কুষ্টিয়ার অধিকাংশ সরকারী অফিসে জাতীয় পতাকার চরম অবমাননা করা হচ্ছে। জেলার বেশিরভাগ সরকারী প্রতিষ্ঠানেও উত্তোলন করা হচ্ছেনা জাতীয় পতাকা। সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্তা ব্যক্তিরাও এ ব্যাপারে উদাসীন।

অনেকেই আবার জানেন না সরকারী প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন বাধ্যতামুলক। লাল সবুজের পতাকা, পরাধিনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালীর শ্রেষ্ঠ অর্জন। যার ভেতরে লুকিয়ে আছে বাঙালীর চেতনা, সংস্কৃতি আর স্বপ্নের বুনন। কিন্তু সেই পতাকার ব্যবহার যেন হচ্ছে হ্যালা ফ্যালায়।

সরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি কার্যদিবসে জাতীয় পতাকা তোলার নিয়ম থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এযেন বাতির নীচে অন্ধকার। কুষ্টিয়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কথাই ধরা যাক। এই প্রতিষ্ঠানে পতাকা উত্তোলনের কোন স্ট্যান্ড নেই।

পতাকা তোলা হয় কিনা জানতে চাওয়া হয় জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন আহমেদের কাছে। পতাকা তোলার নিয়ম রয়েছে কিনা তাও তিনি জানেননা। একই অবস্থা অফিসের সামনে দুর্নীতি দমন কমিশনের জেলা কার্যালয়, জেলা পরিসংখ্যান অফিসেরও।

এসব দপ্তরের পাশাপাশি একই পরিনতি কুষ্টিয়া সুগার মিল, এলজিইডি ভবন, সড়ক ও জনপদ অফিস, আড়াইশ’ শয্যার হাসপাতাল, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস, সিভিল সার্জন কার্যালয়, সমাজ সেবা অধিদপ্তর, জিকে অফিস, বিএডিসি অফিস, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই।

সম্প্রতি এ ঘটনায় ৫টি প্রতিষ্ঠানকে কারন দর্শানো নোটিশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিকমহল থেকে শুরু করে সব শ্রেনী পেশার মানুষ। বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অ্যাড. লালিম হক বলেন, একটি জাতির প্রতীক হচ্ছে পতাকা।

আমরা যে লাল সবুজের পতাকা বহন করি, হৃদয়ে ধারণ করি তা হচ্ছে আমাদের ৩০ লক্ষ মা-বোনের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার প্রতীক। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে জানাতে হচ্ছে আজকাল কোন সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়না।

বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এমন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। আবার পতাকা উত্তোলন করা হলেও তা নামানো হয়না। এটি আমাদের জন্য লজ্জার, আমাদের জন্য দু:খের। তাই তো তিনি ওই সমস্ত প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় পতাকা অবমাননাকারীদের প্রতি অনুরোধ চিত্তে বলেন দোহায় আপনাদের জাতীয় পতাকাকে সম্মান করুন, শ্রদ্ধা করুন, দেশ ও জাতিকে গৌরবের শেখরে নিয়ে যান।

তাহলেই আপনার সন্তান, আপনার উত্তর প্রজন্ম এদেশ ও জাতির ইতিহাস শিখবে। পতাকার মর্যাদা বুঝবে। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি এমএম রাশিব রহমান বলেন, অনেক আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত পতাকা আমাদের চেতনার প্রতীক হিসেবে বহন করে।

আমরা আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকার কথা থাকলেও আমরা তা মানিনা। এটি আমরা মনে করি চরম ধৃষ্টতার শামিল। কুষ্টিয়া জজ কোর্টের পিপি অনুপ কুমার নন্দী জানান, জাতীয় পতাকা উত্তোলনে সুনির্দিষ্ট আইনই রয়েছে।

যে আইনে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। প্রত্যেক কর্মদিবসে ওইসব প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন বাধ্যতামুলক।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার নাসিম উদ্দিন আহমেদ জানান, যে পতাকার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ আত্মহুতি দিয়েছে, ত্রিশ লক্ষ মৃত্যুবরণ করেছে, দুই লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছে, হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার অঙ্গহানী হয়েছে। এতসব ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাল সবুজের এই পতাকা। সেই পতাকা যে তোলা বাধ্যতামুলক এটাও যদি মানুষকে মনে করিয়ে দিতে হয় তাহলে কোথায় আমরা অবস্থান করছি। এটি আমাদের গোটা জাতির জন্য লজ্জাজনক ব্যাপার।

আমি মনে করি এখন থেকে সকল সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা তোলার পাশাপাশি পতাকার সঠিক মর্যাদা প্রদান করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান। তা না হলে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করবে। জাতীয় পতাকা শুধু এক খন্ড কাপড় নয়, একটি স্বাধীন দেশের স্বার্বভৌমত্বের নিদর্শন।

প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকার বিধি ভাঙার অপরাধে সর্বোচ্চ এক বছরের জেল অথবা ৫ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা জেল জরিমানার বিধান রয়েছে।

এদিকে যেসব প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা তোলা হয়না এমন ৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন কারন দর্শানো নোটিশ প্রদান করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয় সঙ্গীত, পতাকা এবং প্রতীক আদেশ ১৯৭২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা কেন সংশ্লিষ্ট অফিসে নিয়মিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়না এ সংক্রান্ত ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য ওই ৫ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারন দর্শানো নোটিশ প্রদান করা হয়।

একই সাথে সরকারী আদেশ মোতাবেক এখন থেকে প্রত্যেক অফিসে প্রত্যেক কর্মদিবস এবং জাতীয় দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য জানানো হয়েছে।

অন্যথায় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয় ওই নোটিশে। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক জানান, এখন থেকে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা তোলা হবে। যদি কেউ এর ব্যত্যয় ঘটায় তাহলে ওই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এসএইচ