২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা নিধনে অভিযান শুরু করে। সেনাবাহিনীর নির্যাতন আর ধর্ষণের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসতে শুরু করে রোহিঙ্গারা।

এ পর্যন্ত দুই বার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুতি নিলেও সম্ভব হয় নি। রোহিঙ্গাদের শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করছে না মিয়ানমার সরকার।

গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয়বারের মতো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর প্রস্তুতি নেয় দুই দেশ। কিন্তু রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহের কারণে ভেস্তে যায় সেই প্রচেষ্টা। নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, বসতভিটাসহ সম্পদ ফেরত ও নিপীড়নের বিচার নিশ্চিত না হলে তারা মিয়ানমারে ফিরবে না বলে জানিয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে না যাওয়ার ব্যাপারে কিছু এনজিও উস্কানি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, আশ্রিত জীবনে নিজ দেশের চেয়ে শতগুণ স্বাধীন ভাবে চলাফেরা ও সামগ্রিক সুযোগ সুবিধা পাওয়ায় ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে নানা বাহানা করছে রোহিঙ্গারা। কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম বলেন, আমরা মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিলাম। জোর করে ফেরাতে চাচ্ছিনা বলেই প্রত্যাবাসনে দেয়া দু’বারের সময় ভেস্তে গেছে।

এদিকে গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা রোহিঙ্গারা ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে।

রোহিঙ্গাদের জন্য গত দুই বছরে বাংলাদেশ ৭২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। সরকারের পক্ষে বেশিদিন এই সহায়তা অব্যাহত রাখা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন।

ইয়াবা পাচার, ডাকাতি চুরি ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে জাতিগত নিধনের শিকার রোহিঙ্গাদের অনেকে। এসব কারণে মানবতা দেখানো স্থানীয়দের জন্য রোহিঙ্গারা এখন অনেকটা বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে।

নানা অপরাধে গত দুই বছরে ৪ শতাধিকের বেশি মামলার আসামি হয়েছে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। এসব মামলায় কারাগারে গেছে প্রায় ১১শ রোহিঙ্গা। এমন পরিস্থিতিতে তড়িত প্রত্যাবাসন না হলে অনাগত দিনগুলো নিয়ে শঙ্কিত স্থানীয়রা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, গত দুই বছরে রোহিঙ্গা শিবিরে নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও প্রশাসনের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ৪৬ রোহিঙ্গা। এদের মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ৩২ জন। এছাড়া ডাকাতি, অপহরণ, ধর্ষণ, চুরি, মাদক ও মানবপাচারসহ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৪৭১টি, যার মধ্যে মাদক মামলা ২০৮, হত্যা মামলা ৪৩ ও নারী সক্রান্ত মামলা ৩১টি। এসব মামলায় আসামি ১১০৫ রোহিঙ্গা। অপরাধের সাথে জড়িতদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

স্থানীয়রা বলছেন, দিন দিন রোহিঙ্গারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তারা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে। ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে স্থানীয়দের উপর হামলার ঘটনাও ঘটছে। গত বৃহস্পতিবার টেকনাফের হ্নীলার ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুককে গুলি করে হত্যা করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।

উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয়ে নিয়েছে। বিপুল এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এদিকে দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর কারসাজিতে পরপর দুই বার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগছেন স্থানীয়রা। রোহিঙ্গাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড ও সহিংস আচরণও রাড়ছে। এটি নিঃসন্দেহে ভাবনার বিষয়।

কক্সবাজারের সিভিল সোসাইটির নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, বেপরোয়া রোহিঙ্গারা বেশিরভাগ সময় স্থানীয়দের উপর আগ্রাসী হচ্ছে। কিছু এনজিওর উস্কানিতে তারা এমন আচরণ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, প্রতিদিনই বাড়ছে রোহিঙ্গাদের মামলার সংখ্যা। হত্যা, চুরি, ডাকাতি ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলেই ৪ শতাধিক মামলা হয়েছে এবং কারাগারেও আছে প্রায় ১১শ রোহিঙ্গা। নিপীড়ন দেখে বেড়ে ওঠা এতো সংখ্যক উদ্বাস্তু এক জায়গায় থাকলে অপরাধের মাত্রা বাড়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ, এমনটি উল্লেখ করেন তিনি।

জেড