন ন্যাশনাল পার্লামেন্ট ২০১৬’ শীর্ষক এক গবেষণা জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ফোরাম অব ইয়ং পার্লামেন্টেরেয়িানস’-এর প্রেসিডেন্ট উগান্ডার সর্বকণিষ্ঠ সংসদ সদস্য মাউরিন অসরো (২৬), আইপিই‘র জেন্ডার পার্টনারশিপ প্রোগ্রামের প্রধান লেবাননের এমপি জিইনা হিলাল (২৯) এবং আইপিইউ-এর মিডিয়া স্পোকস পার্সেন জিন মিলিগান।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ২০১৫-১৬ সালে ১২৮ দেশের পার্লামেন্টের ওপর ইয়ুথ পার্টিসিপেশন ইন ন্যাশনাল পার্লামেন্ট ২০১৬’ শীর্ষক এ গবেষণা জরিপ করা হয়েছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে বিশ্বের ৫৭ শতাংশ ভোটারের বয়স ২০ থেকে ৪৪ বছর।

এরমধ্যে ৩০ বছরের কম বয়সী মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ সংসদ সদস্যের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ৪০ বছরের নিচে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং ৪৫ বছরের নিচে বয়স রয়েছে ২৬ শতাংশ এমপির। যদিও গবেষণায় বলা হয়েছে ২০ থেকে ৪৪ বয়সসীমার ভোটার রয়েছে ৫৭ শতাংশ, যার সংখ্যা ১২০ কোটি।

ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে সবচেয়ে তরুণ সাংসদদের প্রতিনিধিত্ব বেশি রয়েছে সুইডেন। এখানে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ সংসদ সদস্য ৩০ বছরের মধ্যে। ইকুয়েডরে রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে- এ দেশে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ, তৃতীয় স্থানে ফিনল্যান্ড ১০ দশমিক ৫ শতাংশ, নরওয়ে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ এমপি ৩০ বছরের নিচের বয়সী।

আবার ৪০ বছরের নিচে বয়সী সংসদ সদস্যদের মধ্যে ডেনমার্ক এগিয়ে- সেখানে আছে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ, এনডোরা ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ ও ইকুয়েডর ৩৮ শতাংশ সংসদ সদস্য ৪০ বছরের নিচ বয়সী। বৈশ্বিকভাবে ৪৫ বয়সের নিচ বয়সী এমপির দিকে থেকে এগিয়ে ওমান, এখানে ৬৫ দশমিক ৯ শতাংশ , ইথিওপিয়া ৬৩ দশমিক ৬ এবং এনডোরা ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ এমপির বয়স ৪৪ বছরের নিচে। ২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদেরকে এ সমীক্ষায় তরুণ সাংসদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকা, ইউরোপ ও আফ্রিকান দেশগুলোতে ৩০ বছরের নিচের বয়সী সর্বাধিক সংসদ সদস্য রয়েছেন। বৈশিকভাবে তরুণ সংসদ সদস্যদের মধ্যে পুরুষ ও নারী অনুপাত হচ্ছে ৬০ : ৪০। মাত্র ৯টি দেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ৪৫ বছরের নিচের বয়সী ৫০ শতাংশের অধিক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, আবার বিশ্বের ১ তৃতীয়াংশ দেশের নিম্নকক্ষে কোন ইয়ং পার্লামেন্টারিয়ান নেই, যাদের বয়স ৩০ এর নিচে।

ফোরাম অব ইয়ং পার্লামেন্টেরেয়িানস-এর প্রেসিডেন্ট মাউরিন অসরোবলেন, সংসদে তরুণদের প্রতিনিধিত্ব খুবই নগণ্য, যা খুবই হতাশাজনক। আইপিইউ সম্মেলনে ৩০ বছরের নিচে পার্লামেন্টারিয়ান রয়েছেন মাত্র ১২ জন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুনরা রাজনীতিতে আসতে চাইলেও তাদের নানা ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়। বিশেষ করে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নমিনেশন পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে।

এছাড়া রাজনীতি চর্চার সুযোগ কম থাকা, অর্থের অভাব, ভোটারদের আস্থার অভাব, যুবাদের অনেকে বিশ্বাস করতে পারেন না, প্রশ্ন তোলেন তারা পার্লামেন্টে গিয়ে উন্নয়নমূলক কাজ কর্মে কতটা অংশ নিতে পারবে- ইত্যাদি চ্যালেঞ্চ মোকাবিলা করতে হয়। এসব কারণে পার্লামেন্টে তরুণরা রাজনীতিতে আসতে অনীহাও প্রকাশ করেন। কিন্তু আইপিইউ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে তরুণদের ভোটের রাজনীতিতে আরো সক্রিয় করতে ভুমিকা রাখা যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নিজের দেশের বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি তুলে ধরে মাউরিন অসরোবলেন, ১৮ বছর বয়সে সবাই প্রাপ্ত বয়স্ক হয়। সে ভোটাধীকার পায়, এসময় কোন অন্যায় করলে তাকে বিচারের আওতায় এনে প্রয়োজনে জেলেও পাঠানো হয়। কিন্তু একই বয়সে কাউকে সংসদে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে না, যা খুবই দুঃখজনক।

তিনি বলেন, তবে সুখের বিষয়, প্রায় সব দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ইয়ং উইং থাকে। এছাড়া কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্র রাজনীতি-এর মাধ্যমে তরুণরা নিজেদের তৈরি করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে নিতে পারে। তরুণদের পার্লামেন্টে আনতে প্রয়োজনে কোটাব্যবস্থা চালু করার দাবি জানান তিনি।

মাওরিন ওসরো বলেন, রাষ্ট্র যদি তরুনদের রাজনীতিতে আসার জন্য বা পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য উৎসাহিত করে তাহলে এ বৈষম্য দূর হবে। এছাড়া গণতন্ত্রের সুফল পেতে সময়ের প্রয়োজনে তা নবায়ন করা প্রয়োজন, যাতে করে বৈশ্বিকভাবে পার্লামেন্টে তরুনদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে, কেননা বর্তমান বিশ্ব গতির বিশ্ব, তরুণরা অনেক বেশি স্পিডিচুয়াল, তারা অনেক বেশি এনার্জেটিক।

এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তরুণদের প্রতিনিধিত্বে আনার জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান, উৎসাহিত করা এবং নমিনেশনের বিষয়ে স্বচ্ছতা রাখা। আইপিইউ সম্মেলন থেকে সব সদস্য দেশগুলোর প্রতি আরো বেশি তরুণ সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবার আহ্বান জানান হয়েছে বলেও তিনি জানান।

মাওরিন বলেন, তরুন সংসদ সদস্য হিসেবে অনেক চ্যালেঞ্জ নিতে হয়। বিশেষ করে নমিনেশন পেতে গেলে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তুমি কি করবে? তুমি এখানে কিভাবে কাজ করবে? এটা মোটেই সহজ কাজ নয়। তবে পরিবর্তনের জন্য তরুণদের এগিয়ে আসতেই হবে। তার দেশে এই মুহূর্তে চারজন ইয়াং সংসদ সদস্য রয়েছে। এছাড়া আইপিইউ চলমান সম্মেলনেও ১২ জন ৩০ বছরে নিচে সংসদ সদস্য রয়েছেন বলেও তিনি জানান।

এমবি